–ছেড়ে দিন।
–বিয়ে করছেন কবে?
–ছেড়ে দিন।
–আবার সুতৃপ্তির আড্ডায় আসুন। আপনি নাহলে জমে না।
–ছেড়ে দিন।
ছাড়তে-ছাড়তে অবশিষ্ট তার কী ছিল কে জানে! ক্রমে সে মায়ের আঁচলধরা হয়ে যাচ্ছিল ছেলেবেলার মতো। এমনভাবে ‘মা’ ডাকত যেন এক অবোধ শিশু পৃথিবীতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ‘খুকু’ বলে যখন বোনকে ডাকত মনে হত তার বোনটি বুঝি কোলের খুকি, কোথাও পড়ে টড়ে যাবে, কাঁদবে।
একদিন আচমকা শুনি দ্বিতীয় বর্জ্যের শব্দ–শংকর আবার হাসপাতালে।
অপেক্ষা করি আরোগ্য সংবাদের জন্য।
সংবাদ অবশেষে আসে। শংকর বাড়ি ফিরেছে। যাই।
–শংকর।
–আরে, আসুন, আসুন।
–এসব কী হচ্ছে?
–ছেড়ে দিন।
একবারও কখনও সে তার রোগযন্ত্রণার কথা বলেনি। এসব বলতে সে ভালোবাসত না। কতগুলো ব্যাপারে তার বিরাগ ছিল তীব্র। কমদামি সিগারেট, রুমাল, বাইরে যাওয়া। তেমনি নিজের ব্যাধির কথাও।
একদিন এল ছোট ভাইয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে। সঙ্গে খুকু।
বললাম–ছোট ভাইয়ের বিয়ে! বড় ভাই বাকি রইল কেন?
–আহা, ছেড়ে দিন না ওসব কথা।
–আমার বউ বলল –না ছাড়াছাড়ির কথা নয়। এবার মত করে ফেলুন।
লাজুক মুখে বলল –সময় পার হয়ে গেছে।
সেই বিয়েতে বড় ধুম হয়েছিল। যেন এক সাহিত্যবাসর। শ’খানেক কবি–সহিত্যিকের হল্লা। শংকর বরকর্তার সাজে সেজে বেড়াচ্ছে। হাত ধরে, কাঁধ ধরে, আন্তরিক হর্ষধ্বনিতে অভ্যাগতদের ধরে আনছে দরজার মুখ থেকে। চেঁচাচ্ছে–দ্যাখো, দ্যাখো, কে এসেছে।
তারপর আর একদিনও তার নিরালা দোতলার ঘরে বসে অনেকক্ষণ কত কথা বলেছি।
সে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল–হবে।
এক সন্ধেবেলা মেয়েকে নিয়ে রাসবিহারী অ্যাভনিউয়ের এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, যাই শংকরকে দেখে আসি।
মাসিমা খুব খুশি হয়ে বলেন–এসো, এসো। শংকর তো অফিসের কাজে গৌহাটি গেছে।
–গৌহাটি! অবাক হই। শংকর কোথাও যেতে ভালোবাসত না যে। মাসিমা বলেন–যেতে দিতেই হল বাবা। চাকরি। শংকরও খুব যেতে চেয়েছিল।
–কীসে গেল?
–প্লেনে।
মনটা দোল খায়। হার্টের রুগি।
মাসিমা মুখ দেখে বুঝে বললেন–শুনল না। কী করব বল!
–এবার ওর বিয়ে দিন মাসিমা। বয়স হল।
–তোমরা ওকে রাজি করাতে পারলে না তো! যা হোক বাবা, এবার এক পাত্রী ঠিক করেছি। মেয়েটির পোলিও হয়েছিল, পা একটু খোঁড়া, কিন্তু বড় ভালো মেয়ে তোমরা প্রার্থনা করো, যেন বিয়েটা দিতে পারি।
খুব খুশি হয়ে এলাম সেদিন।
বারবার একটা উড়োজাহাজের কথা মনে পড়ছিল। বারবার।
উড়োজাহাজ কি ভালো হার্টের রুগির পক্ষে? ভালো?
