খ্যাপালে কেতো হি–হি করে হাসত। তার হাসির ভিতর দিয়ে হৃদয়ের ছবি দেখা যেত।
খুব ছেলেবেলা থেকেই কেতো আসত আমার কাছে। আমার ছোটো ভাইয়ের বন্ধু। রাজ্যের গল্প কবিতা লিখে আনত দেখানোর জন্য। লেখাগুলো তেমন কিছু হত না। অবহেলায় দিয়ে বলতাম–এখনও ঢের লিখতে হবে। পাকা হও।
চমৎকার ছাত্র ছিল সে। উচ্চমাধ্যমিকে বৃত্তি পেল, ডাক্তারি পাশ করল একবারে। মেডিকেল কলেজে পড়বার সময়ে তার চেনার সূত্র ধরে আমরা কত জনা যে কতরকম চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছি। কারও কিছু হলেই কেতোর কথা মনে পড়ত সকলের। আমিও কত অনিচ্ছুক রুগিকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়েছি কেতোর কাছে।
তার এ বিষয়ে ক্লান্তি ছিল না। কেউ গেলে দৌড়ঝাঁপ করে তার কাজ আদায় করে দিত। ডাক্তারি পড়ার সময়ে সে কোনও হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে একবার ঘুমের বড়ি খায়। বেঁচে গিয়ে পড়ল হেপাটাইটিসে। এ রোগটা সে পেয়েছিল অন্য এক রুগির কাছ থেকে।
তার বিয়ে ঠিক হল কয়েকবার। কপালক্রমে কোনওটাই হল না। নকশাল আন্দোলনের সময়ে একবার হোস্টেলের কিছু ছেলে তাকে মারে। নিরীহ কে তোকে কেউ মারতে পারে এ আমার ধারণায় আসে না আজও। সে তো বরাবর ধমক খেয়ে হেসেছে। কখনও দশ মিনিট একসঙ্গে গম্ভীর থাকেনি!
ডাক্তারি পাশ করার পর বিয়ে হল তার। সে বিয়েতে আমার যাওয়া হয়নি, কেন তা ভেবে পাই না। কিন্তু যাওয়া হয়নি।
বিয়ের পর অন্যরকম এক কেতোর সঙ্গে দেখা হল। প্রথম দিকে বেশ উজ্জ্বল উজ্জ্বল, তারপর কিছু বেশিমাত্রায় অন্যমনস্ক।
বলতাম–কবে বিলেতে যাচ্ছ কেতো?
–শিগগিরই। পাশপোর্ট করতে দিয়েচ্ছি।
গায়নোকলজির দিকে ঝোঁক ছিল। চমৎকার ডাক্তার ছিল সে। ক্যালকাটা হলপিটালে থাকাকালীন সে মেয়াদ ফুরোনোর পরও এক্সটেনশন পায়। নানা হাসপাতাল থেকে চাকরির ডাক এসেছে।
বলতাম–বিলেতে যাবেই কেতো?
–না গিয়ে কী করব? এম . ডি . করলাম, এতে মন ভরছে না। এম আর সি পি, আর এফ আর সি এস করে আসি।
–তখন তোমার ভিজিট কত হবে?
খুব হাসত হি হি করে। হৃদয় দেখা যেত।
–তখন তোমার ভিজিট দেবোকী করে?
–আপনাদের ভিজিট যে কত পাব সে জানি।
সামনে সিগারেট খেত না। আমিই তাকে জোর করে খাওয়াই। মোটা হয়ে যাচ্ছে দেখে অনুযোগ দিয়ে বলতাম–এই ব্যাঙের মতো থপথপ অপদার্থ চেহারা নিয়ে কী যে করবে তুমি!
–না দাদা, ডাক্তারদের একটু ফ্যাট থাকা ভালো। কাজে লাগে।
–দূর বোকা। বিলেতে গিয়ে আমার জন্য কী পাঠাবে?
