–না তো!
ধূর্ত! খল! মিথ্যেবাদী! আমাকে তোমার কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না?
ভয় পেয়ে বলিনা। কিছুই না।
লুলু এবার হাহা করে হেসে বলে–তোমার সামনেই একটা নষ্ট মেয়েকে চুমু খেলাম; অসভ্য কথা বললাম, তোমাকে না হোক গালাগাল দিলাম, অথচ তোমার কোনও রি–অ্যাকশন হচ্ছে না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য মহাত্মা রিপোর্টার? বরং তোমার এখন আমাকে খিস্তি করতে ইচ্ছে করছে, লাথি মারতে ইচ্ছে করছে। বলল , করছে না? কিন্তু হায়, তোমার সেই বাকস্বাধীনতা তুমি কখনওই কাজে লাগবে না। শোনো কাপুরুষ, আমার যদি কখনও কাউকে শুয়োরের বাচ্চা বা বেজন্মা বলতে ইচ্ছে করে তবে আমি বলি, তুমি কেন পারো না বলতে?
আমি গম্ভীর হয়ে বলি–ভদ্রতাবোধে বাধে।
লুলু হাহা করে হেসে ওঠে বলে–তাহলে বাক স্বাধীনতা দিয়ে তুমি কী করবে ভিতু সাংবাদিক? যখন যা মনে আসবে তা যদি বলে ফেলতে পারো তবে তোমার বাক স্বাধীনতা আছে, যদি না পারো তত নেই।
বিরক্ত হয়ে আমি বললাম–গালাগাল দেওয়ার অধিকারই তো একমাত্র বাকস্বাধীনতা নয় মিস্টার লুলু। পলিটিক্যাল ইডিওলজি নিয়ে যে মতবিরোধ, সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে যে বিরুদ্ধ সমালোচনা তাই যদি না করা যায়…
লুলু আমাকে একদম পাত্তা না দিয়ে তার ভাঁটানো যৌবনের সুন্দরী প্রেমিকার দিকে এক পা এগোল। ঘরের মাঝখান থেকে তার প্রেমিকাও লিত চরণে এগিয়ে আসে এক পা। তাদের দুজনেরই মুখচোখে আনন্দের মোহ, তীব্র কাম ও বিহুলতা তবু সে অবস্থাতেও লুলু আমার দিকে জ্বলন্ত একটা দৃষ্টিক্ষেপ করে চাপা স্বরে বলে–নোট নাও বুদ্ধ, সব কিছু নোট করে নাও। প্রত্যেকটা স্টেপ লক্ষ করো। সঙ্গম শেষে আমি আমার প্রেমিকাকে খুন করব। খুব লক্ষ কোরো ব্যাপারটা…
আমি চোখ বুজে ফেলি এবং কানে আঙুল দিই। এবং ওই অবস্থাতেই সোফায় বসে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ বাদে লুলুই আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগায়। আমি চোখ মেলতেই লুলু বিরক্তির গলায় বলে–ড্যাম ইনএফিসিয়েন্ট!
লুলুর পদমর্যাদার কথা মনে রেখে আমি বলি–আজ্ঞে।
একটা আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচে ছায়া দেখে টাইয়ের নট ঠিক করতে-করতে লুলু। বলে রিপোর্টার, লাভ–হেট রিলেশন বলে কী একটা কথা আজকাল চালু হয়েছে না? অর্থাৎ আমরা যখন আমাদের প্রিয় বা প্রেমাস্পদকে একই সঙ্গে ভালোবাসি এবং ঘৃণা করি? আমরাও ঠিক সেই অবস্থা। আমি আমার চোদ্দোজন প্রেমিকাকে কেন ঘৃণা করি এবং ভালোবাসি বলো তো? এর আগে আমি আমার চোদ্দোজন প্রেমিকাকে খুন করেছি।
বাস্তবিকই লুলুর প্রেমিকাকে ঘরে দেখা যাচ্ছিল না। উপরন্তু সেন্টার টেবিলের ওপর লুলুর সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার পড়ে আছে। ঘরের বাতাসে বারুদের কটু গন্ধ। আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে সোজা হয়ে বসি এবং বলি–মিস্টার লুলু, আপনি তাহলে সত্যিই আপনার প্রেমিকাকে খুন করেছেন? সর্বনাশ।
লুলু অবাক হয়ে বলে–খুন করার কথাই ছিল যে!
