বাবা হঠাৎ আপন মনে মাথা নেড়ে বলল –চিনতে পারবে না বোধহয়!
–কে চিনতে পারবে না?
–কমলা। কতকালের কথা! বলে বাবা অপ্রতিভ মুখখানা ফিরিয়ে নেয়।
গালের তুলোটা হাতের তেলোয় চেপে ধরে। বলে–চেহারাও পালটে গেছে।
নীচের তলার ভাড়াটেদের গলার শব্দ হচ্ছে। কিন্তু ওপর তলাটা নিস্তব্ধ। সম্ভবত এ বাড়িতে লোকজন বেশি নেই। একটা ধূপধুনোর গন্ধ আসছিল। একবার একটু পুজোর ঘণ্টা নাড়ার শব্দ এল। বাপ-ব্যাটায় বসে থাকে মুখোমুখি। শমীক বাবার দিকে তাকায় তো বাবা চোখ সরিয়ে নিয়ে দেওয়ালের অস্পষ্ট পুরোনো অয়েলপেইন্টিং দেখতে থাকে। হঠাৎ আপনমনে বলে নেই—নেই করেও এখনও অনেক আছে। এ বাড়িটার ভ্যালুয়েশনই পাঁচ-সাত লাখ টাকা হবে। অথচ সুদের কারবারির নাকি ভালো হয় না। এরা তবে এত ভালো আছে কী করে?
শমীক একটু হতাশ হয়। পুরোনো প্রেমিকার বাড়িতে বসে আবার এ কীরকম বিষয়ী কথাবার্তা। একটু পরেই সে আসবে, কাঁপা বুক, স্মৃতি আর অধৈর্য নিয়ে বসে থাকার কথা এখন। তেষ্টা পাবে, কথা হারিয়ে যাবে, দৃষ্টি চঞ্চল হবে। এ সময়ে বাড়ির ভ্যালুয়েশনের কথা মনে আসবে কী করে?
বাবা শমীকের দিকে তাকিয়ে বলে–তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে না?
হোক দেরি। শমীক দৃশ্যটা দেখতে চায়। বাবা যদি কণামাত্র খুশি হয়, যদি প্রেমিকাকে দেখে একটুমাত্র জীবনীশক্তি আহরণ করতে পারে, তবে শমীকের বুক ভরে যাবে। সে মুখে বলেনা। দেরি হচ্ছে না।
–রিজার্ভেশন যদি না পাস!
–পাব না ধরেই নিয়েছি। গাড়িতে যা ভিড়। না পেলে ব্ল্যাকে নেব।
–আবার গুচ্ছের টাকা নষ্ট। কাল কাপড়জামায় অনেক বেরিয়ে গেছে।
শমীক হাসল। আবার বিষয়ী কথা। মুখে বলে সে তো তোমার জন্যই। অত কিনতে কে বলেছিল?
বাবা অপ্রতিভ হাসে। শমীক দরজার দিকে পাশ ফিরে বসেছিল, বাবার দিকে চেয়ে। বাবার দরজার দিকে মুখ। হঠাৎ দেখল, বাবার মুখটা পালটে গেল। শরীরটায় একটু শিহরণ কি!
শমীক তাকিয়ে মহিলাকে দেখতে পায়। মাথায় অল্প ঘোমটা, ফরসা, সুগোল ভারী চেহারা, মুখখানা প্রতিমার মতো সুশ্রী। তার নিজের মায়ের মতোই বয়স হবে, তবে ইনি অনেক সুখী। মুখে একটু হাসি।
বাবা উঠে দাঁড়ায়। মহিলা এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন।
–চিনতে পেরেছ? বাবা জিগ্যেস করে।
–ওমা! চিনব না? এই ছেলে বুঝি।
–বড়জন!
–বসুন।
বাবা হাসে। মহিলাও বসেন একটু দূরে চেয়ারে। সাবধান গলায় বলেন–কবে আসা হল? গালে ওটা কী?
বাবা গালের তুলোয় হাত চেপে বলে-এর জন্যই আসা। একটা ঘায়ের মতো! ডাক্তার বলেছে, ভয়ের কিছু নয়।
–ঘা!
–দাঁত তুলে সেপটিক হয়ে গিয়েছিল।
–ও।
–তোমরা সব কেমন আছ? বহুকাল খবর বার্তা পাই না।
মহিলা হাসেন। বলেন–আপনি সেই চা বাগানে এখনও আছেন?
–হ্যাঁ। ওখানেই জীবন শেষ করে ফেললাম।
মহিলা একটা শ্বাস ফেললেন–জানি সবই।
বাবা একটা গলা খাঁকারি দেয়। বলে–খগেনের কেমন চলছে?
