হয়। হবে না কেন?
সবিতার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। কিন্তু এই সুঠাম যুবকটির দিকে চেয়ে আজ তার বুকে একটা অদ্ভুত দোলা আর আবেগ কাজ করছে। সে একে প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না। সবিতার চোখে জল এল। সে লিত কণ্ঠে বলল , আপনি আমাকে দয়া করছেন।
একদম নয়। আমার সঙ্গে লোনের কাগজপত্র আছে। আপনি পড়ে সই করে দিন।
একটুও বিশ্বাস করল না সে ছেলেটাকে। কিন্তু এক চোরা আনন্দে বুক ভেসে যাচ্ছিল তার। এমনকী হতে পারে যে, এই যুবক তার প্রেমে পড়েছে? সবিতা সই করল এবং করকরে কুড়ি হাজার টাকা নিল।
দুদিন বাদে ছেলেটা একটা ঝকঝকে গাড়ি নিয়ে এল সকালবেলায়।
চলুন, আপনাদের একটু আউটিং–এ নিয়ে যাই।
সবিতা মুচকি হেসে বলল , এটাও কি সেলস প্রমোশন?
হ্যাঁ, এ সবই সেলস প্রমোশন।
ছেলেটার দেওয়া নতুন শাড়ি পরল সবিতা, বাচ্চাদেরও সাজিয়ে নিল। এবং জন্মে যা কখনও করেনি আজ তাও করল সে, একটু সাজল। চোখে কাজল, কপালে টিপ।
ছেলেটা নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। রেস্টুরেন্টে দারুণ খাওয়াল এবং কিনে দিল আরও নানা দামি উপহার। সেই উপহারের মধ্যে সবিতার জন্য চার ভরি সোনার একটা হার, চার গাছা সলিড সোনার চুড়ি এবং বাচ্চাদের জন্য হার আর আংটি।
সবিতা বারণ করার অনেক চেষ্টা করেও পারল না। ঠিক কথা আজ সবিতা অনেকটা বিবশ, রসস্থ। সে তেমন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেও পারল না। তার মনে হচ্ছে, তার জীবনে এই প্রথম একজন সত্যিকারের পুরুষের সবল প্রবেশ ঘটছে। সে ঠেকাবে কেন সেই অনুপ্রবেশ? জীবনে সে তো কিছুই পায়নি।
বিকেলে তারা একটা থিয়েটার দেখল। বাচ্চাদের একপাশে রেখে সবিতা ইচ্ছে করেই ছেলেটার পাশে বসল। অন্ধকারে সে ইচ্ছে করেই হাত ধরল ছেলেটার। ধরে রইল।
ছেলেটা আসতে লাগল ঘন ঘন। সবিতার এখন পুষ্টিকর খাবারের অভাব হচ্ছে না। বাড়িটার শ্রী ফিরেছে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে তার। তবে ছেলেটা কখনও প্রেমের কথা বলে না। তাকায় আর হাসে। সবিতার কাছে তাই যথেষ্ট।
সবিতা এক সন্ধেবেলা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে বলল , তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও? চাইলে মুখ ফুটে বলো না কেন?
৩.
লাচ্চু একেবারে একটা খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। লাফ দেবে? সম্পর্কটা সংস্কার ছাড়া আর কী? এই ভদ্রমহিলাকে তার বৃদ্ধ বাবা অন্যায়ভাবে বিয়ে করেছিল। সেই অন্যায়কে স্বীকৃতি না। দিলে ক্ষতি কী? দুনিয়া তো চলেছে সংস্কার ভাঙার দিকেই। সবিতাকে কয়েকদিন দেখে তার
মেয়েদের সম্পর্কে অনেক বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে গেছে। দারিদ্র্য, অপমান, অবিচার সয়ে বড় হওয়া এই মহিলা যেমন সাহসী–তেমন সহনশীলা। লাচ্চু কি চোখ বুজে লাফটা দেবে? আমেরিকার মুক্ত সমাজে সব চলে। অতীত লুপ্ত হয়ে যাবে। দেবে লাফ?