উত্তেজনায় আমার শরীর কাঁপতে থাকে, আমি চিৎকার করে বলি বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে মিস্টার লুলু। আমি এক্ষুনি পুলিশের কাছে যাচ্ছি। আপনি যত বড় মাতব্বরই হোন, এর জন্য আমি আপনাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে।
মহান লুলু বোধহয় এই প্রথম একটু ভয় পেল। তার চোখে–মুখে দ্বিধা ফুটে উঠেছে। একটু চাপা ধমকের স্বরে সে বলে–চুপ করো মূর্খ! আশেপাশে কেউ শুনে ফেলবে।
আমি চেঁচিয়েই বলি–কিন্তু এটা যে খুন মিস্টার লুলু! আমি এটা চেপে রাখতে পারি না।
লুলু ব্যথিত মুখে চেয়ে বলে–বোকা, ব্যাপারটা ভালো করে ভেবে দ্যাখো। পুলিশের কাছে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ভালো কাজ হবে না যাওয়া। এ ব্যাপারটা চেপে রাখার জন্য তোমাকে আমি অনেক টাকা দেব। অনেক টাকা, যত টাকা তোমার দশ বছরের বেতনের চেয়েও বেশি। উপরন্তু পুলিশের কাছে গেলে মামলা–মোকদ্দমা এবং তজ্জনিত নানা ঝামেলায় তোমাকে জড়িয়ে পড়তে হবে। আর-একটা কথা বলে লুলু তার রিভলভারটা তুলে নিয়ে আমার দিকে তাক করে বলে–ইচ্ছে করলে টাকার বদলে অন্য উপায়েও আমি তোমার মুখ বন্ধ করে দিতে পারি।
লুলু হাসল। আমার শরীরে ঘাম দিল। শ্বাস ছেড়ে আমি বললাম কত টাকা?
–দু-লাখ।
লুলু রিভলভার পকেটে পুরে নিয়ে আলমারি খুলল। কয়েকটা নোটের বান্ডিল আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল –এই টাকা দিয়ে একদিন আমি জিনিকে কিনে নিয়েছিলাম। এই টাকার হুকুমেই জিনি তার অন্য সব প্রেমিককে ভাগিয়ে দিয়েছিল। আজ সেই টাকায় তোমাকে কিনছি রিপোর্টার। কে জানে এই টাকাতেই কখনও আর-একজনকে কিনতে হবে কি না।
আমি টাকার বান্ডিলগুলো ছুঁয়ে থেকে একটু শিউরে উঠি। বলি–আপনি আমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছেন না তো মিস্টার লুলু?
লুলু গম্ভীর হয়ে বলে–না। কিন্তু এ ধরনের রোজগারে কিছু রিস্ক যেসব সময়েই থাকে, তা আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম।
আমি গম্ভীর হয়ে বলি–আমাকে ভয় দেখাবেন না মিস্টার লুলু, আমার হার্ট খুব ভালো নয়।
লুলু কাঁধ ঝাঁকিয়ে পুরো প্রসঙ্গটি অবহেলায় ঝেড়ে ফেলে বলে–আপনি নাগরিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে কী যেন জানতে চাইছিলেন?
পাশেরই ঘরেই হয়তো জিনির মৃতদেহ পড়ে আছে। পরিস্থিতিটা খুবই অস্বাভাবিক। তবু নিজের কর্তব্যে অবিচল থেকে আমি নোটবই বের করি এবং আগ্রহের গলায় বলি–দয়া করে বলুন।
