পরেশ সাহাকে ইদানীং একটু ভয় পাচ্ছে সবিতা। টাকার ক্ষমতা যে অনেক তা সে জানে। পারেশ সাহা ইচ্ছে করলে তাকে যে-কোনও উপায়ে উচ্ছেদ করে দিতে পারে।
কিন্তু সবিতা তো কখনও স্বস্তিতে থাকেনি। তার সারা জীবনটাই তো নানা বিরুদ্ধতার সঙ্গে বেঁচে থাকা মাত্র। ভয় সে পায় বটে, কিন্তু খুব একটা অসহায় বোধ করে না। বস্তি আছে, ফুটপাত আছে। বাচ্চা দুটোকে নিয়েই যা চিন্তা।
খুব সম্প্রতি মাত্র দুদিন আগে পরেশ সাহার লোক বাসু বলে একটা ছেলে এসেছিল। সে একটু চোখ রাঙিয়ে গেছে। সবিতা বুঝতে পারছে বাড়িটা হয়তো সে রাখতে পারবে না। আজ সে তাই বস্তিতে ঘর দেখতে গিয়েছিল।
সন্ধেবেলা ফিরে সে এখন জিরোচ্ছে একটু। মেয়েটা পড়তে বসেছে। ছেলেটা তার কাছ ঘেঁষে বসে আছে। তার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই শান্ত। ওইটুকু বাচ্চা, তবু তারা মায়ের শ্রান্তি ক্লান্তি হতাশা এবং মেজাজ টের পায়।
দরজায় কড়া নড়তেই মেয়েটা উঠে গিয়ে খিল খুলল।
দরজার বাইরে একজন ভালো পোশাক–পরা যুবক দাঁড়িয়ে। দাড়ি আছে, গোঁফ আছে, চোখে কালচে চশমা, হাতে একটা স্যুটকেস।
বলল , ভিতরে আসতে পারি?
সবিতার চোর ডাকাতের ভয় নেই। চোর এলে বরং সবিতার পক্ষে লজ্জারই ব্যাপার। তবে এরকম সম্রান্ত চেহারার যুবককে দেখে সন্ত্রস্ত হল। তাড়াতাড়ি উঠে বলল , আসুন।
ছেলেটা ঘুরে ঢুকে বলল , আমি কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছি। সবিতা বলল , তার মানে? ছোঁকরা স্যুটকেসটা নড়বড়ে টেবিলটার ওপর রেখে খুলে ফেলল। তারপর একগাদা জিনিস বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগল। চকোলেট বার, সিরিয়াল, টিনের দুধ, খেলনা, সেন্ট, সাবান কত কী।
সবিতা সভয়ে বলল , এসব কী!
ছেলেটা হেসে বলল , আমি একটা বড় কোম্পানির সেলসম্যান। আমরা এসব জিনিস তৈরি করি। এগুলো ফ্রি স্যাম্পল। আপনাকে দাম দিতে হবে না। যদি ব্যবহার করে পছন্দ হয় তবেই কিনবেন।
সবিতা কাঁদো–কাঁদো হয়ে বলল , আমরা বড় গরিব। ওসব জিনিস কেনার সাধ্য আমাদের নেই। আপনি নিয়ে যান।
ছেলেটা হেসে বলল , তাতে কী? না কিনলে, না কিনবেন। কোম্পানি তো এগুলো ফ্রি–ই দিচ্ছে।
ছেলেটা চারদিকে একটু চেয়ে বলল , এটা কি আপনার বাড়ি?
হ্যাঁ, একরকম তাই। আমার স্বামীর বাড়ি। তবে কতদিন রাখতে পারব জানি না।
কেন বলুন তো?
আমরা গরিব তো, পয়সাওয়ালারা তুলে দিতে চাইছে। অনাথা বিধবা, কিছু তো করার নেই।
ও! আচ্ছা, আজ আসি।
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর সবিতা টেবিলের কাছে এসে যা দেখল তাতে তার চোখ চড়কগাছ। মাখন, চিজ থেকে শুরু করে বিস্কুট, টিনের খাবার, এসব ছাড়াও একটা হাতঘড়ি অবধি দিয়ে গেছে। এরকম হয় নাকি? সে স্বপ্ন দেখছে না তো!