লাচ্চুর অতীত বলতে যা, সেটা মনে না রাখলেও চলে। সব ভুলে যাওয়া যায়। একটা দুটো কথা মাঝে-মাঝে হানা দেবে ঠিকই। কিন্তু ওসব মাছির মতো উড়িয়ে দেওয়া যাবে। নতুন একটা সম্পর্ক হোক।
সন্ধেবেলা লাচ্চু গিয়ে দেখল আজ বাড়িটা একটু সাজানো হয়েছে। টেবিলের ওপর তার। বাবার ছবি বসানো, গলায় মালা, সামনে ধূপ জ্বলছে।
এসব কী? সবিতা একটু লজ্জা পেয়ে বলল , বিলু তার বাবার জন্মদিন পালন করছে। আজ কি বাবার জন্মদিন?
হ্যাঁ। এসব বিলুই মনে রাখে। বাবাকে খুব ভালোবাসত তো? আঠাশে কার্তিক কবে আসে ঠিক হিসেব রাখে।
ও।
ওর বাবা ওকে বলত একটা ছেলে ছিল, একটা মেয়ে, কাউকেই আদর দিতে পারিনি। দুটোই হারিয়ে গেল। তোরা হারিয়ে যাস না। আমাকে মনে রাখিস। শোনো, আজ তুমি এখানেই খেয়ে নাও। রান্না করছি।
লাচ্চু খেল। মাথা নীচু করে, শক্ত হয়ে এবং কথা না বলে। এ-বাড়িতে বাবার একটা ছবি ছিল, এটা খেয়াল ছিল না তার। টেবিলের ওপর বাবার গড়ানে বয়সের ছবি থেকে একজোড়া চোখ তাকে স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল।
একটা ছবি সব ভণ্ডুল করে দিল নাকি? বড় গ্লানি লাগছে যে ভিতরে।
লাচ্চু পরদিন রাতে প্লেন ধরল। ফিরে এল নিউইয়র্কে তার কুইনসের বাড়িতে। চুপচাপ এবং একা কাটাল দুটো দিন। তারপর সাহস করে একটা এয়ারোগ্রাম বের করে সবিতার ঠিকানায় লিখল। তারপর আরও একটু সাহস করে পাঠ লিখল, শ্রীচরণেষু মা….
সম্পূর্ণতা
ঠিক পুরুষের মতো গলায় একজন বয়স্কা নার্স চেঁচিয়ে ডাকছিল।
–অমিতাভ গাঙ্গুলি কে? অমিতাভ গাঙ্গুলি? বাবার মুখ নোয়ানো। হাতের ওপর থুতনি রেখে বোধহয় চোখ বুজে আছে। ডান গালে স্টিকিং প্লাস্টারে সাঁটা তুলোর ঢিবি। ডাক শুনে মুখ তুলে শমীকের দিকে তাকাল। শমীক উঠে দু-পা এগিয়ে থতমত গলায় বলে–এই যে এখানে।
নার্স হাতের কাগজটার দিকে চোখ রেখেই বলে–ক্যানসার। থার্ড স্টেজ। কিছু করার নেই।
–তাহলে? শমীক প্রশ্ন করে।
উত্তর অবশ্য পায় না। নার্স পরের নাম ধরে ডাকছে–নওলকিশোর ওঝা—
বাবা ওঠে।
–কী বলল ?
শমীক যথার্থ বুদ্ধিমানের মতো বলে–কত ভুলভাল বলে ওরা! এর রোগ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।
–থার্ড স্টেজ না কী যেন বলছিল! বাবা ধীরে-ধীরে বলে।
–রোগটা প্রাইমারি স্টেজে আছে আর কি। ওষুধ পড়লেই সারবে।
হাসপাতালের বাইরে এসে শমীক বলে ট্যাক্সি নেব বাবা?
–ট্যাক্সি কেন আবার? তিন নম্বরে উঠে শেয়ালদা চলে যাব।
শেয়ালদার হোটেলে ফিরে বাবা তার প্যান্ট ক্রিজ ঠিক করে রেখে যত্নে ভাঁজ করল। হ্যাঙারে টাঙাল জামা। লুঙ্গি পরতে-পরতে বলল –থার্ড স্টেজ মানে কি প্রাইমারি স্টেজ?
