লাচ্চু নিজে কথা বলতে-বলতে বারবার মা-বাবার কথা ভাবছিল।
শমিত বলল , তুই আজ খুব আনমনা।
লাচ্চু মাথা নেড়ে বলল , হ্যাঁ। অনেকদিন ডলার ছাড়া আর কিছুই চিন্তাই করিনি। এখানে এসে কষ্ট আর লড়াই কম করতে হয়নি। মা-বাবা বা বোনটার কথা মাঝে-মাঝে মনে পড়ত বটে কিন্তু টাকা ছিল না। আজ হঠাৎ তোর মুখে মা আর বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে হঠাৎ কেমন রুটলেস লাগছে। বাংলায় বোধহয় ছিন্নমূল বলে।
শমিত তিন নম্বর দুঃসংবাদটা দিল বিদায় নেওয়ার আগে। লাচ্চু তাকে বলেছিল, দেখ, দুনিয়ায় তো আমার আপনজন বলতে এখন শুধু বোনটা। তার ঠিকানা জানিস?
শমিত একটু দ্বিধায় পড়ল। তারপর বলল , দেখ, তোকে পরপর খারাপ খবর দিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। তবু দিচ্ছি। তার কারণ, লক্ষ করলাম তুই বেশ শক্ত মানুষ। শাক–সংবাদগুলো তোকে কাহিল করেনি তেমন।
লাচ্চু উদ্বেগের সঙ্গে বলে, তার মানে কী? সাবিত্রী কি বেঁচে নেই?
না। বিয়ের এক বছর বাদে বাচ্চা হতে গিয়ে ইনফেকশানে মারা যায়।
লাচ্চু মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বলল , মা-বাবার তবু বয়স হয়েছিল, কিন্তু সাবুটার তো অল্প বয়স। হ্যাঁ রে, তিন–তিনজন মরে গেল? এরকমও হয় নাকি?
ব্যাড লাক রে ভাই, কী করবি?
তা হলে কি আমার আর কেউ নেই?
ভারচুয়ালি না। তবে যদি সত্মাকে ধরিস তা হলে বলতে হবে, আছে।
দুর! সৎ মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কীসের?
শমিত কথাটা স্বীকার করল। বলল , হ্যাঁ, সত্মায়েদের সম্পর্কে আমরা ভালো কথা কখনও শুনিনি বিশেষ। তবে এই ভদ্রমহিলাকে আমি দেখেছি। খুবই রোগভোগা মানুষ। দুটো বাচ্চা, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। তোর বাবা তো তোর বোনের বিয়ে দিতে গিয়েই ফতুর হয়ে যান, ফলে এদের জন্য বিশেষ কিছু রেখে যাননি। ভদ্রমহিলা খুব সামান্য একটা আয়া বা ওই ধরনের কাজ করেন। খুব কষ্ট।
লাচ্চুর ভিতরে কথাগুলো ঢুকলই না। তার চোখে আজ বারবার জল আসছিল। অতীতটা একেবারেই মুছে গেল। শিকড়ের আর কোনও বন্ধন নেই। তিনটে মুখ বারবার ঘুরেফিরে স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল। মা, বাবা, সাবি।
এক উইক এন্ডের শেষ রবিবার বিকেলে শমিত চলে যাওয়ার পর একা হল লাচ্চু। একা হয়েই বুঝতে পারল, কতখানি একা সে। চারদিকটা যেন খাঁখাঁ করছে। ধূধূ করছে। কুড়ি বছর বয়সে যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তখন লাচ্চুর পিছুটান ছিল না। সামনে ছিল শুধু অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ, বুকে ছিল বেপরোয়া সাহস এবং আত্মনির্ভরতা। উনত্রিশ বছর বয়সে এখন লাঞ্জু আর তা নেই। আমেরিকার কাজ পাগল সমাজে এমনিতেই মানুষ একটু একা। তার ওপর এখানে পারিবারিক বন্ধন জিনিসটা তেমন দৃঢ় নয়, তাই মানুষ আরও একা। কাজ নিয়ে থাকে, তাই ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। লাচ্চু আমেরিকান নাগরিক বটে, কিন্তু চরিত্রে তা নয়। ফলে তার মধ্যে একটা হঠাৎ অসহায় একাকিত্ব আজ বারবার গুমরে উঠছে। কুইনসের এই মাঝারি বাড়িটা যেন বড্ড ছমছম করছে। লাচ্চু রাতে খেল না। অনেক রাত অবধি কাঁদল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
