বয়েস কত হল?
প্রায় চল্লিশ।
এমন কিছু বয়স নয় কিন্তু।
বলেন কী? আমার তো সবসময়ে মনে হয় বুড়ো হয়ে গেছি।
বিয়েটা হল না কেন?
কপালে নেই বলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে আমিই অগামার্কা, ছাত্র ভালো ছিলুম না। চাকরিও ভালো জোটেনি।
একটা সিন্ধি কোম্পানিতে আছেন-না আপনি?
আছি বটে, তবে না থাকার মতোই। অপমানজনক বেতন, হাড়ভাঙা খাটনি। কোনোরকমে গ্রাসাচ্ছাদন চলে যায় আর কী!
তাহলে সংসারটা কি বাবার টাকায় চলে?
চললে তো হতই। কিন্তু ওটা আমিই চালিয়ে নিচ্ছি। বেতনের টাকা সবটাই খরচ হয়ে যায়। তা যাক। আমার আছেই বা কে, খাবেই বা কে?
দাদারা কিছু দেয় না?
নাঃ। আমিও চাই না, তারাও দেয় না।
আপনি তো তাহলে স্কেপগোট, বলির পাঁঠা।
তা বলতে পারেন। তবে অত হিসেব-টিসেব করে কীই বা হবে? চলে তো যাচ্ছে। অসুখ-বিসুখ বা মোটা খরচের পাল্লায় পড়লে অবশ্য বিপদ ঘটবে।
বাবা কিছু দিতে পারেন তো! আফটার অল পুলিশের চাকরি করেছেন, হাতে ভালোই থাকার কথা।
আছেও। কিন্তু দেন না। তাঁর সাফ কথা, এতদিন তোমাদের প্রতিপালন করেছি, এখন তোমাদের কর্তব্য মা বাবার প্রতিপালন করা। এই নিয়েই দাদাদের সঙ্গে খিটিমিটি।
তারা পালিয়ে বাঁচলেন তো!
পালানোর-ই কথা। আজকাল তো পালানোই রেওয়াজ।
আপনিই পারলেন না তাহলে?
পালানোর কী আছে? ওরা বউ-বাচ্চার ভবিষ্যৎ ভেবে পালিয়েছে, আমার তো সে-বালাই নেই।
বিয়েটা করলেন না কেন মশাই? লাভ অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার ছিল নাকি?
সত্যি কথা শুনতে চান?
আপনার যদি আপত্তি না থাকে।
লাভ অ্যাফেয়ার বললে বাড়াবাড়ি হবে। একটা মেয়ের প্রতি একটু সফটনেস ছিল। কিন্তু কথাটা তাকে মুখ ফুটে জানাতে পারিনি।
ও, তাহলে আর লাভ অ্যাফেয়ার কী হল?
দুঃখের কথা হল, পরে আমার এক খুড়তুতো বোনের কাছে জানতে পারি যে, সেই মেয়েটারও নাকি আমার প্রতি সফটনেস ছিল। সেও কখনো বলতে পারেনি।
এঃ হেঃ, এ যে, খুব-ই দুঃখের ব্যাপার। মেয়েটার কি বিয়ে হয়ে গেছে?
তা হবে-না? সে এখন ছেলেপুলের মা, ঘোর সংসারী।
তার তো হিল্লে হয়ে গেল, আপনার তো হল না।
হিল্লে আর কী? জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া তো? সে কেটে যাবে।
মা বিয়ে দিতে চান না?
আগে চাইতেন। তবে দুই বউমার কাছ থেকে যা ব্যবহার পেয়েছেন তাতে বোধ হয় আগ্রহ কমে গেছে। আর আমারও তো বয়স হল।
বয়সের চেয়েও বড়োকথা হল, আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা ভালো কথা নয়। ঠিক কত বয়স হল বলুন
আটত্রিশ পূর্ণ হয়ে উনচল্লিশ চলছে।
সাহেবরা তো এই বয়সেই বিয়ে করে। চল্লিশে তাদের জীবন শুরু।
সাহেবরা সব ব্যাপারেই আমাদের চেয়ে এগিয়ে, তাদের সঙ্গে কি আমাদের তুলনা হয়?
