লাচ্চু চিনল। তাদের পাড়ার মোহিতবাবু। ছেলে আমেরিকায় এসেছে বছরদুয়েক। সেই সুবাদেই এসেছেন। এ-কথা সে-কথার পর বললেন, তুমি যে বেঁচে আছ এটাই তো জানা ছিল না আমাদের। তোমার পুরো ফ্যামিলিটাই তো শেষ। তবে সবিতা আছে, সে বড় ভালো মেয়ে।
লাচ্চু বলল , আমি তো ওঁকে চিনি না।
না চেনারই কথা।
ওঁরা খুব কষ্টে আছেন?
কষ্ট বলে কষ্ট? তোমার বাবা তো কিছু রেখে যাননি। সবিতারও বাপের বাড়ি বলতে কিছু নেই, এক মামার কাছে মানুষ। খুবই কষ্ট ওদের। বাড়িটা আছে বলে রক্ষে। নইলে ভেসে যেত।
লাচ্চু আবার ভাবনায় পড়ল। তার অনেক টাকা। যদি বিয়ে না করে বা পুষ্যি না নেয়, তা হলে তার মৃত্যুর পর টাকাপয়সার গতি কী হবে কে জানে! না, সবিতা রায় বা তার ছেলেমেয়ে তার আপনজন নয়, তবু ক্ষীণ একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়।
অনেক ভাবল সে। তারপর তার পার্টনারকে ব্যাবসা চালানোর ভার দিয়ে সে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে ভারতমুখী প্লেনের টিকিট কেটে উড়ে গেল।
২.
সবিতার রোগভোগা শরীরের মধ্যে প্রকট মাত্র দুটি চোখ। লোকে বলে সবিতার চোখ নাকি জ্বলে। সবিতা অবশ্য সে-খবর রাখে না। তার জীবনটা কেটেছে আদ্যন্ত ঘৃণা ও আক্রোশের এক বলয়ের মধ্যে। শিশুকালে পিতৃ–মাতৃহীন সবিতা ছিল মামার গলগ্রহ। আক্ষরিক অর্থেই তাকে লাথি–ঝাঁটা খেয়ে বড় হতে হয়েছে। সে ছিল কার্যত মামার বাড়ির বিনা পয়সার ঝি। খাণ্ডার মামি দুনিয়ার যত ঝাল ঝাড়ত তারই ওপর। মামাও যে ভালো কিছু ছিল তা নয়। সবিতাকে ক্লাস ফোর অবধি পড়িয়েছিল মামা। তার পর স্কুল থেকে ছাড়িয়ে পুরোপুরি গৃহকর্মে লাগিয়ে দেয়। সবিতার প্রাণের জোর ছিল বটে। নইলে একবার কলেরা, একবার টাইফয়েড এবং সবশেষে প্লুরিসি হয়েও সে বেঁচে যায়। প্রতিবারই তাকে পাঠানো হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর হাসপাতালের জেনারেল বেড–এ। টি বি হয়েছিল আঠার বছর বয়সে। মামা বা মামি কেউই তাকে ঘরে ঠাঁই দিতে রাজি ছিলেন না আর। সবিতা কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। শেষে যাদবপুরের টি বি হাসপাতালে ঠাঁই হয়। এবং আশ্চর্যের বিষয়, নিছক প্রাণশক্তির জোরেই সে আরোগ্য লাভ করে। মামা–মামি সন্দিহান থেকেও তাকে ফের ঘরে ঠাঁই দেন বটে, কিন্তু খুশি হয়ে নয়। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তার বিয়ের জোগাড় হল। পাত্রর বয়স ছাপ্পান্ন, বিপত্নীক।
বিয়ের আনন্দ কিছু ছিল না, শুধু স্থান বদলের স্বস্তিটা আশা করেছিল সবিতা। এই বয়স্ক পুরুষের কাছ থেকে প্রত্যাশাই বা কী ছিল তার? লোকটাকে ভালোবাসার কোনও চেষ্টা সে করেনি, সম্ভবও ছিল না। তবে লোকটা দুঃখী মানুষ। ছেলে নিরুদ্দেশ, বউ মারা গেছে, ঘরে