শংকর এখন গৌহাটির অফিসেই বুঝি স্থায়ীভাবে কাজ করছে। চিঠি দেয় না। সে আমাদের সংসর্গ ত্যাগ করেছে। আসে না। সে আমাদের মুখ দেখতে চায় না।
ভয় হয়, যদি আবার আমার জীবনে কখনও মৃত, নিষ্ফলা সময় আসে তখন কে এসে তার বিশাল কাঁধ দিয়ে ভার নেবে আমার। গম্ভীর কামানের গলায় বলবে–ঘাবড়াবেন না। হবে।
সংলাপ
পেটে গ্যাস হয়, বুঝলেন! খুব গ্যাস হয়।
সেটা খুব টের পাচ্ছি। গত পঁয়তাল্লিশ মিনিটে শ দেড়েক ঢেকুর তুললেন।
দেড়শো! না মশাই, দুশোর বেশি। কী থেকে যে গ্যাস শালা জন্মায় সেটাই ধরতে পারছি না। সেই দুপুরে পাবদা মাছের ঝোল দিয়ে চাট্টি ভাত খেয়েছি সেটাও গিয়ে পেটের মধ্যে গ্যাস সিলিণ্ডার হয়ে গেড়ে বসে আছে।
আজ পাবদা কিনেছিলেন বুঝি? ভালো পাবদার কাছে কিছু লাগে না।
যা বলেছেন। আমাদের বাজারে সুকুমার বলে যে মাছওয়ালাটি আছে সে-ই একটু ভালো জিনিস রাখে। আর সবাই তো কাটা পোনা চিতিয়ে বসে আছে। নয়তো আড়-বোয়াল-তেলাপিয়া।
কত করে নিল?
সেটা আর জিজ্ঞেস করবেন না। দামের কথা মুখে আনাই পাপ। অবিশ্বাস্য মশাই, অবিশ্বাস্য। তবে বাবার বয়স হয়েছে। ক-দিন ধরেই জিজ্ঞেস করছিলেন, হ্যাঁ রে, বাজারে পাবদা ওঠে না? তাই আনা।
আপনার বাবা তো পুলিশে ছিলেন, তাই না?
হ্যাঁ, অ্যাডিশনাল ডি এস পি।
বড়ো পোস্ট।
হ্যাঁ, তা বড়োই।
বাড়িটা তো আপনার বাবারই করা, তাই না? দিব্যি বাড়ি।
হ্যাঁ, তা মন্দ নয়।
এ বাজারে কলকাতায় ওবাড়ি হেসেখেলে বিশ-পঁচিশ লাখ দাঁড়াবে।
হ্যাঁ, পঁচিশ লাখ অফার পেয়েছি।
অফার মানে? বাড়িটা বেচবেন নাকি? আরে না মশাই, বাড়ি বেচে যাব কোথায়? তবে অনেকে আছে-না, ভালো বাড়ি দেখলেই একটা দর হেঁকে বসে, সেরকম-ই ব্যাপার।
তবু ভালো। আমি ভাবলাম বেচার তোড়জোড় চলছে বুঝি। আজকাল প্রোমোটারের যা দৌরাত্ম্য!
সে তো বটেই। তবে ভাবছি বাবা যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন তো আর বাড়ি প্রোমোটারকে দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে না। কিন্তু বাবা মারা গেলেই সেই সাবেক সমস্যা। তিন ভাইয়ে ভাগাভাগি। আর বাড়িটাও এমন প্ল্যানে তৈরি যে, ভাগজোখ হয় না। তখন প্রোমোটারকে না দিয়ে বোধ হয় উপায় থাকবে না।
সে তখন ভাববেন। আপনার এক ভাই পলিটিক্স করত-না?
আমার বড়দা। ইলেকশনেও দাঁড়িয়েছিল।
আর মেজো-জন?
ছোড়দা তো? তিনি ইনকাম ট্যাক্সের উকিল।
মেলা পয়সা, না?
দেদার পয়সা। সব মাড়োয়ারি ক্লায়েন্ট।
সব একসঙ্গেই আছেন তো?
পাগল নাকি? বড়দা গড়িয়ায় বাড়ি হাঁকিয়েছে সেই কবে। মেজদা ফ্ল্যাট কিনেছে ভবানীপুরে। আমিই পৈতৃক বাড়িতে পড়ে আছি।
আপনি তো ব্যাচেলার, আলাদা বাড়িতে থাকার দরকারটাই বা কী?
দরকার নেই ঠিকই। কিন্তু দায়দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ে কিনা। এই ধরুন, দাদারা সটকে পড়ল, কেউ বাপ মায়ের দায়িত্ব নিল না। কিন্তু আমি ব্যাচেলার বলেই সটকাতে পারলুম না।
