বুঝতে বেশি মাথা ঘামাতে হয়নি। টাপুকে হাত করার পেছনে হয়তো ওটাই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
তাই হবে। নন্দনার মাও ঠারেঠোরে কথাটা আমাকে জানিয়েছেন। নন্দনা নাকি টিপুর ভয়ে কিছুদিন মামার বাড়িতে গিয়ে পালিয়ে ছিল।
তাহলে আপনার কি এখন উচিত নয়, নন্দনাকে এই ভয়ের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া?
আমার কী গরজ?
গরজ আছে বই কি। অসহায় অবলা নারীকে রক্ষা করাই তো পুরুষের ধর্ম, টিপু সেরে উঠলে যে নন্দনার আবার বিপদ!
তা নন্দনা আর কাউকে বিয়ে করলেই তো পারে।
সেটা দ্বিচারণা হবে না? তার যে আপনাকে পছন্দ।
দূর আমি বুড়ো গ্যাসের রুগি, কম বেতনের অপদার্থ লোক। আমার মধ্যে কী দেখল বলুন তো?
সেটা নন্দনাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন?
করে কী লাভ? যা বলবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রেম তো একটা ইমোশনাল অ্যাকসেস। ওর কোনো জোরালো ভিত নেই।
আপনার কপালে কী আছে জানেন?
কী?
বয়েস হলে বিড়বিড় করে কথা কওয়া, উদ্ভট উদ্ভট সব কান্ড করা, বাতিক আর বায়ুগ্রস্ত হয়ে পড়া–যা ব্যাচেলারদের হয় আর কি। তা ছাড়া দাদারা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে বাড়ি দখল করবে, হাতের-পাতের যা-কিছু হাতিয়ে নেবে। আরও বুড়ো হলে আপনাকে গিয়ে উঠতে হবে বৃদ্ধাশ্রমে। বউ যেমনই হোক, ঝগড়াঝাঁটি করুক, মুখনাড়া দিক, কিন্তু তবু সে পুরুষকে ঠিক সামলে রাখে।
হুম।
কথাটা ঠিক বলেছি?
খুব বেঠিকও বলেননি। ব্যাচেলারদের ওরকম-ই হয়ে থাকে।
তাহলে?
একটু ভাবি।
ভাবুন কিন্তু বেশি নয়। ভাবতে সময় নিলে হাউসফুল হয়ে যাবে। নন্দনাই কি পড়ে থাকবে ভেবেছেন? আগেরটির বেলায় যা হয়েছিল, এর বেলায়ও তাই হবে।
আপনি বড্ড ভয় দেখান তো!
ভয় দেখাচ্ছি না, সৎ পরামর্শ দিচ্ছি। আজকের দিনটা ভাবুন। ভেবে কাল সকালেই নন্দনাকে জানিয়ে দিন যে, আপনি তাকেই বিয়ে করবেন।
কাল সকালেই?
কাল সকালেই। কিংবা আজ রাতেই। কিংবা এক্ষুনি গিয়ে চোখ বুজে বলে ফেলুন গে। যান।
আচ্ছা, তাহলে চলি মশাই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু পা চালিয়েই যান।
সম্পর্ক
লাচ্চু আমেরিকায় গিয়েছিল জাহাজে। তখন তার কুড়ি বছর বয়স। ডাকাবুকো, উচ্ছৃঙ্খল এবং বন্ধনহীন। বাপের সঙ্গে বনিবনা ছিল না, কারণ তার বাবা ননীগোপাল রাগি মানুষ। ছেলেকে শাসন করাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। লাচ্চুকে মাঝে-মাঝে বদমায়েশির জন্য এমন মার দিতেন যে পরে ডাক্তার ডাকতে হত। কতবার যে বাবার মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে লাচ্চু তার হিসেব নেই।
বিশ বছর পেরোয়নি তখনও, লাচ্চু তার এক বন্ধুর দাদাকে ধরে মালের জাহাজে খালাসির চাকরি পেল। মতলব ছিল জাহাজ আমেরিকায় যদি কখনও যায় তখন লাচ্চু পালাবে।
