তারপর থেকে লামডিঙে টিকটিক শব্দের আর কোনও অভাব রইল না। সর্বত্র এবং প্রায় সর্বদাই টিকটিক শোনা যেতে লাগল।
এই শব্দই একদিন ব্রজেশ্বরকে তাঁর ঘরের বাইরে টেনে আনল।
ব্রজেশ্বর বসু যে লামডিঙে থাকেন এটা অনেকের জানা ছিল বটে, কিন্তু মানুষটা গত বিশ বছর তাঁর ঘর থেকে বেরোননি। বাজার–হাট দোকানপাট কোথাও তাঁকে কখনও দেখা যায় না। তাঁর বাজার হাট করেন প্রৌঢ়া স্ত্রী। ব্রজেশ্বর তাঁর ঘরে বসে গত বিশ বছর যাবৎ একটানা সৃষ্টিতত্ব বিষয়ে একটা গুরুতর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে কেউ কেউ শুনেছে। তবে মানুষটাকে কেউ চোখে না দেখতে পাওয়ায় মোটামুটি তাঁর কথা সবাই ভুলে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে চোর মগন এসে পায়রার জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কটকটি বাজিয়ে তাকে সংকেতে ডাকছিল। চুরি করতে বেরোনোর আগে পায়রার সঙ্গে রোজই সে দেখা করে যায়। গগনবাবুর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর ঝগড়া চলছে কিছুদিন। গগনবাবু কটকটি বাজিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে ভাত চাইছিলেন। কালীবাবুর বাড়িতে বেড়ালে দুধে মুখ দিয়েছে বলে তাঁর ছেলে বাবু আনন্দে কটকটি বাজাচ্ছিল। আজ রাতে তাকে আর দুধ খেতে হবে না।
কাছাকাছি এতগুলো কটকটি একসঙ্গে বেজে ওঠায় ব্রজেশ্বর দীর্ঘ বিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম সচকিত হলেন। তাঁর মনে হল, একটা কোনও বিপর্যয় আসন্ন। তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসে তিনি দেখলেন, পৃথিবীটা বিশ বছরে অনেক পালটে গেছে। যেখানে গাছ। ছিল সেখানে বাড়ি উঠেছে, যেখানে মাঠ ছিল সেখানে রাস্তা হয়েছে। সেদিন খুব ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। ব্রজেশ্বর মুগ্ধ হয়ে চারিদিকটার দৃশ্য দেখতে লাগলেন এবং ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
তাঁদে দেখে পায়রা ‘ভূত-ভূত’ বলে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল এবং মগন ‘রাম-রাম’ বলতে বলতে প্রাণভয়ে ছুটে পালাল। মগনের কটকটি যন্ত্রটা পড়ে গিয়েছিল, ব্রজেশ্বর সেটা কুড়িয়ে পেলেন এবং বাজিয়ে দেখলেন। গত বিশ বছর তিনি ঘরের বাইরে আসেননি। তাই তিনি জানেন না, মানুষ এই ক’বছরে কী কী আবিষ্কার করেছে। তিনি দেখে খুবই বিরক্ত হলেন যে, মানুষ এই বিশ্রী যন্ত্রটা আবিষ্কার করেছে। কটকটিটা হাতে নিয়ে তিনি আনমনে হাঁটতে লাগলেন।
সামনেই একটা ভাঙা বাড়ি এবং পরিত্যক্ত বাগান। বাগানের ধারে তিনি এক যুবক এবং একটি যুব তাঁকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলেন। যুবক এবং যুবতীরা জ্যোৎস্না রাতের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে কী করতে পারে তা ব্রজেশ্বর চিন্তা করলেন না। তিনি সোজা গিয়ে তাদের সামনে হাজির হয়ে কটকটিটা বাজিয়ে ক্রুদ্ধস্বরে বলতে লাগলেন, মানুষ গত বিশ বছরে এইসব আবিষ্কার করে দুনিয়াটাকে উচ্ছন্নে দিচ্ছে আর তোমরা এখানে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ফিসফাস করছ?
