আর ওসবের মধ্যে যাবেন না।
ইচ্ছে করে কি যাই? একটা ঘটনা থেকে নানা ঘটনার ফ্যাঁকড়া বেরোয় যে!
কীরকম?
টাপুর মা এসে আমাকে ধরে পড়েছিল সেদিন। বলল, দেখ বাবা, ওই টিপু আর ওর দলবল আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলবে। তুই একটা কিছু কর। মহিলাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না যে, আমার মতো ভীতুকে দিয়ে কিছু হওয়ার নয়। অগত্যা বললাম, আচ্ছা চেষ্টা করব।
চেষ্টা করেননি তো!
ঠিক চেষ্টা করেছি বলা যায় না। তবে টিপুর হদিশ করতে শুরু করি।
ও বাবা! আপনি তো সাংঘাতিক লোক!
কী করব বলুন? ভদ্রমহিলা এমন কান্নাকাটি করলেন যে, কিছু না করেও থাকা যায় না।
হদিশ পেলেন নাকি?
পেলুম। পাশেই পালপাড়ার একটা ছেলে খবর দিল, ওদের বাড়ির কাছে একটা রং ঝালাইয়ের দোকানের পেছনে থাকে। হাইড আউট।
মশাই, শুনে যে আমারই বুক ধড়ফড় করছে।
আমারও করছিল।
যাননি তো?
যাওয়ারই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ঘাড়ে ভূত চাপলে যা হয়।
গেলেন?
একটু রাতের দিকে গেলুম।
বলেন কী?
সেই তো বলছি। গ্রহের ফের। তবে কপাল ভালো যে, টিপুকে বেশি খুঁজতে হয়নি। রাত এগারোটা হবে তখন, টিপু মাল খেয়ে ফেরার পথে পান-সিগারেটের দোকানে সিগারেট ধরাচ্ছিল।
কী করলেন?
গিয়ে বললুম, কাজটা ঠিক করছ না হে টিপু। এসব করা ভালো নয়।
এভাবে বললে কি কাজ হয়?
হল না তো! টিপু একটা খিস্তি করে কোমর থেকে একটা ছোরা বের করল। দোধার ছোরা। প্রকান্ড ফলাটা একেবারে ঝকঝক করছিল।
সর্বনাশ! পালালেন তো?
না। পালিয়ে যাব কোথায়? যাওয়ার কি জায়গা আছে?
তাহলে কী করলেন?
সে আর বলবেন না। আপনি কি দৈব মানেন?
খুব মানি মশাই, খুব মানি। এই যুগে বেঁচে থাকার-ই যা সমস্যা, দৈব না মেনে উপায় আছে?
ঠিক তাই, দৈব ছাড়া আর কী বলি বলুন? নিতান্তই টাপুর মায়ের চোখের জল সইতে না পেরে আহাম্মকের মতো টিপুকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সৎপথে ফেরাতে গিয়েছিলুম। কাজটা যে কতবড়ো ভুল হয়েছিল, তা আগে বুঝতে পারিনি।
অতি খাঁটি কথা মশাই। কাজটা করা আপনার মোটেই ঠিক হয়নি। তারপর হলটা কী সেইটে বলুন।
আজ্ঞে কী যে হল তা কি আমি জানি। ছোরা দেখে আর টিপুর রক্ত-জলকরা চাউনিতে আমার তখন শরীরে স্তম্ভন। এত ভয় খেয়ে গেছি যে, হাত-পা যেন কাঠ। ভগবানকে জীবনে ডাকিনি কখনো। আসলে ডাকার কথা মনেই থাকে না। সেই অবস্থাতেও মনে পড়ল না। টিপু ব্যাধের মতোই এগিয়ে এল। কিন্তু তারপর কী যে হয়ে গেল, কিছু মাথায় ঢুকল না।
কী হল?
সেইটেই তো বলবার চেষ্টা করছি। কিন্তু বর্ণনা দেওয়ার ভাষাটাও খুঁজে পাওয়া কঠিন। টিপু এগিয়ে এসে ছোরা বাগিয়ে ধরে পেটে বা বুকে ঢুকিয়ে দেয় আর কী! ওদের তো মায়া-দয়া নেই। কিন্তু কী যে হল, হঠাৎ টিপু যেন পায়ে পা জড়িয়ে, যেন নিজেকেই নিজে ল্যাং মেরে একটা পুঁটুলির মতো দলা পাকিয়ে পড়ে গেল মাটিতে। একেবারে আমার পায়ের গোড়ায়।
বলেন কী?
