লামডিঙের লোকের অবশ্য জ্বালাতনের অভাব ছিল না। কোজাগরী পূর্ণিমায় লামডিঙের আশেপাশে বনের মধ্যে যেসব সাদা সুন্দর ডল পুতুলের মতো পরিরা নেমে আসত, তাদের কথা সকলেই জানে। লামডিঙের পরিদের মতো সুন্দর পরি অন্য কোথাও দেখা যায় না। তারা বুনো ফুলের মধু খেত ঘুরে-ঘুরে উড়ে–উড়ে। বাতাসে ভেসে তারা কতরকমের নাচের মুদ্রা তৈরি করত। চারদিকটা ভরে উঠত তাদের গায়ের আশ্চর্য সুগন্ধে।
কিন্তু জ্বালাতন এল অন্য দিক থেকে। ভিন্ন গ্রহের যেসব প্রাণী মহাকাশ থেকে প্রায়ই লামডিঙের বনে বাদাড়ে তাদের বেলুনের মতো বা চুরুটের মতো বা পিরিচের মতো মহাকাশযানে করে নামত তাদের সঙ্গে কারও কখনও ঝগড়া বিবাদ বা যুদ্ধ হয়নি। তারা নেমে এসে লামডিঙের সরস সতেজ ঘাস কেটে নিয়ে যেত, ছিঁড়ে নিয়ে যেত লেবু বা করমচার পাতা। তাদের চেহারা খুবই অদ্ভুত, পোশাকও অন্যরকম। লামডিঙের লোকেরা তাদের দূর থেকে দেখত। কাছে যেত না। শুধু রসো পাগলা গিয়ে তাদের কছে বিড়ি চাইত। ভিন্ন গ্রহের প্রাণীরা যে বিড়ি খায় না এ তো সকলেই জানে। তবে তারা ঘাস ও গাছের পাতা খেতে খুবই ভালোবাসে। ভিন্ন গ্রহের একজন প্রাণী একবার সত্যসিন্ধুবাবুর নাতনির হাত থেকে রসগোল্লা কেড়ে নিয়ে খেয়েছিল বলে শোনা যায়। এবং রসগোল্লা খাওয়ার পরই সে সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে টলতে-টলতে কোনওরকমে তার মহাকাশযানে ফিরে গিয়েছিল। একবার তাদের নজর পড়ল ওই পরিদের দিকে। সেবার কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে যখন পরিরা এসে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আনন্দ করছে তখন অনেকগুলো মহাকাশযান চারদিকে নেমে এল এবং ভিন্ন জগতের প্রাণীরা দলে–দলে জালদড়ি আর আঠাকাঠি নিয়ে এল পরিদের ধরতে। তারপর বনের মধ্যে সে কী হুর যুদ্ধ!
রসো পাগলাই প্রথম খবরটা দিল সবাইকে ছুটে এসে। লামডিঙের লোকেরা খুব বীর নয়, কিন্তু পরিরা হল তাদের নিজেদের ছেলেমেয়ের মতো। লাঠিসোঁঠা নিয়ে তারাও ছুটল পরিদের বাঁচাতে।
কিন্তু ভিন্ন গ্রহের প্রাণীরা অনেক বেশি শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান। তারা নানারকম অস্ত্রশস্ত্র বের করে ভয় দেখাতে লাগল। অন্যদিকে পরিরা তখন প্রাণপণে ছুটোছুটি করছে। আর একদল ভিন্নগ্রহের প্রাণী তাদের নানা কলাকৌশলে ঝপাঝপ ধরে ফেলছে।
এই যখন অবস্থা তখন হঠাৎ ঘড়িরাম কোথা থেকে এসে হজির হল। তার হাতে ছোরা। সঙ্গে মেরি, মেরির হাতে একগাছা ঝাঁটা। তারপর সে এক লণ্ডভণ্ড কাণ্ড। ভিন্ন গ্রহের প্রাণীরা যতই গুলি করুক আর রশ্মি ছুঁড়ুক ঘড়িরামের কিছুই হয় না। কিন্তু ঘড়িরামের পরাক্রমে তাদের নাজেহাল অবস্থা। মেরির ঝাঁটাও কম গেল না। নয়নসাধুর পাঁচটা ভূতও এসে হাত লাগাল। তাদের চেহারা রোগা এবং ধোঁয়াটে হলেও ভিন্ন গ্রহের প্রাণীরা তাদের কাছে গো–হারান হেরে পালাল।
