সেটা কী?
টাপুর মা এসে আমার মাকে ধরেছে, টাপুর দিদি–এই ধরুন বাইশ-তেইশ বছর বয়েস হবে–তাকে ছোটোবউমা করে নিতে। বর্ণ-গোত্র সব নাকি ঠিকঠাক আছে।
বলেন কী মশাই? একথা আগে বলতে হয়। এ তো দারুণ খবর!
না মশাই, না। মোটেই ভালো খবর নয়। বয়সের তফাতটা লক্ষ করেছেন? তার ওপর আমি তো একরকম বুড়োই। একা-বোকা, থেকে-থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন কি আর ঝুটঝামেলা ভালো লাগে?
রিফিউজ করলেন নাকি?
হ্যাঁ, খুব কঠোরভাবেই রিফিউজ করলাম। টাপুর মাকে বললাম, আপনারা মোহের বশে এ-প্রস্তাব করেছেন। ভালো করে ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হবে না।
আপনার চরিত্রটি বেশ দৃঢ়।
না মশাই, একেবারেই না। বরং আমি অতিশয় দুর্বলচিত্ত। ভেবে দেখলাম দুর্বলচিত্ত লোকদের দাম্পত্যজীবনে না যাওয়াই ভালো। তা ছাড়া, ওরা আমড়াকে আম ভেবে বসে আছে কিনা। আমি তো আসলে হিরো নই, জিরো।
তাহলে ব্যাপারটা ওখানেই মিটে গেল নাকি?
মিটলে তো ল্যাঠা চুকেই যেত।
মেটেনি তাহলে? না, বললাম না, সব ঘটনা থেকেই ফ্যাঁকড়া বেরোয়।
তা এখানে আবার ফ্যাঁকড়া কী বেরোল?
টাপুর দিদি নন্দনাই হল ফ্যাঁকড়া। একদিন সে সোজা আমার ঘরে এসে হাজির। দুই চোখ জলে ভরা, ঠোঁট কাঁপছে।
বাস রে, এ যে, উত্তম-সুচিত্রা।
বাইরে থেকে এরকম মনে হয়। আমার যে, তখন কী অবস্থা তা বোঝাতে পারব না।
মেয়েটা দেখতে কেমন মশাই?
ভালোই। রং তেমন ফর্সা নয় কিন্তু মুখে-চোখে শ্ৰী আছে। পাড়ায় ভালো মেয়ে বলে নামও আছে।
তাহলে পিছোচ্ছেন কেন?
ওই যে বললাম, বুড়ো হয়ে গেছি। এখন কি কেঁচেগন্ডূষ করা যায়?
তা মেয়েটা বলল কী?
তেমন যে কিছু বলল, তা নয়। গলা কাঁপছিল। শুধু বলল, আমি কি খারাপ? তবে কেন আপনি–ব্যস ওই পর্যন্তই। বাক্যটা শেষ অবধি করতে পারেনি।
তা আপনি কী করলেন?
মেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা তো বিশেষ বলিনি কখনো। ঘাবড়ে গিয়েছিলুম।
কিছুই বললেন না?
তেমন কিছু বলতে পেরেছি বলে মনে হয় না। একটু আমতা আমতা করে বললুম, তুমি তো ভালো মেয়ে। তবে কেন আমাকে–ব্যস, বাক্যটা আমিও শেষ করতে পারিনি।
ওঃ, আপনার পেটে পেটে এত? এরকম মাখোমাখো ব্যাপারখানা এতক্ষণ চেপে রেখেছিলেন? আপনি তো খুনি লোক মশাই।
কী যে বলেন। মাখোমাখো ব্যাপারটা মোটেই নয়। নন্দনা এসে ও-কথা বলে যাওয়ার পর থেকে আমার ঘুম গেছে, খাওয়া গেছে, দুশ্চিন্তায় আধমরা অবস্থা। আর পেটে ফাঁপা ভাব। কী-যে অসোয়াস্তি।
গ্যাসের মেলা ওষুধ আছে মশাই। ওর জন্য চিন্তা নেই। আগে বলুন, সিদ্ধান্তটা কী নিলেন?
