মেয়েটা ধীরে মুখ নামিয়ে তার দিকে ফিরে বলল, তাই তো কথা!
যোগেন পেঁচার ডানার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। জ্যোৎস্নায় উড়ে বেড়াচ্ছে পাখিটা। তার ছায়া একবার যেন স্পর্শ করে গেল তাকে। শিউরে উঠল যোগেন। ছায়াটা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। সাবধান করছে তাকে। ভয়। দেখাচ্ছে।
না না, তোমার কোনো ভয় নেই।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, টাকা দিলেন যে!
তাতে কী!
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, আপনি যে বললেন আপনার একজন মেয়েমানুষ না হলে চলে না।
বলেছি! কথাটা ধোরো না মা, বড় ভুল হয়ে গেছে।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, মা! মা বলে ডাকছেন আমাকে?
যোগেন মাথা নেড়ে বলে, তাই তো ডাকলুম।
ওমা! কেন?
কী হচ্ছে তা বুঝতে পারল না যোগেনও। সে নয়, তার ভেতর থেকে যেন অন্য কেউ কথা কইছে। থতোমতো খেয়ে সে বলে, মুখ থেকে বেরিয়ে গেল যে!
মেয়েটা হেসে বলে, তা হলে কী হবে?
কিছু হবে না মা। ঘরে এসো, কিছু খাও।
খাব? হ্যাঁ, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।
তা খেল মেয়েটা। ডাল, ভাত, তরকারি, কী যত্ন করে ছোটো ছোটো গরাসে খেল দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল যোগেন। নাঃ, তার মনে আর কোনো ধন্দ নেই। সে যা বোঝার বুঝে গেছে।
আমাকে কি দিয়ে আসবেন মায়ের কাছে?
যোগেন গর্জন করে উঠল, পাগল!
তা হলে?
লক্ষ্মীকে হাতে পেলে ছাড়তে আছে? আমার একটা ছেলে আছে মা। ব্যাবসা-বাণিজ্যে মন নেই, তার লেখাপড়ায় মন। ছেলে বড়ো ভালো। তার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব।
মেয়েটা লজ্জায় মাথা নোয়াল।
লামডিঙের আশ্চর্য লোকেরা
লামডিঙে খুবই অদ্ভুত–অদ্ভুত ধরনের ঘটনা ঘটত। এই ছোট্ট শহরে কৃপণ, লোভী, রাগি, চোর, সাধু, ম্যাজিসিয়ান, ডাকাত, সাহসী, ভীতু নানারকমেরই লোক ছিল। সকলেই সকলকে চিনত।
মগন ছিল চোর এবং খুব একটা উঁচু দরের চোরও নয়। প্রায়ই চুরি করতে কারও বাড়ি ঢুকে ধরা পড়ে যেত। সত্যসিন্ধুবাবুর বউ একদিন তাকে রান্নাঘরে ধরে ফেললেন। চুরি করার আগে মগন জালের মিটসেফ থেকে মাছের ঝোল আর ভাত বের করে খাচ্ছিল আপন মনে। খেয়েদেয়ে বাসনপত্র নিয়ে সটকাবার মতলব। ধরা পড়ে যাওয়ায় খুব বিগলিত মুখে বলল , চারটি খাচ্ছি মাসিমা। গরিবের তো এই একটাই দোষ, বড্ড খিদে পায়। সত্যসিন্ধুবাবুর বউ তাতে গললেন না, চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করলেন। লোক জড়ো হয়ে মগনকে নাকে খৎ দেওয়ালো। এতে প্রতিবেশী গগনবাবু একটু অসন্তুষ্ট হয়ে রীতিমতো উঁচু গলায় কালীবাবুকে বললেন মশায় মগনটা একেবারে কাঁচা চোর বটে, কিন্তু চোর তো? এ তল্লাটে ওই মোটে