আহা, তারাও তো রক্তমাংসের মানুষ। তাদেরও জরা-ব্যাধি আছে।
তা আছে। তবু তুলনা হয় না। জীবনকে ওরা ভোগ করতে জানে। আর আমরা জীবনটা কাটিয়ে দিই মাত্র।
বেড়াতে-টেড়াতে যান-না?
না, বেড়ানোর যা-খরচ। শখ-আহ্লাদ বলতে কিছুই নেই। আগে ময়দানে ফুটবল খেলা দেখতে যেতুম। এখন আর ইচ্ছে হয় না। সময় পেলে একটু-আধটু টি.ভি. দেখি। ব্যস। পাড়ার একটা ক্লাবে একটু যাতায়াত আছে। সামান্য সোশ্যাল ওয়ার্ক করি।
সোশ্যাল ওয়ার্ক করা তো খুব ভালো।
মন দিয়ে করলে তো ভালোই। আমি করি সময় কাটানোর জন্য।
কীরকম সোশ্যাল ওয়ার্ক? বন্যাত্ৰাণ, খরাত্ৰাণ ওসব নাকি?
সেসবও আছে। তা ছাড়া সাক্ষরতা অভিযান, রক্তদান, অ্যান্টিসোশ্যালদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা –এইরকম আর কী।
ভালো ভালো। তবে অ্যান্টিসোশ্যালদের সঙ্গে লাগাটা আবার বিপজ্জনক। এটা তো ওদেরই যুগ কিনা। পুলিশ, প্রশাসন সবই ওদের হাতে।
যা বলেছেন। ভালো করে না বুঝেসুঝে আমিও বড় বিপদে পড়ে গেছি।
তাই নাকি? কী ব্যাপার?
টাপু বলে একটা ছেলে আছে আমাদের পাড়ায়। ভালো ছেলে। সে একজন অ্যান্টিসোশ্যালের পাল্লায় পড়ে বখে যাচ্ছিল। তার বাবা এসে ক্লাবে কেঁদে পড়ে। আমরাও ভালো করে না ভেবেচিন্তে অ্যাকশনে নেমে পড়ি। কিন্তু তার ফল দাঁড়ায় মারাত্মক। সেই অ্যান্টিসোশ্যালটা–তার নাম টিপু–দলবল নিয়ে এসে ক্লাবে বোমাবাজি করে গেল এই তো, মাত্র দিন পনেরো আগে এক সন্ধেবেলা।
সর্বনাশ! কেউ মার্ডার হয়নি তো?
না। তবে দুজনের সপ্লিন্টার ইনজুরি হয়েছে।
বেঁচে গেছেন তাহলে।
মশাই, বাঁচা অত সোজা নয়। শাসিয়ে গেছে সবাইকে দেখে নেবে।
ও বাবা, তাহলে তো আপনি বিপদের মধ্যেই আছেন।
তা আছি।
পুলিশ অ্যাকশন নেয়নি?
রুটিন মাফিক নিয়েছে। ওদের কেউ ভয় পায় না আজকাল।
সেই টাপু ছেলেটার কী অবস্থা?
পালিয়েছে।
তাকে ফেরাতে পারবেন মনে হয়?
বলতে পারি না। সবাইকে তো ফেরানো যায় না। সৎপথে থাকার আকর্ষণ আজকাল কমে যাচ্ছে। ইয়াং জেনারেশন আজকাল একটু গা গরম করতে চায় বোধহয়।
এ-ব্যাপারে আপনাদের নেক্সট লাইন অফ অ্যাকশন কী?
সবাই ভয় পেয়ে গেছে। অ্যাকশনে কেউ যেতে চাইছে না।
তাহলে আপনারা রণে ভঙ্গ দিলেন বলুন?
একরকম তাই। বোমা-পিস্তলের সঙ্গে লড়াই করব কী করে?
তাই তো বলছিলুম মশাই, অ্যান্টিসোশ্যালদের সঙ্গে লাগা বিপজ্জনক।
খুবই বিপজ্জনক। সেই ঘটনার পরে থেকে টেনশনে আমার গ্যাস আর অম্বল বেড়ে গেছে।
শুনেছি টেনশনে গ্যাস-অম্বল বাড়ে।
আমারও বেড়েছে। রাতে শুয়ে দুশো-আড়াইশো ঢেকুর ওঠে।
