কষ্টে কিছু টাকা জমিয়ে এবং ফাঁকে-ফাঁকে সারাইয়ের কাজ লিখে লাচ্চু তৈরি হতে লাগল। সে আলাপি এবং মিশুকে ছেলে। টকাটক বেশ কিছু জানপয়ান হয়ে গেল তার। যন্ত্র সারানোনার ডাকও আসতে লাগল ঘনঘন। সেইসঙ্গে ডলার।
দু-বছর বাদে জেনারেল অ্যামনেস্টি ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমেরিকান নাগরিক হয়ে গেল। বাঁচোয়া। ব্রংকস বরোতে একটা ঘিঞ্জি পাড়ায় শেয়ারে একটা দোকানঘর করল সে। সেখানে পুরোনো যত ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে পার্টর্স খুলে নিয়ে গুছিয়ে রাখত সে। পরে অন্য সব মেশিনে সেগুলো লাগাত।
মজা হল আমেরিকানরা সব জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিতে চায় না। কোনও জিনিসের সঙ্গে হয়তো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাজেই লাচ্চু যখন স্থানীয় একটা দৈনিক পত্রে বিজ্ঞাপন দিল তখন তার দোকানে বেশ খদ্দের আসতে লাগল, এবং ডলারও।
নৰ্মা নামে একটি মার্কিন মেয়েকে সে বিয়ে করে তেইশ বছর বয়সে। কিন্তু মেয়েটা বড্ড উড়নচণ্ডী। বিয়েটা আপসে ভেঙে গেল এক বছর বাদে। দ্বিতীয় বিয়েটা সে করল পঁচিশ বছর বয়সে। ছাব্বিশে সেটাও ভাঙল। পরের বিয়েটা সে করল একটা বাঙালি মেয়েকে। দেখা গেল, মেয়েটা পাগল। বাপ-মা পাগলামির কথা চেপে রেখে বিয়ে দিয়েছিল যখন মেয়েটার কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিকত্ব ফিরে এসেছিল। সাতাশ বছর বয়সের মধ্যেই তিন–তিনটে বিয়ে ও বিচ্ছেদ থেকে লাচ্ছ্বর ধারণা হল, বিয়ে তার কপালে নেই, ও তার সইবে না। সে টাকা রোজগারে মন দিল।
ঊনত্রিশ বছর বয়সে লাচ্চু এখন মাঝারি ধনী। তার তিনটে দোকান বেশ রমরম করে চলে।
লাছুর সঙ্গে একদিন দেখা হল পুরোনো এক বন্ধুর। সে আমেরিকায় পড়তে এসেছিল। লাছুর সঙ্গে বাড়ির কোনও যোগাযোগই ছিল না। শমিতের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ম্যানহাটনের রাস্তায়। অনেক কথার পর অবশেষে বন্ধু শমিত বলল , বাড়ির কোনও খবর রাখিস না?
না। কেন বল তো!
তোর বাবা চার বছর আগে মারা গেছেন।
সে কী!
তুই পালিয়ে যাওয়ায় শক পেয়েছিলেন তো। তাই—
লাচ্চুর মনটা তার অত্যাচারী বাবার শোকে বেশ কাতর হয়ে পড়ল। চোখে জল এল। ঠিক কথা যে, ছেলেবেলা থেকে বাবার আদর বা প্রশয় সে পায়নি। রাগি বাবা কারণে–অকারণে বেধড়ক মারত। এও সত্যি বাবার হাত থেকে বাঁচবার জন্যই সে বাড়ি থেকে পালায়। বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কের পূর্ণচ্ছেদও সেইখানেই ঘটে যায়। তবু আজ হঠাৎ মৃত্যুসংবাদটা পেয়ে মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল তারও।
সে বলল , মা কি বেঁচে আছে?
