এই সব কথা বললেন ডাক্তার। একটা ছোট্ট চিঠি লিখে দিলেন হাসপাতালের ডাক্তারকে! বললেন–এটা ডক্টর সেনকে দেবেন। প্রেসক্রিপশন যা আছে তাই চলবে।
–কিছু করার নেই? খুব আস্তে, প্রায় ডাক্তারের কানে-কানে বলে শমীক।
ডাক্তার হাসলেন।
রাস্তায় একটা ল্যাম্পপোস্টের তলায় চিঠিটা খুলে দেখল শমীক। লেখা–ডিয়ার ডাঃ সেন, দি কেস ইজ হোপলেস। প্লিজ হেলপ দিস ম্যান। মিত্র।
বাবা শমীকের কাঁধের ওপর দিয়ে চিঠিটা দেখছিল কী লিখে দিল রে? হোপলেস! হোপলেস ব্যাপারটা কী?
চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে শমীক বলে–হোপলেস নয়। লিখেছে হেলপলেস। কলকাতায় আমরা তো কিছু জানি না, তাই লিখেছে। অসহায়।
–ও। বাবা একটু গম্ভীর হয়ে বলে–বত্রিশ টাকা নিল, কোনও প্রেসক্রিপশন দিল না?
–ওই ওষুধই চলবে।
–আর বেশি ছোটাছুটি করিস না। হাসপাতাল, ডাক্তার, এত কিছু করছিস কেন?
–অসুখ–বিসুখে এ সব একটু করতেই হয়।
–আমার আর ভালো লাগছে না। যা হওয়ার হবে, চল বাগানে ফিরে যাই।
শমীক মাথা নেড়ে বলে–তাই হবে।
বাবা উজ্জ্বল মুখে বলে–ঠিক তো?
–কাল রিজার্ভেশনের চেষ্টা করব।
বাসরাস্তায় এসে বাবা বলে–এখন কোথায় যাবি?
–কোথায় আর যাব! হোটেলেই ফিরে যাই চল।
বাবা একটু হাসে। বলে–কাছেই গড়িয়াহাটা। চল একটু দোকানপসার ঘুরে যাই। সস্তায় গণ্ডায় যদি পাই তো সকলের জন্য একটু জামাকাপড় নিয়ে যাব। পুজোর তো দেরি নেই। কলকাতায় একটু সস্তা হয়।
–এখন থাক বাবা। অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল!
–তোর জন্যই তো। খামোকা আজ বত্রিশটি টাকা দিলি।
–ভালো ডাক্তারকে দেখালে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
–চল, দোকানটোকান একটু দেখে যাই। গড়িয়াহাটের কাপড়ের দোকানের খুব নাম শুনি।
শমীক অগত্যা রাজি হয়। বাপ-ব্যাটায় হাঁটে গড়িয়াহাটার দিকে। বাবা গালের তুলোটা হাতের তেলোয় একটু চেপে ধরে রেখে বলে কলকাতায় এসে তো কেবল আমাকে নিয়েই হুড়যুদ্ধ করছিস। কাল বেরিয়ে একটু একা-একা ঘুরবি, সিনেমা থিয়েটার দেখবি। তোদের বয়সে কি কেবল রোগের চিন্তা ভালো লাগে! কাল বেরোস।
শমীক উত্তর দিল না।
পরদিন সকালে উঠে বাবা বলল –কলকাতায় যা শব্দ! রাতে ভালো ঘুম হয় না! বাগানে থাকতে থাকতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে নিশুতি নিঝুম না হলে চলে না। তার ওপর আবার ছারপোকা।
শমীক জামাকাপড় পরছিল। একবার রেলের বুকিং অফিসে যাবে।
বাবা শ্বাস ফেলে বলল –ঘায়ের ব্যথাটাও হচ্ছিল।
–বিশ্রাম নাও।
–একা ঘরে কি ভালো লাগবে?
–তবে কী করবে?
–একটু বেরোব ভাবছি। কলকাতা তো আর আমার অচেনা জায়গা নয়।
–শরীর খারাপ, একা বেরোনো কি ঠিক হবে? বাবা মাথা নেড়ে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে–শরীর কিছু খারাপ নয়। বেশ তো আছি। কাছেই যাব, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে। খগেন ওখানে থাকত।
–খগেনকাকা! তোমার বন্ধু তো!
