লুলু মাথা নেড়ে বলল –জঘন্য। আসলে একজনকে খুন করার মধ্যে কী যে আছে আমার মাথায় আসে না। লাভ কী? আমার তো ভাবতেই জ্বর আসে? খুনের পর ধরা পড়তে হবে, দিনের পর দিন স্নায়ু–ছেঁড়া মামলা চলবে। তারপর ফাঁসি…ওঃ। তার চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আছে। ধরুন, কাউকে মারার ইচ্ছে হলে আমি তার একটা মূর্তি তৈরি করে সেটার ওপর গুলি চালালাম, ইচ্ছে মতো তারপর লোকটাকে চিঠি লিখে জানিয়ে দিলাম যে, অমুক দিন অমুক সময়ে তোমাকে আমি মেরে ফেলেছি। ব্যস, লোকটাও তা জানার পর একদম মৃতের মতো হয়ে যাবে। অর্থাৎ সব কাজকর্ম অ্যাকটিভিটি বন্ধ করে দেবে। হত্যাটা হবে প্রতীকী এবং তাতে হিংস্রতাও থাকবে না। চিন যুদ্ধের সময় ফের পত্রিকার তরফ থেকে লুলুর কাছে যাই।
–এই যুদ্ধ সম্পর্কে…
লুলু অবিকল একইভাবে চেয়ারে দোল খেতে-খেতে বলে–হোপলেস। যুদ্ধ টুদ্ধের কোনও মানেই হয় না। বিশেষ করে চিনেদের সঙ্গে। আমার মনে হয়, এসব ডিসপিউট মেটানোর জন্য অন্য ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাগ্রহে বলি–কীরকম?
–ধরুন, চিনের সঙ্গে ভারতের একটা হকি ম্যাচের ব্যবস্থা হল। যদি ভারত জেতে তাহলে তার কথাই থাকবে। হকিতে আপত্তি থাকলে চিন পিংপংয়েও ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যাই হোক, আমার কথা হচ্ছে, স্পোর্টসের যুদ্ধটা সেরে নেওয়া ভালো। সিরিয়াসলি মারপিটটা নিছক ছেলেমানুষি। আমি জানি চিন বলছে যে, তিব্বত তাদের। আমার প্রথম বিয়ের আগে আমার বউও বলত সে নাকি আমার, একান্তই আমার। তারপর আরও চারবার বিয়ে করতে হয়েছে আমাকে এবং এখন আবার আমি দারাহীন, কিন্তু প্রথম বউয়ের মতো সব বউই আমাকে ওই একই কথা বলছে, এবং ওই একই কথা হয়তো এখনও তারা তাদের নতুন নতুন প্রেমিক বা স্বামীর কাছে বলছে। এসবের কোনও মানে নেই। দুনিয়াতে কেউ বা কিছু কারও বা কিছুর নয়।
সেদিনই আমি লুলুকে বলি–আপনার চেম্বারটা এয়ারকন্ডিশনড করান না কেন? আর ওই বিপজ্জনক চেয়ারের বদলে আপনি তো অনায়াসে একটা রিভলভিং চেয়ারের ব্যবস্থা করতে পারেন।
এরপরও পাকিস্তান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, কংগ্রসে ভাগ, নকশাল আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আমাকে লুলুর লাক্ষাৎকার নিতে হয়। কিন্তু সেগুলোর কথা থাক। ইমারজেন্সির পর যখন আমি লুলুর কাছে যাই তার বেশ কিছুদিন আগে তার চেম্বার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং সে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে। একটু মাতাল।
বললাম–ইমারজেন্সি সম্পর্কে কিছু বলবেন?
লুলু টেবিলে মৃদু চাপড় দিয়ে বলে–আলবাত!
–কী?
–দেয়ার ইজ অ্যান ইমারজেন্সি। খুবই জরুরি ব্যাপার। খুবই আর্জেন্ট। অনেকক্ষণ ধরেই এটা আমি ফিল করেছি। চলুন যাওয়া যাক।
–কোথায়?