বয়সের মেয়ে। এই মেয়ে সাবিত্রীর বিয়ে দিতে হবে বলেই লোকটা সবিতাকে বিয়ে করেছিল পাঁচ হাজার টাকা নগদ নিয়ে। সেই পাঁচ হাজার আর সবিতার দেড় ভরি গয়না নিয়ে আর কিছু ধারকর্জ করে সাবিত্রীকে পার করল। তারপর বছর না ঘুরতেই সাবিত্রী গেল, তারপর লোকটাও গেল। রেখে গেল দুটো সন্তান।
ঘৃণা আর আক্রোশ ছাড়া সবিতা জীবনে কিছুই পায়নি। এখনও সে মানুষের কাছ থেকে তাই পায় এবং তাতেই স্বস্তি বোধ করে। মানুষ তাকে দয়া বা করুণা করলেই বরং সে ভয়ঙ্কর অস্বস্তি বা অপমান বোধ করে। ও তার অভ্যস্ত জিনিস।
তথাকথিত স্বামীর মৃত্যুর পর সবিতা তথাকথিত বিধবা হল। সধবা আর বিধবার তফাত সামান্যই। দুর্দশা বা দুর্গতি যেমন ছিল তেমনই রইল। দুটো সন্তান তার কোনও ভালোবাসার ফসল নয়। তবু সন্তান আঁকড়েই বেঁচে থাকার একটা চেষ্টা করতে হলো তাকে। লেখাপড়া জানা নেই, কোনও হাতের কাজটাজও শেখেনি, চাকরিটা হবে কীসে? সবিতা কারও কাছে হাত পাতল, অযাচিত সাহায্য ফিরিয়ে দিল এবং চাকরি খুঁজতে লাগল। মেয়েটা ছয় বছরের, ছেলেটার পাঁচ। ছয় বছরের মেয়ে প্রয়োজনের তাগিদে শিশু বয়সেই সাবালিকার মতো দায়িত্ব নিতে শিখে গেল। প্রয়োজনে মানুষ সব পারে। তার হেফাজতে ছেলেকে রেখে সবিতা বাইরে বেরুতে লাগল। কাজ জুটল আয়ার। এক হাসপাতালে।
আয়ার কাজে বাঁধা বাইনে নেই। কাজ পেলে বাঁধা রেটে টাকা। কখনও-সখনও বকশিস বা শাড়িটা জামাটা পাওয়া যায়। গ্রাসাচ্ছাদন চলে বটে তার। কিন্তু এত কষ্ট যে বলার নয়। সবিতাকে পাঁচ-দশ পয়সারও হিসেব করে চলতে হয়। অসুখ–বিসুখ হলে অগাধ জল।
তার তথাকথিত স্বামী বাড়িটাই যা রেখে গেছেন। ছোট এবং পুরোনো দু-ঘরের এই বাড়িটুকুই এই গোটা দুনিয়ায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তবে পাড়া–পড়শিরা অনেকেই তাকে ভয় দেখায়, আছ তো বাপু ভালোই, কিন্তু লাচ্চু যদি ফিরে আসে তা হলে এই বাড়িতে কি থাকতে পারবে? সে তোমাকে তাড়িয়ে ছাড়বে। ভীষণ বদমাশ ছেলে। লাচ্চুর কথা সে তার তথাকথিত স্বামীর কাছে শুনেছে। হ্যাঁ, লাচ্চু মস্ত দাবিদার। যদি ফিরে আসে এবং সবিতাকে তাড়ায় তাহলে সে কোথায় যাবে তা ভেবে পায় না। এই একটা ভয় তার আছে। লাচ্চু। কেউ কেউ বলে, সে সাধু হয়ে গেছে, কেউ বলে মরে গেছে, কেউ বলে সে জীবনে উন্নতি করে ফেলেছে। লাচ্ছ্বর আসল খবর কারও জানা নেই। এবং সেইটেই চিন্তা এবং ভয়ের বিষয়।
পাশের বাড়িটা পরেশ সাহার। পরেশবাবু ইদানীং হঠাৎ ব্যাবসা–বাণিজ্যে উন্নতি করেছে। ইদানীং তিনি মাঝে-মাঝে সবিতার কাছে বাড়িটা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। দামটা খারাপ দেবেন না। কিন্তু সবিতা রাজি হয়নি। তার কারণ টাকা সে রাখতে পারবে না। মাঝখান থেকে পৃথিবীর শেষ আশ্রয়টুকু হাতছাড়া হবে। তার ওপর এ বাড়ি তো তার একার নয়। লাচ্ছ্বরও ভাগ আছে। পরেশবাবু অবশ্য বলেছেন, লাচ্চু বেঁচে নেই বউমা। যদি থাকে তা হলে তার দায় আমার। আমি ওর সঙ্গে বুঝে নেব।