–ওই একরকম।
বাবা হেসে বলে–খুব বাবু মানুষ ছিল। সেই কোঁচানো ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি, আর বত্রিশজোড়া জুতো এখনও চালাচ্ছে? চুলে কলপ–টলপ দেয় না?
মহিলা মুখে আঁচল তুলে হাসি ঢাকেন। মৃদুস্বরে বলেন–কলপের দরকার হয় না। টাক পড়ে গেছে।
–পড়ারই কথা। বলে বাবা গম্ভীর হয়ে যায়। এস্রাজটা ইঙ্গিতে দেখিয়ে বলে–এখনও বাজাও?
মহিলা মাথাটা নুইয়ে দেন। মাথা নাড়েন। না, বাজান না।
বাবা চুপ করে দেওয়ালের দিকে চেয়ে থাকে। হলঘর থেকে দেওয়াল ঘড়ির শব্দ আসে। চাকর মিষ্টির প্লেট রেখে যায়। গেলাসে জল। চা।
বাবা প্লেটের দিকে চেয়ে বলে–চিবোতে পারি না।
–কষ্ট হয়?
–হুঁ। আমার পথ্য লিকুইড।
–শরবত করে দিই?
–না।
মহিলা তবু উঠে যান। বোধহয় শরবতের ফরমাশ দিয়ে এসে আবার বসেন। ঘোমটা খসে গেছে। এখনও কী গহীন কালো চুলের রাশি!
–খগেনকে বোলো, আমি এসেছিলাম। কাল বা পরশু ফিরে যাব।
মহিলা চুপ করে থাকেন। শমীক একটা–দুটো মিষ্টি খায়। চা শেষ করে। তারপর উঠে বলে–বাবা, আমি আসি?
যাবে? বাবা তটস্থ হয়ে বলে–আমিই বা বসে থাকি কেন? খগেন যখন নেই!
মহিলা ঘোমটা আবার মাথায় তুলে শমীককে বলেন–তুমি এখন কোথায় যাবে বাবা?
–একটু কাজ ছিল।
–আমি ওঁকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। উনি একটু থাকুন এখানে, কেমন? বাবা অপ্রতিভ হয়। শমীক এটাই চাইছিল। তার সামনে জমবে না ওদের। তার পালানো। দরকার এখন। সে মহিলাকে একটা প্রণাম করে বলে–আচ্ছা। বাবার কোনও তাড়া নেই। সারাদিন তো একা।
মহিলা হাসলেন। বললেন–আমারও তাই। একা।
বলেই সামলে গেলেন। হেসে বললেন–ছেলেপুলে নেই তো।
খুব ধীরে শমীক দরদালানে বেরিয়ে আসে। বারান্দা পার হয়। সিঁড়ির মুখে চলে আসে। আর সেইখানে নিস্তব্ধ সিঁড়ির মুখে চুপ করে একটু দাঁড়িয়ে থাকে। কীসের জন্য যেন উন্মুখ ও উৎকর্ণ হয়ে থাকে। আর হঠাৎ শুনতে পায়, মৃদু একটা সুরের কেঁপে ওঠা। এস্রাজ বেজে উঠল।
নিশ্চিন্তে শমীক সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে।
.
দুপুরে যখন খেতে হোটেলে ফিরেছিল শমীক তখনও বাবা ফেরেনি। শমীক তাই বেরিয়ে পড়ল। মন ভালো ছিল না। এলোপাথাড়ি ঘুরল কেবল। বাবাজি চললেন। গাছের মতো, স্তম্ভের মতো বাবাজি আর থাকবেন না। তিনটে বোনের বিয়ে বাকি, ভাইরা এখনও নাবালক। কিন্তু সে সমস্যার চেয়ে বড় হচ্ছে শোক। সংসারের অপরিত্যাজ্য, অবিভাজ্য একজন থাকবে না। লোকটা তার প্রেমিকার বাড়িতে সকালে এস্রাজ বাজাতে বসেছিল। জানে না একটা কালো হাত নালি ঘা বেয়ে নেমে যাচ্ছে তার বুকের সুরের উৎসের দিকে। প্রাণঘড়ির কল টিপে বন্ধ করে দেবে। নার্সটা চেঁচিয়ে বলেছিল–ক্যানসার, থার্ড স্টেজ। কিছু করার নেই। সে কথা বাবা কি শোনেনি! কিংবা ডাক্তার মিত্রের লেখা চিঠিখানায় ‘হোপলেস’ শব্দটাও কি দেখেনি। নিশ্চিতভাবে! বড় অবাক লাগে। লোকটা নিশ্চিন্ত মনে এস্রাজ বাজাচ্ছিল আজ সকালেও।
