আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি–কিন্তু টেলিফোন করার জন্য তো পয়সাও দিতে হবে মিস্টার লুলু।
–তা হবে। তবে নমস্কারটা ফ্রি পাওয়া যাবে।
কোলের ওপর নোটবই রেখে লুলুর চোখকে ফাঁকি দিকে মন্তব্যটা লিখে নিয়ে আমি বলি–নাগরিক অধিকার সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উঠেছে এবং বাক স্বাধীনতা।
লুলু আরও দু-পেগ টেনে নিয়ে দু-পেগের প্রথম কিস্তিতে চুমুক দিয়ে বলে–মানবিক অধিকার ভারী সুন্দর কথা, কিন্তু মানে হয় না। অন্তত সতেরোটা ডিকশনারি খুঁজেও অর্থ বের করতে পারিনি।
আমি লুলুর ভুল শুধরে বলি–মানবিক নয়, নাগরিক।
–ওঃ! বলে লুলু হেসে বলে–তাই বলুন। নাগরিক অধিকার! আমি মানবিক ভেবে এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম! আসলে মানুষ এবং নাগরিক কথা দুটোই আলাদা, অর্থও দুরকম। নাগরিক মানেই কিন্তু মানুষ নয়। এ কথাটা মনে রাখলে আর কোনও গোলমাল থাকে না।
আমি একটু গোলমাল পড়ে গিয়ে জিগ্যেস করি–নাগরিক এবং মানুষ কি আলাদা শ্রেণি?
–আলবাত! লুলু প্রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে। চোঁ করে হুইস্কি টেনে নিয়ে আবার খুব নীচু গলায় বলে–আসলে কোনওটারই মানে হয় না।
আমি কিন্তু-কিন্তু করে বলি–কিন্তু…
–মূর্খ সাংবাদিক, আপনি অকারণ সময় নষ্ট করছেন। চারদিকে এখন জরুরি অবস্থা।
আমাদের প্রয়োজনগুলিও অত্যন্ত জরুরি। সময় নেই। আয়ু বয়ে যাচ্ছে, একদম সময় নেই। দেরি করলে যৌবন ফিরে যাবে, বসন্ত শেষ হবে। উঠে পড়ুন।
লুলুর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আমি তার আদেশে উঠে পড়লাম।
গাড়ি করে লুলু আমাকে এক বিশাল ম্যানসনে নিয়ে গেল। এত বড় একটা বাড়ি কলকাতার মহার্ঘ প্রায় বিঘে দুই জমিতে কী করে জমিয়ে বসেছে তা ভাববার কথা।
স্বয়ংক্রিয় লিফটে ওপরে উঠতে-উঠতে লুলু আমার দিকে চেয়ে মহা বদমাশের মতো মুচকি হেসে বলে–এ-বাড়িতে আমার প্রায় আধ ডজন প্রেমিকা থাকে।
বলে লুলু আমার মুখের ভাব লক্ষ করতে লাগল। আমি যতদূর সম্ভব মুখখানা ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করতে-করতে বললাম–থাকতেই পারে। খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
লুলু হাসল না। খুব গম্ভীর মুখে ভ্রুকুটি করে বলল –থাকতেই পারে কেন? আর স্বাভাবিক ব্যাপারই বা কী করে হল?
মুশকিলে পড়ে বললাম–বিজ্ঞান বলে পুরুষরা বাই নেচার বহুগামী।
লুলু–তাহলে আইন করে একাধিক বিয়ে বন্ধ করা হল কেন? যদি জানোই যে, পুরুষরা বহুগামী তবে তাদের সেই গমনপথে গর্ত খোঁড়ার মানে কী? পচা রিপোর্টার, অনেক লোক যদি বউ থাকা সত্বেও আর পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে শোয় তবে তোমরা তেমন গা করো না। বোধহয় তোমরা নিজেরাও শোও। কিন্তু একজন ভ ভদ্রলোক যদি দ্বিতীয়বার বিয়ে করে তবে সেটা তোমাদের কাছে খবর হয়ে দাঁড়ায়, বুদ্ধ সাংবাদিক, তুমি কি জানো তোমরা কতটা ইর্যাশনাল?
