ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। এসে দেখল, বাবা খুব নিবিষ্ট মনে সুটকেস গোছাচ্ছে! তাকে দেখে আনন্দিত স্বরে বলে–আয়। কোথায় ছিলি!
–ঘুরছিলাম। তুমি দুপুরে ফেরোনি?
–না। ছাড়ে নাকি! দুপুরে খাওয়াল। ঝোলভাত মেখে নরম করে দিল, ঘোল–টোল, শরবৎ, ফলের রস, কত কী!
শমীক হাসে। বলে–ভালো।
বাবার মুখে একটা রক্তাভা। একটু বুঝি হালকা পলকা তার মন। একটা হাওয়া এসে মনের। ওপরকার সব ধুলো উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বলল –একটা রাগ শেখাচ্ছিলাম সেই কবে! পুরোটা তখনও তুলতে পারেনি, হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল। আর শেখা হয়নি। আজ সারাদিন সেটা শিখিয়ে দিয়ে এলাম।
–ও।
–অসম্পূর্ণ একটা কাজ সম্পূর্ণ হল।
–খগেনকাকার সঙ্গে দেখা হয়নি?
বাবা একটু গম্ভীর হয়ে বলে–না। সে নাকি অনেক রাতে ফেরে। আমি আর বসলাম। রাত হয়ে যাচ্ছিল।
–রিজার্ভেশন পেয়েছি বাবা। কালকের।
–পেয়েছ। বাঃ নিশ্চিন্ত! বলে বাবা খুব খুশি হয়। বলে—
সব দিক দিয়েই ভালো হল। কী বলিস!
–হ্যাঁ বাবা।
বাবা খুব একরকম উজ্জ্বল হাসে। বিছানার ওপর ছড়ানো নতুন কেনা শাড়ি, প্যান্ট আর পাটের কাপড়, টুকটাক নানান জিনিসের দিকে মমতাভরে তাকিয়ে থাকে বাবা। বলে–জিনিসগুলো খারাপ কিনিনি, না রে? সবাই খুশি হবে।
শমীক একটু দুষ্টুমি করে বলে–কিন্তু অত দামি জিনিস কিনেছ! অত দামি জামাকাপড় তো আমরা কখনও পরি না।
–তা হোক, তা হোক। বাবা খুশির গলায় বলে–আমার তো এটাই শেষ পুজোর বাজার। এবারটায় না হয় দামিই দিলাম।
বড় চমকে যায় শমীক। একদৃষ্টে বাবার দিকে চেয়ে থাকে। তবে কি বাবা জানে! জেনেও
বাবা স্বাভাবিক আছে? এত আনন্দ। অত খুশির মেজাজ। শমীক মনে-মনে বলে, তবে কি জানে বাবা?
বাবা তার দিকে চোখ তুলে চায়। বলে–একটা অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ হল, বুঝলে। কমলাকে রাগটা শিখিয়ে এলাম। মনটা বহুকাল ধরে ভার হয়ে ছিল।
বাবা চুপ করে হাসিমুখে ছেলের দিকে চেয়ে থাকে। শমীক পরিষ্কার বুঝতে পারে, বাবার চোখ নিঃশব্দে তার প্রশ্নের জবাব দিল–জানি হে জানি!
সাঁঝের বেলা
শুষনি শাক তুলতে গিয়ে খেতে সাপ দেখেছিল মেজো বউ। ‘সাপ সাপ’ বলে ধেয়ে আসছিল, বেড়ায় আঁচল আটকে ধড়াস করে পড়ল। পেটে ছ’মাসের বাচ্চা। তাই নিজের ব্যথা ভুলে পেট চেপে কোনও সর্বনাশের কথা ভেবে কেঁদে উঠল চেঁচিয়ে।
রোদভরা উঠানে শান্ত সকালে নরম শরীর বলের মতো গুটিয়ে বসে আছে সাদা কালো। কয়েকটা বেড়াল। টিপকলের ধারে বসে বাসন মাজছিল ঝি সুধা। তাকে ঘিরে ওপর–নীচে ‘খা খা’ করে ডাকছে কাক। বড় পাজি কাক এখানে, লাফিয়ে এসে খোঁপায় ঠোক্কর দেয় সুধার। আশ থেকে পাশ থেকে এঁটোকাঁটা নির্ভয়ে খেয়ে যায়, কখনও বা সাবানের টুকরো, চামচ, ঠাকুরের খুদে প্রসাদের থালা গেলাস মুখে করে নিয়ে যায়। এবাড়ি–ওবাড়ি ফেলে দিয়ে আসে। বাসন মাজতে বসে সুধার তাই বড় জ্বালাতন। বসে-বসে সে কাকের গুষ্টির উদ্ধার করছিল–কেলেভূত, নোংরাখেকো, গুখেকো গুলোন, মর মর! ভগবানের ছিষ্টি বটে বাবা, যেমন ছিরি তেমনি স্বভাব! রোসো, কাল থেকে এঁটোকাঁটায় ইঁদুর মারা বিষ না মিশিয়ে দিই তো–তা কাকেরা শোনে না। কাটা ঘুড়ির মতো নেমে আসে। সুধার মুখের দিকে চেয়ে ‘খা’ বলে ডাকে, লাফিয়ে সরে যায়, আবার চেয়ে ডাকে ‘খা’।