যুবতীটি জলভরা চোখে যখন ব্রজেশ্বরের দিকে ফিরে চাইল তখন ব্রজেশ্বর অবাক হয়ে দেখলেন মেয়েটি মেমসাহেব। মেয়েটি কুঁপিয়ে–ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ছেলেটা ব্রজেশ্বরের দিকে কটমট করে চেয়ে বলল , আমরা দুঃখের কথা বলছিলাম আর আপনি এসে সব ভণ্ডুল করে দিলেন। মানুষ কী করেছে তা আমরা জানি না। জানতে হলে মানুষদের কাছে যান। আমরা মানুষ নই।
ব্রজেশ্বর অবাক হয়ে বললেন, তবে তোমরা কী?
আমি ঘড়িরাম আর এ হচ্ছে মেরি, আমরা দুজনে দুজনকে ভালোবাসি। ব্রজেশ্বর ভালোবাসা কথাটার তেমন মানেই জানেন না, মাথা চুলকে বললেন, ও তা সে বেশ তো।
কিন্তু মনে-মনে ব্রজেশ্বর খুব ভাবতে লাগলেন, ভালোবাসা জিনিসটা গোল না চৌকো, লাল না সবুজ। ঘড়িরাম আর মেরি সেই জ্যোৎস্নারাত্রে ব্রজেশ্বরকে পেয়ে তাদের দুঃখের কথা বলতে লাগল। ঘড়িরাম মেরিকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু নয়নসাধু বলেছে ঘড়িরাম তিন হাজার ঘড়ি পণ দিলে সে কিছুতেই মেরিকে ছাড়বে না। অথচ ঘড়ি ঘড়িরামের প্রাণ।
অনেকক্ষণ ধরে শোনার পর ব্রজেশ্বরের মাথা হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল, ভালোবাসা জিনিসটা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন, বহুকাল পর স্মৃতিপটে আবার সেসব ভেসে উঠল। ঠিকই তো, তিনিও তাঁর বউকে একসময় ভালোবাসতেন। তারপর সৃষ্টিতত্বের পাল্লায় পড়ে জিনিসটা একদম উবে। গিয়েছিল মন থেকে।
ব্রজেশ্বর আর দাঁড়ালেন না। প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন তাঁর প্রৌঢ়া স্ত্রী ঘুমোচ্ছেন। মুখখানায় দুঃখ–দুর্দশার ছাপ পড়েছে বটে, কিন্তু এখনও লক্ষ্মীশ্রী লেগে আছে। বউকে ঘুম থেকে জাগিয়ে একটু আদর করতে ইচ্ছে করছিল তাঁর। কিন্তু বহুকাল বউকে ডাকেননি বলে নামটিও মনে আসছিল না।
হঠাৎ হাতের কটকটির দিকে নজর পড়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ব্রজেশ্বর। বউয়ের কানের কাছে কটকটিটা নিয়ে বাজাতে লাগলেন।
বহুদিন বাদে সেই রাতে দুজনের খুব ভালোবাসা হল। তাঁরা দুজনেই খুব হাসলেন, একটু কাঁদলেনও, অনেক জমা কথা ছিল, সেগুলোও বলতে লাগলেন। কথার ফাঁকে কৌশলে বউয়ের নামটাও জেনে নিলেন ব্রজেশ্বর। উমা। নামটা তাঁর বেশ পছন্দই হল। আর সবচেয়ে বড় কথা, কটকটি জিনিসটাকে তাঁর আর অপছন্দ হল না। খুবই উপকারী জিনিস। মানুষের অনেক কাজে লাগে।
পরদিন থেকেই ব্রজেশ্বরকে পথে ঘাটে হাটে বাজারে সর্বত্র দেখা যেতে লাগল। হাতে কটকটি। যখন তখন বাজাচ্ছেন। লোকে জ্বালাতন হয়ে গেল।