ওই যে বললুম, গ্যাসে এমন কাহিল হয়ে পড়েছি যে, আর ওসব নিয়ে এগোতে ভরসা হচ্ছে না। তবে মা ইদানীং দেখছি আদাজল খেয়ে লেগেছে। বড় বিপদ যাচ্ছে মশাই।
কীসের বিপদ?
একটা মিথ্যে জিনিসকে সবাই মিলে সত্যি করে তুলছে, এটা ভালো হচ্ছে না।
মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে কেন?
মিথ্যে নয়? গুণ্ডাটা নিজেই কেতরে পড়ল আর হিরো বনলাম আমি!
আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, ঘটনাটা তত মিথ্যে নয়। আপনি চেপে যাচ্ছেন।
বলেন কী? আমার কি গুণ্ডার সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা আছে?
কিছু বলা যায় না। কখনো-কখনো কাপুরুষও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আর আপনি সত্যিকারের কাপুরুষ হলে, মাঝরাত্তিরে গিয়ে টিপুর ডেরায় হানা দিতেন না।
ওই যে বললুম, কাজটা আহাম্মকি হয়েছিল।
আপনাকে তত আহাম্মক বলে মনে হচ্ছে না। ঘটনাটা বলেই ফেলুন-না। আমি তো আর পুলিশের লোক নই।
কী যে বলেন।
বলুন-না মশাই, লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আসলে কী জানেন, ঘটনার সময়ে আমি এমন বিভ্রান্ত অবস্থায় ছিলাম যে, সত্যিকারের কী ঘটেছিল তা আমি নিজেও জানি না।
এই তো এবার মাল বেরোচ্ছে। টিপুর মতো গুণ্ডা আপনাকে ছোরা মারতে এসে হঠাৎ কনভালশন হয়ে ঢলে পড়বে এমন ঘটনা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ওইটেই মুশকিল। আমার যেটুকু মনে পড়ছে তাই বলেছি। বাকিটা আমার স্মৃতিতে নেই।
তাহলে মশাই, বলতেই হবে, আপনি টিপুর চেয়েও অনেক বেশি ডেনজারাস লোক।
ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন। জীবনে আমি মারপিট করিনি।
প্রয়োজন পড়েনি বলে করেননি। কিন্তু এলিমেন্টটা আপনার ভেতরে ছিলই।
আপনি কী বলতে চান, আমার ভেতরে একজন অচেনা আমি আছে?
সকলের ভেতরেই থাকে।
কী জানি মশাই। লোকে বলছেও বটে যে, আমার বিবরণ বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকেই নাকি দেখেছে, আমি টিপুকে পেটাচ্ছি। আর হাসপাতালের ডাক্তাররাও টিপুর ইনজুরির রিপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু আমি ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি যা বলছেন, তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তো চিন্তার কথা।
কীসের চিন্তা?
এই যে আমার ভেতরে একজন হিংস্র, নিষ্ঠুর, অ্যাগ্রেসিভ লোক লুকিয়ে রয়েছে এ কি চিন্তার কথা নয়? বেশ ভয়েরই ব্যাপার।
তা ভয় পেলে একজন পাহারাদার বসালেই তো হয়।
পাহারাদার? সে আবার কী?
সবচেয়ে ভালো পাহারাদার তো নন্দনাই হতে পারে।
যাঃ, কী যে বলেন। আপনি কি মনে করেন বিয়ে মানুষের কোনো উপকার করে? আমার তো ও-কথা ভাবলে পেটে গ্যাস বেড়ে যায়। দেখলেন-না কতগুলো ঢেকুর তুললাম! আজকাল বড্ড বেড়ে গেছে।
আচ্ছা, টিপুর অবস্থা এখন কীরকম?
যতদূর জানি, পুলিশ-পাহারায় হাসপাতালে রাখা হয়েছে তাকে। খুব সিরিয়াস কিছু নয়।
আচ্ছা মশাই, টিপুর কি নন্দনার ওপরেও একটা নজর ছিল?
কী করে বুঝলেন মশাই, জানি না। কিন্তু কথাটা মিথ্যে নয়। ছিল।