আমি একটু রেগে গিয়ে বলি, কোনও মেয়ের সঙ্গে শুই না। ইন ফ্যাক্ট আমি এখনও সুযোগই পাইনি। আমার আছে সোশ্যাল স্ট্যান্ডিং, সামাজিক সম্মানবোধ এবং নিজের স্ত্রী সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভয়–সেই কারণে ইচ্ছে থাকলেও আমি চরিত্রহীন হতে পারছি না।
লুলু খুবই স্নেহের সঙ্গে আমার দিকে চেয়ে ‘তুমি’ থেকে আবার আপনিতে ফিরে গিয়ে বলে–রিপোর্টার মহোদয়, এবার বুঝতে পারছেন তো আপনার মতো একটি ছাগলের পক্ষে নাগরিক স্বাধীনতা কত অর্থহীন একটি শব্দ! এমনকী দেশ জুড়ে যেসব নাগরিক রয়েছে তারাও অধিকাংশই মানুষ নয়, আপনারই মতো ছাগল! নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য মহিলার সঙ্গে শোওয়ার ইচ্ছে ও স্বাধীনতাকে তারা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছেন। সুতরাং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আপনারা কী করবেন?
কত তলায় লিফট থেমেছে তা আমি লক্ষ করিনি। দোর খুলে লুলু বেরোল। সঙ্গে আমিও। খুব ঝকঝকে করিডোর দিয়ে লুলুর পিছু-পিছু হাঁটতে-হাঁটতে আমি বললাম কিন্তু বাকস্বাধীনতা? মিস্টার লুলু, স্বাধীনতার ব্যাপারটা নিয়েও কি আপনি ভাবছেন না?
লুলু সে-কথার জবাব না দিয়ে পিতলের পাতে নম্বর লেখা একটা দরজায় কলিংবেল টিপল। দরজা খুলে বছর পঁয়ত্রিশের এক অসাধারণ সুন্দরী দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে লুলুকে দেখতে দেখতে তার মুখ ভাবালু এবং মোহাচ্ছন্ন হয়ে গেল। চোখ আলোয় ভরে উঠল, ঠোঁট টসটস করতে লাগল, সমস্ত শরীর প্রত্যাশায় ভারসাম্য হারিয়ে টলোমলো করছিল। লুলু দু-হাতে তাকে শরীরের মধ্যে টেনে নেয়, চুম্বন করে এবং বলে–
যা বলে তা অবশ্য লেখা যায় না। চূড়ান্ত ভালোবাসার অসভ্যতম কথা সব। আমি চোখ নামিয়ে নিই এবং না শোনার ভান করতে থাকি।
লুলু সশব্দে তার দশম চুম্বন শেষ করে আমার দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে চোখ টিপে বলে–গেতো রিপোর্টার, নোট নিচ্ছ না যে বড়? আমি যা বলছি এবং যা করছি এসব কি ইম্পর্টান্ট নয়? না কি তুমি আমাকে ঠিক গুরুত্ব দিতে চাইছ না?
আমি অনিচ্ছুক আঙুলে ডটপেন বাগিয়ে ধরি কিন্তু লিখতে হাত সরে না।
লুলু বলল –স্কাউন্ট্রেল ছোটলোক ইডিয়ট!
লুলুর গুরুত্বের কথা ভেবে আমি চুপ করে থাকি। এমনকী একটু হাসবারও চেষ্টা করি।
লুলু ঘরে ঢোকে এবং ইশারায় আমাকেও ঢুকতে বলে। আমি ঘরে ঢুকলে লুলু দরজা বন্ধ করে দিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে–এবার বলো। আমি অভয় দিচ্ছি, তোমার কোনও ক্ষতি করব না।
আমি মুশকিলে পড়ে বলি–কী বলব?
লুলু অবাক হয়ে বলে–তোমার কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না?