–সে ভেবে রেখেছি। আপনার তো খুব কলমের শখ। একটা দারুণ কলম পাঠাব।
পাশপোর্ট হয়ে গেল ভিসা এল। টিকিট কাটা শেষ।
যে মাসের উনত্রিশ তারিখে তার রওনা হওয়ার কথা সে মাসেরই বোধহয় আঠারো তারিখে জামসেদপুরের এক আত্মীয়বাড়িতে সে কয়েকটা আপাত নিরাপদ ব্যথাহরা বড়ি খেয়েছিল। মাথা ধরেছিল বোধহয়।
জুডো ক্যারাটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রুস লিও খেয়েছিল। তারপর অন্তর্গত রক্ত নাক কান মুখ দিয়ে অবিরল ধারায় বেরিয়ে এসেছিল। ট্যাপ খোলা কলের মতো। সেই ট্যাপ বন্ধ করবার কেউ ছিল না।
কেতোর রক্তের কল খুলে গেল সেই রাতে। ঝলকে ঝলকে উঠে আসে মহার্ঘ লোহিত তরল। প্রাণদায়ী। অস্তিত্বের সারাৎসার।
হেমারেজ সে অনেক দেখেছে, সারিয়েছে বহু। নিজের রক্ত দেখতে-দেখতে তার ক্লান্তি এল। মাথা নেড়ে বলল –ইউসলেস। আমি বাঁচব না।
অনেক ডাক্তার জড়ো হয়েছিল। একজন ডাক্তারকে বাঁচাতে।
সে বাঁচলে অনেকে বেঁচে যেত।
কিন্তু অ্যাপয়ন্টমেন্ট ছিল যে। বিলেত থেকে আর একটু রহস্যময় দূরত্বে সে চলে গেল বিনা ভিসায়। সেখান থেকে কলম পাঠানো যায় না।
আমি কি সেই কলমটার কথা ভাবি মাঝে-মাঝে! হাতে কলমটার দিকে চাইলেই কেতোটার কথা বড় মনে পড়ে।
৩.
মানুষের জীবনে এক-একটি মৃত সময় আসে। বড় নিষ্ফলা সময় সেটা। কিছু হয় না তখন, কিছু ঘটে না তখন, কিছু পাওয়া যায় না তখন। জীবন বদ্ধ দরজার মতো নিরেট দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা খোঁড়ো, কেউ সাড়া দেবে না।
আমার এইরকম খরা, অজন্মার সময়ে আমাকে শববাহকের মতো অনেকদূরে বহন করেছিল শংকর। শ্মশানের দিকে নয়, বেঁচে থাকার দিকে। ঝাঁড়ফুঁক জানা ছিল তার কিছু। অল্প স্বল্প চিকিৎসার বিদ্যা, সে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে জানত ছেঁড়া কাগজের মতো অন্যের বিষণ্ণতা।
তার নিজের বিষণ্ণতা ছিল অমোঘ। একদিন এই বজ্রপাতের শব্দ শুনিয়ে গেল।
শংকরের জন্য ভাবতে বসে কখন নিজের কথা ভাবতে থাকি। আমারও একদিন দেখা দেবে হৃদরোগ? কিংবা কোনও রক্তক্ষরণ? নিদেন দুর্ঘটনা?
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে তাকে দেখতে যাই।
–কেমন আছেন শংকর?
–আরে, আসুন, আসুন। মা দেখে যাও, কে এসেছে!
মাসিমা তার মায়ের হাসিটি মুখে করে আসেন–দ্যাখো তো, শংকর কী কাণ্ডটা বাধাল!
শংকর অনেক কিছু বুঝত, জানত। অনেক বিষয়ই ছিল তার প্রিয়। তবু সবচেয়ে প্রিয় ছিল লেখার কথা।
বললাম–ভালো কবিতা লিখছেন এখন।
–ছেড়ে দিন ওসব কথা। অন্য সবার খবর কী?
অনর্গল তার কাছে নানা কথা বলা যেত। তার বিশ্বস্ততা ছিল খাঁটি সোনার মতো।
উনিশশো একষট্টি সালে আমরা দল বেঁধে জামসেদপুর যাই। শংকর যায়নি। কলকাতার বাইরে সে কদাচিৎ গেছে। নৈহাটি যেতে হলেও সে নার্ভাস হয়ে পড়ত। কিন্তু কলকাতা ছিল তার অনায়াস বিচরণের ক্ষেত্র।
বললাম–আর ড্রিংক করবেন না।