ছেলেমেয়েরা জীবনে এত সুখাদ্য খায়নি। সবিতার রাতে ভালো করে ঘুম হল না। বারবার ছেলেটার দাড়িওলা মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।
দুদিন বাদে পরেশ সাহা এক সকালে এসে হাজির। মুখে বিরক্তি। বউমা, এসব কী? বাড়ি বিক্রি করবে না তা সাফ জানিয়ে দিলেই হত। পুলিশে খবর দিতে গেলে কেন?
সবিতা অবাক হয়ে বলল , খবর দিইনি তো!
না দিলে তারা এসে আমাকে এমনি শাসিয়ে যায়?
আরও দিনসাতেক পরে ছেলেটা এক সন্ধেবেলা এসে হাজির। আজও হাতে স্যুটকেস।
সবিতা তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে একটা চেয়ার পেতে বসতে দিয়ে বলল , সেদিন আপনি ভুল করে একটা ঘড়ি রেখে গেছেন।
না, ভুল করে নয়।
ভুল করে নয়?
না, ভুল করে রাখব কেন?
আপনার কোম্পানি কি ঘড়িও তৈরি করে?
ছেলেটা হেসে বলল , না। তবে সেলস প্রমোশনের জন্য কাস্টমারকে ছোটখাটো উপহার দেওয়া হয়।
কিন্তু আমি তো কাস্টমার নই!
আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাজ করি। আপনার নাম আমাদের কম্পিউটারই সাজেস্ট করেছে।
এসব কথার অর্থ জানে না সবিতা। তবে সে আজ এই সুঠাম যুবকটিকে ভালো করে দেখল। স্বাস্থ্যবান, ছমছমে চেহারা, সবিতার মতোই বয়স হবে। হ্যাঁ, এরকম একটি যুবকের সঙ্গেই তো বিয়ে হতে পারত তার। এক অক্ষম, গরিব, বৃদ্ধ দোজবরের সঙ্গে নামমাত্র বিয়ে কেন হল তার? সবিতার ব্যর্থ যৌবন কোনও পুরুষকেই আকাঙ্ক্ষা করতে পারেনি ভয়ে। আজ অযাচিত সাহায্যকারী এই যুবকের দিকে মুগ্ধ চোখে একটু চেয়ে রইল সে। লাচ্ছ্বও চেয়ে ছিল। মহিলার বয়স ত্রিশ-একত্রিশ হতে পারে। দারিদ্র্যের অবশ্যম্ভাবী রসকষহীনতাকে বাদ দিলে মহিলা সুশ্রীই। স্বাস্থ্য ফিরলে এঁর রূপ উপেক্ষা করার মতো হবে না।
লাচ্চু স্যুটকেস খুলে বলল , আজ কিন্তু পোশাক–আশাক আছে। রেখে যাচ্ছি।
যেসব জিনিস স্যুটকেস থেকে বেরোল তা দেখে আতঙ্কিত সবিতা বলল , এসব কী করছেন? আমাকে বিক্রি করলেও যে দাম উঠবে না।
কয়েকটা শাড়ি, ফ্রক, জামা-প্যান্ট নামাল লাচ্চু। তারপর সবিতার দিকে ফিরে বলল , আপনার বাড়িটার সংস্কার দরকার।
হ্যাঁ। কিন্তু আমার সাধ্য তো নেই।
শুনুন। আমাদের ফার্মটা হচ্ছে ফ্রেন্ড অফ দি আনলাকিজ। অর্থাৎ যাদের ভাগ্য খারাপ আমাদের ফার্ম তাদের সাহায্য করে। কিন্তু সেটা দয়া বা করুণা নয়। আপনাকে কোম্পানির তরফ থেকে কুড়ি হাজার টাকার একটা লোন দিয়ে যাচ্ছি। এখন নয়, দশ বছর পর থেকে আপনি লোনটা ধীরে-ধীরে শোধ করবেন।
সবিতার কেমন যেন ধন্ধ লাগছিল। সে হঠাৎ বলল , আমার এসব কথা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে। না। এরকম হয় না।