পরিরা আবার খেলতে লাগল বনের মধ্যে। লামডিঙের গল্প সহজে শেষ হওয়ার নয়। এক গল্প থেকে আর একটা গল্পে এবং তা থেকে আর এক গল্পে চলে যেতে কোনও বাধা নেই। চোর সাধু ম্যাজিসিয়ান লোভী কৃপণ সবরকমের মানুষ এবং অমানুষ নিয়ে লামডিং। নিত্যই সেখানে নতুন-নতুন সব ঘটনা শুরু হচ্ছে। কিন্তু সব ঘটনাই যে শেষ হচ্ছে এমন নয়। আসলে পৃথিবীর কোনও গল্পই বোধেহয় পুরোপুরি শেষ হয় না। নানা শাখাপ্রশাখায় তা ছড়িয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আমাদের তো এক জায়গায় থামতেই হবে।

লুলু
লুলুই হচ্ছে সবকিছুর মূলে।
লুলু আসলে কে বা তার গুরুত্বই বা কী তা আমার কাছে অস্পষ্ট। তবে যতবারই দেশে কোনও-না-কোনও ঘটনা ঘটে তখনই আমাকে লুলুর কাছে আসতে হয়, তার সাক্ষাৎকার নিতে। এ যাবৎ তার কত যে সাক্ষাৎকার নিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তবু লুলু আমাকে আদপেই মনে রাখেনি। দেখা হলে সম্পূর্ণ নতুন করে পরিচয় দিতে হয় এবং পুরোনো পরিচয়ের কোনও স্মৃতির ঝলকানিও লুলুর ভাবসাবে কখনও ফুটে ওঠে না। এটাই যাকে বলে আপশোশ কি বাত।
১৯৪৭ সালের ষোলোই আগস্ট আমি লুলুর সাক্ষাৎকার নিতে আসি, মনে আছে। তখন লুলুর চেম্বার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল না, তবে সে তখনও এখনকার মতোই ব্যস্ত মানুষ ছিল। দেখা করার জন্য আমাকে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়। ঘরে ঢুকে কিন্তু লুলুকে একটুও ব্যস্ত দেখিনি। টেবিলের ওপর পা তুলে সে বসেছিল। চেয়ারটা পিছন দিকে হেলে দুটো পায়ার ওপর বিপজ্জনকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করছে কোনওক্রমে। লুলু মৃদু হেসে বলল –বি কুইক।
–এই স্বাধীনতা, এই চূড়ান্ত জয়, এই দেশ বিভাগ এবং এই…এই…আবেগে আমার গলা বসে গেল।
লুলু মাথা নেড়ে বলল –হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই স্বাধীনতা, এই দেশ বিভাগ আর যা কিছু সবই খুব চমৎকার। অতি চমৎকার। এই জয়…তবে আমার একটা ভয় হচ্ছে যে, যেসব ইংরেজ এদেশে মারা গেছে তাদের ভূতগুলো চলে যাচ্ছে না। সেগুলোকে যদি না তাড়ানো যায় তবে পাকে প্রকারে ইংরেজও থাকছে। এবং ইংরেজিয়ানাও। এখন আমাদের উচিত হবে ভারতের অতীতের ভূতদের ইংরেজ ভূতের বিরুদ্ধে লাগানো।
লুলু যে সামান্য মাতাল অবস্থায় ছিল তা তখন আমি টের পাই।
গান্ধি হত্যার পর আমি লুলুর কাছে গিয়ে আবার ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর চেম্বারে ঢুকে দেখি লুলু অবিকল সেইভাবেই বসে আছে।
বলি–এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই হত্যা…