ছেলের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বাবা বলে–হ্যাঁ। এখনও আছে কি না কে জানে! বিশ বছর খবর জানি না। বেঁচেই নেই হয়তো। আমাদের তো এখন সব যাওয়ার বয়স। একে একে সব রওনা হয়ে পড়ব।
শমীক বলল –খগেনকাকার ওখানে যাবেই যদি তাহলে তৈরি হয়ে নাও। আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে যাব।
বাবা একটু অবাক হয়ে বলে–তুই সঙ্গে যাবি?
–না হলে তুমি একা এই ভিড়ে যেতে পারবে নাকি?
বাবা একটু ইতস্তত করে বলে–চল।
মনে-মনে হাসে শমীক। খগেনকাকা বাবার কেমন বন্ধু তা সে জানে না। শুধু এইটুকু জানে, বাবা যৌবনবয়সে একটি মেয়েকে এস্রাজ শেখাত! সেই মেয়েটির প্রতি এক প্রগাঢ় দুর্বলতা জন্মেছিল। কিন্তু বাবা তাকে বিয়ে করতে পারেনি! বিয়ে করেছিল খগেনকাকা। সে ছিল বড়লোকের ছেলে। এ ঘটনা বাবা মাকে গল্প করেছিল। মায়ের কাছে তারা শুনেছে। খগেন নামটা শুনেই পূর্বাপর মনে পড়ে গেল।
সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। বিশাল বাড়ি! সিঁড়িতে এবং দেওয়ালের নীচের দিকে এখনও মার্বেল পাথর দেখা যায়। মস্ত দরজা হাঁ করে আছে। তবে বাড়ির শ্রী দেখলেই বোঝা যায় অবস্থা পড়তির দিকে। রং চটে গেছে, জানালা দরজার পাল্লা জীর্ণ, ভিতরের চিৎকার চেঁচামেচিতে বোঝা যায় যে দু-চারঘর ভাড়াটেও বসেছে।
একজন চাকর গোছের লোক তাদের ওপরে নিয়ে গেল। চিকফেলা বারান্দা, ডানদিকে ঘুরে দরদালান। দরদালানের প্রথম ঘরটায় তাদের বসিয়ে বলল বাবু এ সময়টায় থাকেন না। গিন্নিমাকে খবর দিচ্ছি।
বাবা একটু ইতস্তত করে বলে–খগেন বেরিয়ে গেছে?
–আজ্ঞে।
–তাহলে গিন্নিমাকেই বলো, অমিতাভ গাঙ্গুলি এসেছে। এক সময়ে তোমার গিন্নিমাকে আমি বাজনা শেখাতাম। বললে হয়তো চিনতে পারবে।
বলেই বাবা শমীকের দিকে চেয়ে হাসে। কুণ্ঠার সঙ্গে বলে–ছাত্রী ছিল।
শমীক সব জানে। তবু ভালোমানুষের মতো বলে–তাই নাকি।
বাবা শ্বাস ফেলে বলে–কতকালের কথা সব। খগেনটা সুদখোর ছিল। সুদেরই কারবার ওদের। কালোয়ারি ব্যাবসাও আছে বটে, তবে টাকা খাটানোটাই ছিল আসল।
এ ঘরটা বেশ বড়। পুরোনো আমলের বড় মেহগিনি টেবিল, আবলুশ কাঠের কালো চেস্ট অফ ড্রয়ার্স। সূক্ষ্ম সব ফুল লতাপাতা আর ময়ূরের কাজ করা বর্মা সেগুনের চেয়ার! চেস্ট অফ ডুয়ার্সের ওপরে একটা ঢাকনা দেওয়া বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় যে এটা এস্রাজ। পাশে একটা তবলা আর পেতলের ডুগি, গদি মোড়া হয়ে বিড়ের ওপর ঘুমোচ্ছে। বাবা এখনও গাঙ্গুটিয়ায় সন্ধের পর মাঝে-মাঝে এস্রাজ নিয়ে বসে। শমীক তবলা ঠোকে।