–জরুরি কাজে। খুবই জরুরি।
এই বলে লুলু উঠে পড়ে। আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামিয়ে আনে রাস্তায়, গাড়িতে ওঠায় এবং একটা মদের দোকানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলে–এ ব্যাপারটা খুবই জরুরি।
–কিন্তু আমি জরুরি অবস্থা জারি প্রসঙ্গে…
লুলু আধো চোখ আমাকে দেখল। খুবই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি। দুপেগ করে হুইস্কির হুকুম দিয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল –আপনি নতুন জার্নালিসম করছেন, তাই না?
–না। আমি দীর্ঘকাল ধরে…ইন ফ্যাক্ট আমি আপনার ইন্টারভিউই তো বহুবার…
লুলু মাথা চেপে ধরে একটা কাতর শব্দ করল। তারপর বলল –তাহলে আপনি একটি গর্দভ রিপোর্টার।
–কেন? আমি ফুঁসে উঠে বলি। পরমুহূর্তেই আমার মনে পড়ে যায় যে, লুলু অত্যন্ত ইমপর্ট্যান্ট লোক। দেশের অন্যতম প্রধান নায়ক। সব কিছুর মূলেই লুলু। তাই আমি আবার বিনীত হয়ে বলি–হতেও পারে।
লুলু বলে–অত্যন্ত জরুরি।
–কী?
–এই জরুরি অবস্থা। অন্তত সাতাশ বছর আগে এটা জারি করা উচিত ছিল।
–কেন?
লুলু তার হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে–ফর ওয়ান থিং। গত সপ্তাহে আমার দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে যাওয়া বাতিল করতে হয়। আমি ট্রেনের রিজার্ভেশন ক্যানসেল করার জন্য রেল অফিসে ফোন করি। ফোনের রিং হতেই ওপাশে কে যেন রিসিভার তুলে বলল নমস্কার। আমি রং নাম্বার ভেবে ফোন ছেড়ে দিই। কিন্তু তারপর আরও তিন–তিনবার সেই আশ্চর্য ঘটনা। রেল অফিস টেলিফোনের জবাব দিচ্ছে, এবং জবাব দেওয়ার আগে নমস্কারও জানাচ্ছে। জাস্ট থিংক অফ ইট। গত সাতাশ বছর ধরে আমি রেল অফিসে ফোন করে আসছি, কখনও এরকম ঘটনা ঘটেনি।
আমি খুব মন দিয়ে নোটবইতে কথাগুলি লিখছিলাম। লুলু নোটবইটা সরিয়ে নিয়ে বলল –ওহে ইডিয়ট রিপোর্টার, ইমারজেন্সির মর্ম কবে বুঝবে? তোমার হুইস্কির গ্লাসে এক্ষুনি একটা দারুণ ইমারজেন্সি দেখা যাচ্ছে। বরফ গলে গরম হয়ে যাচ্ছে হুইস্কি। আগে ওটা খাও, তারপর লিখবে।
লুলু খুবই ইম্পট্যান্ট। তার অবাধ্যতা চলে না। হুইস্কি খেতে-খেতে আমি বলি–কিন্তু রেল অফিস থেকে টেলিফোনে নমস্কার জানানোটাই তো বড় কথা নয় মিস্টার লুলু। এতে দরিদ্র ভারতবাসীর কী লাভ হবে। ভারতবর্ষের বহু কোটি লোক টেলিফোন জীবনে একবারও ব্যবহার করেনি বা তারা রেল অফিসেও কোনওদিন টেলিফোন করবে না।
লুলু গম্ভীরভাবে বলে–সরকারের বর্তমান নীতিই হচ্ছে ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত গ্রামে গঞ্জে জনসাধারণের হাতের কাছে, নাগালের মধ্যে টেলিফোন পৌঁছে দেওয়া। প্রত্যেক টেলিফোনের সঙ্গে নোটিশ দেওয়া থাকবে : নমস্কারের জন্য রেল বা সরকারি অফিসে টেলিফোন করুন।