দৈব ছাড়া আর কী বলি বলুন। অবিশ্বাসেরও কিছু নেই। নিজের চোখে দেখা।
তারপর?
পড়ে গিয়ে টিপু কেমন যেন ছটফট করতে লাগল, গলায় গোঙানির আওয়াজ। মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে আমি যেন কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলুম। নড়তেও পারছি না। পানের দোকানিটা নেমে এসে টিপুর মুখে-চোখে জলের ঝাঁপটা দিতে দিতে বলছিল, এর শরীরে কি কিছু আছে? দিনরাত চুন্নু টানছে, পাতা খাচ্ছে। শালা এবার মরবে।
জোর বেঁচে গেছেন তাহলে! দৈব ছাড়া এ আর কিছু নয়।
ঠিকই বলেছেন। তবে কিনা ব্যাপারটা চাউর হল অন্যরকম।
সেটা আবার কী?
আর বলবেন না মশাই। লোকের মুখে মুখে রটে গেল আমিই নাকি টিপুকে মেরে পাট করে দিয়েছি। বুঝুন কান্ড। আমার গায়ে না আছে জোর, না আছে মনে সেই সাহস। কিন্তু লোকে তা বুঝলে তো! সে এমন কান্ড যে, টিপুর দলের একটা ছেলেও সাহস করে আমার কাছে এগিয়ে এল না। আমিও আর দাঁড়াইনি। তাড়াতাড়ি চলে এসেছি। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই আমাকে নিয়ে পাড়ায় হইচই। এমনকী থানার দারোগা পর্যন্ত এসে আমাকে হিরো বানিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন। বললেন, আপনার জন্যই টিপুকে ধরা গেল।
তারপর কী হল মশাই?
টাপু বাড়ি ফিরে গেল। আমার পা জড়িয়ে ধরে বলল, আপনার জন্যই টিপুর খপ্পর থেকে ছাড়া পেয়েছি, নইলে ওরা আমাকে শেষ করে দিত।
তাহলে আপনি এখন হিরো?
কাকতালীয় ঘটনা আর কাকে বলে! যেভাবে আমাকে হিরো বানানো শুরু হয়েছিল তাতে আমার ভয় হল, এবার টিপুর দলের ছেলেরা না আমার ওপর চড়াও হয়। মানুষের প্রাণের স্থায়িত্ব কী বলুন? একটা গুলি বা ছুরি-ছোরা, নিদেন একখানা আধলা ইটেও কাজ হয়ে যায়।
তা তো ঠিকই। তা সেরকম কিছু হয়েছিল নাকি?
না মশাই। বরং টিপুর এক শাগরেদ এসে দেখা করে মাপটাপ চেয়ে গেল। বলল, টিপুটা ইদানীং বড়ো বাড়াবাড়ি করছিল। আমরা তো তাকত দেখাতে লাইনে নামিনি দাদা, এসেছি রুজি-রোজগার করতে। আর টিপু হতে চায় রবিনহুড।
বাঃ, তাহলে তো আপনার আর কোনো সমস্যাই রইল না।
সমস্যা! সমস্যার কী শেষ আছে? একটা যায় তো আর একটা আসে।
সেটা আবার কীরকম?
আছে মশাই, আছে। হিরো হওয়ার হ্যাপাও বড়ো কম নয়। মিনি মাগনা হিরো বনে গেছি বটে, কিন্তু ফ্যাঁকড়াও আছে।
ঝেড়ে কাশুন-না মশাই।
এই ধরুন, আগে কেউ পাড়ায় আমার দিকে ফিরেও চাইত না, আজকাল সবাই তাকায়, পথে বেরোলে জানলায়, বারান্দায় উঁকিঝুঁকি শুরু হয়, নাগরিক কমিটি থেকে আমাকে চেয়ারম্যান করার কথা উঠেছে। এইসব নানা উদ্ভট কান্ড। তারপরও গোদের ওপর বিষফোঁড়া আছে।