বাঙালিয়া দুধ দিতে এসেছে। নোংরা ধুতি, গায়ে একটা নতুন সাদা ফতুয়া, কাঁধে নোংরা গামছা। অদ্ভুত দেখায় তাকে। দাঁড়িয়ে–দাঁড়িয়ে সে গোঁফ চুমরাচ্ছিল। দুধের ডেকচি এখনও মাজা হয়নি। ঝামেলা। একবার ডেকে বলছিল–এহ সুধারানী, বৰ্তন ভৈল? কেতো সময় লাগে। তুমার হাঁ? শুনে সুধা ঝামড়ে উঠেছিল–থামতো তুই খোট্টা খালভরা কোথাকার। আমি মরছি বটে নিজের জ্বালায়। বাঙালিয়া একটু হেসে খৈনির থুক ফেলে বলে কৌয়া তো খুব দিক করে তুমাকে? একঠো বন্দু মূলাও না।
বড়বউ চায়ের কেটলি আঁচল চেপে নামিয়ে কৌটো খুলে দেখে চা–পাতা নেই। কুমুকে ফের পড়া থেকে তুলে দোকানে পাঠাতে হবে, একটু আগে একবার দোকানে গিয়ে পাঁউরুটি আর ছোট খোকার রসগোল্লা এনে দিয়েছে। মেজাজটা বিগড়ে গেল বড় বউয়ের। জানালা দিয়ে ধমক দিল সে-ও সুধা, কেবল বক বক করলে কি হাত চলে? বাঙালিয়া কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। ওর তো আর বাড়ির গাহেক আছে না কি?
এই যে বড়বউয়ের মেজাজ বিগড়াল এর জের সারাদিন চলবে। একে তাকে ওকে সারাদিন বকতেই থাকবে যতক্ষণ না আবার তার বর বিষ্ণুচরণের মেজাজ বিগড়োয়। বিষ্ণুচরণ ধৈর্য হারালে বড়বউ পেটায়। মেজ হরিচরণ আবার তেমন নয়। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ বউকে দেখে। উঠানে হয়তো কাপড় মেলে মেজো বউ কলধারে একটু রুমাল গেঞ্জি কাচতে যায়, কি চুল শুকোয় তখন হরিচরণ জানালার পরদার ফাঁক দিয়ে কি কপাটের আড়ালে লুকিয়ে বউকে দেখে। কখনও কখনও আবার কোকিলস্বরে আড়াল থেকে বলে কু-উ! সেই শুনে আবার বড়বউয়ের বুক জ্বলে! বলে–এমন মাগীমার্কা ব্যাটাছেলে দেখিনি বাপু জন্মে। হরিচরণ আবার সেটা টের পায়, ডেকে বলে–বউদি গো, বউ আমার খাবে দাবে বসে থাকবে, শুধু তুলবে পাড়বে বিছানা।
যতীন এখন বুড়ো হয়েছে। হোমিওপ্যাথির ফোঁটা ফেলতে হাত কেঁপে যায়, এক ফোঁটার জায়গায় দু-ফোঁটা তিন ফোঁটা পড়ে গিয়ে ওষুধ নষ্ট। লোকে বলে–যতীন ডাক্তারের হাতের জোর নষ্ট হয়ে গেছে ছোট ছেলেটা মরার পর থেকে ছোট ছেলে ব্রহ্মচরণ অবশ্য বাপের সু–পুত্র ছিল না। দা, কুড়ুল দিয়ে বাপ ভাইদের কাটতে উঠত প্রায়ই বাড়ির মধ্যে। মুখে আনতে নেই। এমন মুখখারাপ করে গাল দিত! এ হল মেজাজের বাড়ি। সকলেই মেজাজওয়ালা মানুষ। ব্রহ্মচরণ আবার তার মধ্যেই ছিল নুনের ছিটে। সে মরায় এ বাড়ির লোক বেঁচেছে। মরল কীভাবে কে জানে! নিরুদ্দেশ বলে রা উঠেছিল, তারপর একদিন ঝিলে তার শরীর ভেসে উঠল। সারা গায়ে ছোরার গর্ত! কোনও কিনারা হয়নি, কিনারা করার আগ্রহও নেই কারও। কেবল বুড়ো যতীন ডাক্তার আজকাল ঝাঁপসা দেখে, হাত কাঁপে, রাতে ঘুমোতে পারে না, উঠে–উঠে বাইরে যায়, বিড়ি টানে, কাশে।