একটাই চোর, তা ও যদি চুরি ছেড়েই দেয় তবে গেরস্তকে সজাগ রাখার আর তো উপায়ই রইল না। চোর ছ্যাঁচড় থাকলে মানুষ সাবধান হতে শেখে, নষ্টচন্দ্রার দিন যে চুরির প্রথা আছে তাও হল ওই জিনিসই। আমি বলি কি, মগন যদি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েই তবে আমাদের উচিত তাকে হাসিমুখে ক্ষমা করা। মগন। আমাদের একটা মৌলিক শিক্ষা তো দেয়। সতর্কতার শিক্ষা।
কালীবাবু কথাটার যুক্তিযুক্ততা মেনেই বোধহয় আমতা-আমতা করে বললেন, মগনের উচিত চুরিটা আরও ভালো করে শেখা। নইলে প্রায়ই ব্যাটা ধরা পড়ে মাঝরাতে আরামের ঘুমটার দফা রফা হয়ে যায়। এ মোটেই ভালো কথা নয়।
গগনবাবু দুঃখ করে বললেন, কে শেখাবে বলুন? সেরকম গুরু কি আর আছে? আমরা ছেলেবেলায় দেখেছি করিম–চোর সামন্ত দারোগার কোমরের বেল্টখানা বাজি রেখে দিনে দুপুরে চুরি করল।
কালীবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, দুপুরে দারোগারা খুব ঘুমোয় আর ঘুমোনোর সময় বেল্ট খুলে রাখে। এটা খুব খারাপ অভ্যাস।
গগনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, মোটেই নয়। কোমরে পরা অবস্থায় খুলে নিয়ে করিম বাজিকে। বাজি জিতল তার ওপর সামন্ত দারোগা। পাঁচ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, জীবনে এরকম চোর আর দেখিনি। তুই ডাকাত হ।
পরদিনই সকালবেলা মগন বাজারে গিয়ে গোপেশ জাদুকরকে ধরল। গোপেশদা, দু-চারটে হাতসা ফাঁই এবারে শিখিয়ে দিন। নইলে ইজ্জত থাকছে না।
গোপেশ যাদুকর লোকটা মজার মানুষ। সময়ে এবং সর্বত্রই সে হাতসা ফাঁই দেখায়। ম্যাজিক ছাড়া সে একদম থাকতে পারে না। বাজার করার সময়েও সে কত সময়ে মাছ, ফুলকপি, আলু বা দোকানে ঢুকে বিস্কুটের প্যাকেট, ক্রিমের শিশি সকলের চোখের সামনেই হাওয়া করে দেয়। তবে মগনের সঙ্গে তার তফাত হচ্ছে, সে আবার জিনিসগুলো ফিরিয়ে দেয়। সে তো চোর নয়।
রোজকার মতোই সে মগনকে বোঝাতে লাগল, চোর যদি জাদুকর হয় বা যাদুকর যদি হয় চোর তাহলে সমাজের ঘোর বিপদ। চুরি করা যদি ছেড়ে দিস তবে শেখাতে পারি।
মগন মাথা চুলকে বলে, আচ্ছা ভেবে দেখি।
আসলে মগনের বিপদ হয়েছে পায়রাকে নিয়ে। পায়রা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তার খুব ভাব। কিন্তু পায়রার বাপ পাঁচশো টাকা পণ চেয়ে বসেছে। সেটা জোগাড় না হলে বিয়ে হওয়ার নয়। পায়রা রোজ খোঁটা দিচ্ছে, হিঃ খুব জানা আছে, কেমন মুরোদের চোর।
মগনকে বিদায় করে গোপেশ নানা মজার কাণ্ড করতে-করতে বাজার সারে। শৈবালবাবু অতি সতর্ক লোক। তার জামার ভিতরে গুপ্ত পকেট, তাতে টাকা রেখে সেফটিফিন দিয়ে আটকে তবে বাজারে আসেন এবং সারাক্ষণ পকেটে হাত চেপে থাকেন। সেই শৈবালবাবু আজ শীতের প্রথম ফুলকপি কিনে দাম দিতে গিয়ে থ’। পকেটে টাকা নেই।