শেষ রাতে একটু ঘুমোল। সকালে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিত্যদিনের কাজে। কাজ, কাজ ছাড়া এই একাকিত্বকে ভুলে থাকবার কিছু নেই। সে মেরামতির কারবার একজন গুজরাটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সে কম্পিউটারের ব্যাবসা করে। বেশিরভাগই কন্ট্রাক্ট মেইনটেনেন্স। তাতে তার প্রচুর ডলার আয় হয়।
লাচ্চুর সংসার নেই, মদ খায় না, ফুর্তি করে না, বেড়াতে ভালোবাসে না। সুতরাং তার ডলার। শুধু ব্যাঙ্কে জমা হয়। কিছু খাটে শেয়ার বাজারে। এই অর্থাগমটা তার ক’দিন হল অর্থহীন লাগছে।
মাসখানেক বাদে সে শমিতকে ফোন করল। এ-কথা সে-কথার পর হঠাৎ জিগ্যেস করল, আচ্ছা সেই ভদ্রমহিলার নাম কী বল তো!
কোন ভদ্রমহিলা?
আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের কথা বলছি।
কেন বল তো?
ভাবছি, ভদ্রমহিলা কষ্টে আছেন, কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।
শমিত উৎসাহের গলায় বলল , ভালোই হবে রে, এটা বেশ ভালো একটা ডিসিশন নিয়েছিস। তবে একটা কথা বলে রাখি তোকে, উনি কিন্তু খুব পারসোনালিটিওলা মহিলা। সহজে কারও কাছে হাত পাতেন না। তোর বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই ওকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনও এমএলএ-র কাছে যেতে। উনি যাননি। একটা পুজো কমিটি থেকে কিছু সাহায্য দেওয়া হয়েছিল, তাও নেননি। আত্মসম্মানবোধ খুব বেশি। যদি টাকা পয়সা পাঠাস তাহলে একটা নরম করে চিঠি দিস।
যদি রিফিউস করে তাহলে?
সম্ভাবনা আছে।
তা হলে থাক বাবা, পাঠানোর দরকার নেই।
তবু নামটা জেনে রাখ। ওঁর নাম সবিতা রায়।
লাচ্চু প্যাডে নামটা নোট করে নিল বটে, কিন্তু সেটা যে কোনও কাজে লাগবে না তাও মনে হল তার।
লাচ্চুর হাড়ভাঙা পরিশ্রম এবং ছোটাছুটির মধ্যে আবার হারিয়ে গেল সবিতা রায় এবং তার দুই বাচ্চার কথা। মনে রাখার কথাও নয় লাচ্চুর। নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে লাচ্ছ্বর মাখামাখি না থাকলেও সম্পর্ক আছে। বাঙালিদের অনুষ্ঠানে চাঁদা দেয়, বাংলা নাটক দেখতে যায়, বাঙালি গায়ক–গায়িকা এলে টিকিট কেটে গান শুনে আসে, দুর্গাপুজো বা বঙ্গ সম্মেলনেও যায় ফি বছরই। তবে এসব বাঙালিয়ানার ব্যারাম তার কাছে গভীর কিছু নয়। কুইনসে উইক এন্ডের এক দুর্গাপুজোয় হাজির ছিল লাচ্চু। বাঙালিদের বেশ সুন্দর একটা জমায়েত। খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, চমৎকার নিরামিষ তরকারির গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে। পেপার মাসের তৈরি দুর্গামূর্তির সামনে রেকাবিতে ডলার প্রণামী জমা হচ্ছে। মন্ত্রপাঠ, অঞ্জলি, কোনওটাই বাদ নেই। সেই জমায়েতে এক বৃদ্ধ এসে তাকে ধরলেন, তুমি লাচ্চু না?