সুযোগ এল প্রায় সাত মাস বাদে। সাত মাসে জাহাজে সি সিকনেস, আমাশা এবং দুজন সমকামী খালাসির অত্যাচার তাকে সইতে হয়েছিল। তবে তার বাড়ির জন্য মন কেমন করত না। বরং একটা জ্বালা ছিল, একটা প্রতিহিংসাপরায়ণতাও।
জাহাজটা ছিল স্প্যানিশ। হামবুর্গ থেকে মাল নিয়ে সাত মাসের মাথায় নিউইয়র্কে পৌঁছোল। পৌঁছনোর কথা ছিল না। আটলান্টিকে প্রবল ঝড়ে জাহাজ যায়-যায় হয়েছিল। তিন দিন টানা ঝড়। লাচ্চু বাঁচার আশাই করেনি। যখন নিউইয়র্কে পৌঁছল তখন মনে হল, বেঁচে যখন আছি তখন একটা কিছু করতেই হবে।
ভয়ডর জাহাজেই কেটে গিয়েছিল লাচ্ছ্বর। অচেনা, অজানা জায়গা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বিপদের আশঙ্কা, ধরা পড়ার সম্ভাবনা এসব নিয়ে সে বিশেষ মাথা ঘামাল না। তবে হট করে না পালিয়ে সে দিনতিনেক অপেক্ষা করল। তারপর একদিন ডকে নেমে সুযোগ বুঝে ভিড়ে মিশে গেল।
দেশটা কঠিন। চট করে যে এখানে কিছু করে বা হয়ে ওঠা যাবে না এটা সে জানত। আর জানত কোনও গির্জাটির্জা বা মিশনারির আশ্রয় নিলে বেঁচে যাবে। প্রথম দিনদুয়েক মাইনের টাকা ভেঙে খেল আর বড়-বড় ফ্লাই ওভারের নীচে শুয়ে রাত কাটাল। ভাগ্য ভালো যে তখন শীতকাল ছিল না।
নিউইয়র্ক শহরে পায়ে হেঁটে ঘুরতে–ঘুরতে সে একদিন বাস্তবিক ভাগ্যক্রমে একটা হোম ফর দি ডেস্টিটিউটস পেয়ে যায়। তারা যে তাকে দু-হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল তা নয়, তবে সে কাজকর্ম করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ঠাঁই হয়ে গেল।
কাজকর্ম মেলাই ছিল। লাচ্চু খাটত খুব। মাসখানেক পরে ইতালিয়ান একটা দোকানে চাকরি হল তার। থাকত নিউইয়র্কের কুখ্যাত বস্তিতে, যেখানে হেন পাপ নেই যা হয় না। এখানেই সে শেখে, মার্কিনিরা যেসব জিনিস ফেলে দেয় সেগুলো কুড়িয়ে এনে কিছু লোকের জীবিকা নির্বাহ হয়।
লাছুর মাথা পরিষ্কার। লেখাপড়ায় মাথাটা না খুললেও তার প্রিয় হল যন্ত্রপাতি, কলকবজা ইত্যাদি। মাঝে-মাঝে সে জাঙ্ক থেকে টিভি বা টু–ইন–ওয়ান কুড়িয়ে এনে খুলে ফেলে ভিতরকার মেকানিজম বুঝবার চেষ্টা করত। দিনকতক চেষ্টার পর সে একটা টিভি সেট সারিয়ে ফেলল। মেরামত করল একটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর এবং একটা বাতিল ক্যামেরা। আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল তার।
আমেরিকানরা বেশির ভাগ জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনে। এই যে গারবেজ করার প্রবণতা এর কারণ অনুধাবন করে লাচ্চু বুঝল, জিনিস খারাপ হলে তা সারাতে যে মজুরি লাগে তা ভয়াবহ। তার চেয়ে নতুন কেনাই লাভজনক।
লাচ্চু একটা হোম সার্ভিস খোলার চেষ্টা করতে লাগল। টিভি বা ছোটখাটো ইলেকট্রনিক জিনিস খারাপ হলেই ফেলে না দিয়ে অল্প পয়সায় সারিয়ে নিতে আমেরিকানদের কেমন লাগবে? সব আমেরিকানই তো আর বড়লোক নয়!