শমিত একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল , আছে।
কিন্তু শমিতের মুখের ভাব অন্য কথা বলছে। লাচ্চু বলল , তুই একটা কিছু চাপছিস। খুলে বল।
তুই পালিয়ে আসার পর তোর মা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি–বাড়ি ঘুরে তোকে খুঁজত। সারা রাত সদর দরজা খুলে বসে থাকত। তারপর একদিন পিছনের পুকুরে ভোরবেলা তার লাশ পাওয়া যায়।
লাচ্চু অস্থির হল না। কিন্তু কাঁদল। বাবার মৃত্যু নয়, মায়ের মৃত্যুর জন্য সে সরাসরি দায়ী। বলল , বাবা কি আবার বিয়ে করেছিল?
হ্যাঁ। তো সেই মা বেঁচে আছে।
আমার ছোট বোনটা! তার খবর কী?
বিয়ে হয়ে গেছে।
তারা কি জানে যে, আমি এখানে আছি?
শমিত মাথা নাড়ল, না। তোর খবর কেউই তো জানে না। সবাই ধরেই নিয়েছে, হয় তুই বেঁচে নেই, না হলে সাধু হয়ে গেছিস। কিন্তু তুই তো দেখছি আমেরিকায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছিস।
অনেক লড়াই করতে হয়েছে, ধৈর্য ধরতে হয়েছে।
শমিত একটু হতাশার গলায় বলল , আমি তো অনেক লেখাপড়া শিখে এসেছি, এখানেও পি এইচ ডি করলাম, কিন্তু আমার যা সাকসেস বা টাকা হয়েছে বা হবে তুই তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছিস।
কুইনসে একটা বাড়ি কিনেছে লাচ্চু। বেশ বড় বাড়ি। দু-খানা দামি গাড়ি আছে তার। শমিতকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে একদিন আটকে রাখল সে।
শমিত বলল , এত বড় বাড়িতে একা থাকিস, বিয়ে করিসনি কেন?
করেছি। তিনবার। তারপর নাক–কান মলেছি, আর বিয়ে নয়।
কেন রে? বিয়ে কি টিকল না?
প্রথম দুটো বউ ছিল আমেরিকান। প্রথমটা তো একেবারে দুশ্চরিত্র। দ্বিতীয়টার ছিল টাকার খাঁই। বছরখানেকের মধ্যেই টাকাপয়সা একেবারে দুয়ে নিয়েছে। তিন নম্বরটা পাগল।
বলিস কী! তোর কথা শুনে তো বিয়ের কথা ভাবতেই ভয় করছে।
এ দেশেবিয়ে করিস না। দেশে গিয়ে করিস।
আজকাল বাঙালিরাও কি আর ভালো আছে?
তা হয়তো নেই, কিন্তু তারতম্য হয়তো আছে। তবে আমার মনে হয়, বিয়ে জিনিসটাই বাজে।
তুই তা হলে সিঙ্গল থাকবি?
অবশ্যই।
তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে?
না, তাও নেই। আমার মাথায় কাজের চিন্তা এত প্রবল যে সেক্স নিয়ে ভাবিই না।
তা হলে তোর রাত কাটে কী করে?
লাচ্চু হাসল, মোষের মতো ঘুমোই। শোন, আমার একটা বউয়ের দরকার ছিল বটে, কিন্তু বেড পার্টনার হিসেবে নয়। বউ হতে পারত আমার ব্যাবসার মস্ত সহায়। আমার বিশ্বাসযোগ্য একজন বন্ধু। নইলে একটা মেয়েমানুষকে তার শরীরের জন্য পুষব এই আইডিয়াটাই আমার ভালো লাগে না।
যাই হোক, তোর একজন পার্টনার কিন্তু দরকার।
সে পরে ভাবা যাবে। আমার কাছে দু-দিন থাক তা হলেই বুঝবি আমার দিন কেমন উড়ে যায়। রোমান্সের ছিটেফোঁটাও নেই। তবে টাকা আছে।
তুই কি অনেক টাকা করেছিস?
এখানে অনেক মানেও তো যথেষ্ট নয়। নিউইয়র্কে চারদিকে চেয়ে টাকার কী খেলাটাই না দেখতে পাই। না রে, আমেরিকার তুলনায় আমার কিছুই সম্বল নয়। তবে চলে যায়।
