বেজার মুখে উঠল যোগেন। আলমারি খুলে টাকাটা দিয়ে দিল। আহাম্মকিই হল বোধহয়। মেয়েটার মুখখানা বড়ো ভালো লেগে গেল যে! টুলটুলে মুখ, ভারি মিষ্টি।
যাওয়ার সময় দ্বিজপদ বলে গেল, বাবু, একেবারে কুমারী মেয়ে! ঘরও ভালো। পেটের দায়ে নানা ধান্দাবাজি করে বেড়াই, নরকবাস আমার কপালে আছেই। কিন্তু এ-কথাটা বিশ্বাস করবেন, দশ হাজার টাকা আপনার জলে ফেলা হচ্ছে না।
বেলা চারটার পর মালঘর খোলে। তখন খদ্দেরের ভিড় লেগে যায়। বস্তা বস্তা ভুসিমাল, চটের বস্তা, দড়ি এইসব বোঝাই হয় লরি, টেম্পো আর ভ্যানে। যোগেনের তখন দম ফেলার সময় থাকে না।
মেয়েটাকে একটু বাজিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল, তা সেটা আর রাত আটটা অবধি হয়ে উঠল না। খাজাঞ্চি আর সে মিলে, রাত আটটা নাগাদ যখন হিসেব-নিকেশ করে উঠল তখন দেখল আজকের আদায়-উসুল বড্ডই যেন ভালো। মালও গেছে প্রচুর। এত বড়ো মালঘর ফাঁকা হয়ে যেন হাঁ-হাঁ করছে।
খাজাঞ্চি বলল, উঃ, আজ বিক্রিটাও হয়েছে বটে! তাই দেখছি। কত হল বল তো? বাহান্ন হাজার টাকার বেশি। সব নগদ আদায়। মাত্র চারজন খাতা লিখিয়েছে। তা সেখানেও না হোক আরও দশ-বারো হাজার টাকা হবে।
হুঁ। বড্ড ভালো।
খাজাঞ্চি বিদেয় হলে সদর দরজা বন্ধ করে মালঘরের পেছনে নিজের ঘরখানায় এসে জামাটামা ছাড়ল। যোগেন। আশ্বিন মাসেও আজ ঘাম হচ্ছে। টাকার গরম-ই হবে। পুজোর আগে বিক্রিবাটা ভালোই হয়। কিন্তু এত ভালো নয় তা বলে। যোগেন হিসেব দেখে অনুমান করল, কম করেও আজ তার পনেরো হাজার টাকা থাকবে।
দিনে পনেরো হাজার টাকা রোজগারটা যদি বজায় থাকে, তা হলে আর ভাবতে হবে না। দুটো মেয়ের বিয়ে লাগিয়ে দেবে আর সনাতন মুহুরির সম্পত্তিটাও খরিদ করতে পারবে। বায়না করে রেখেছে মাস দুয়েক হল। আরও কিছু শখ-আহ্লাদ আছে। তা সেসব হবেন।
যোগেন মালঘরেই থাকে। পেছন দিকটায় গোটা দুই খুপরি বানিয়ে নিয়েছে। রান্নাঘর, টিউবওয়েল, পায়খানা সবই আছে। এখানে থাকায় মালঘরে পাহারাও হয়, আর ব্যাবসাটার সঙ্গে নিজেকে সেঁটে রাখতেও সুবিধে হয়।
হাতমুখ ধুয়ে এসে ঘরে-রাখা সিংহাসনে গুচ্ছের ঠাকুর দেবতাকে আজ খুব পেন্নাম ঠুকল সে। দিনটা বড়ো পয়া।
প্রণাম করে ওঠার সময় মাথায় বজ্রাঘাতের মতো মেয়েটার কথা মনে পড়ল। তাই তো! আশ্চর্য! কাজকর্মে মেয়েটার কথা মনেই ছিল না তার। সাড়াশব্দও তো পাওয়া যাচ্ছে না! তাহলে কি পালাল নাকি? উরেব্বাস, দশ দশটি হাজার টাকা গুনে দিয়েছে যে, একটু আগে দ্বিজপদকে!
তাড়াতাড়ি উঠে সে ওপাশের ঘরটায় ঢুকে দেখল, না, পালায়নি। চৌকিতে পাতা বিছানায় পড়ে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। দুটো পা চৌকির বাইরে ঝুলে আছে। আর জানলা দিয়ে আসা পূর্ণিমার দুধের মতো চাঁদের আলায় বিছানা ভেসে যাচ্ছে। আর মুখখানা যেন খুব ফুটে উঠেছে জ্যোৎস্নায়।
দাঁড়িয়ে দেখছিল যোগেন। এ কে? এ আসলে কে? অমন মুখ, অমন পায়ের গড়ন, অমন চমৎকার চুলের ঢল। এ কি রাখা মেয়েমানুষের রূপ!
মাথায় ফের একটা বজ্রাঘাত। সর্বনাশ! এ এল আর সঙ্গে সঙ্গে তার বিক্রিবাটা চৌগুণে উঠে গেল যে! কী করে হয়? অ্যাঁ! কী করে?
ঘুনধুন করে একটা পেঁচা ডাকছিল বাইরে। রোজই ডাকে। রাতের বেলাতেই তাদের কাজকর্ম কিনা! কিন্তু হঠাৎ সেই পেঁচার ডাকটা কানে বড়ো লাগল যোগেনের। পেঁচাটা কি কোনো সংকেত দিচ্ছে তাকে? কিছু বলছে?
পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল যোগেন। দরজার কাছে উপুড় করে রাখা লোহার বালতিটায় পা লেগে খটাং করে শব্দ হল একটা।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা চমকে জেগে গেল।
জ্যোৎস্নায় সব দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা চোখ চেয়ে অবাক হয়ে চারদিক দেখছে। তারপর তাকে দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। অপরাধী গলায় বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।
যোগেনের মুখে কথা এল না। কেমন যেন শ্বাস আটকাচ্ছে গলার কাছটাতে। সে দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটা তার ভাঙা খোঁপাটি ফের বেঁধে নিল। তারপর যোগেনের দিকে চেয়ে মিষ্টি গলায় বলল, এখানে কি টিপকল আছে?
আছে বই কী, এই তো পিছন দিকটায় উঠোন। এসো, পাম্প করে দিচ্ছি।
বুকটা বড়ো ধক ধক করছে যোগেনের। বড়ো ভয়-ভয় করছে, বড়ো অদ্ভুত লাগছে। মেয়েটা আঁজলা করে জল খেল, চোখে-মুখে জলের ঝাঁপটা দিল।
তারপর বড়ো বড়ো দুটি চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।
ওই চোখে চোখ রাখে সাধ্যি কী যোগেনের? শরীরে কাঁপুনি দিল তার।
মেয়েটা আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলল, এই বুঝি ঘরদোর?
যোগেনের কাঁপুনি থামছে না। বলল, হ্যাঁ।
মেয়েটা একটা শ্বাস ফেলে বলল, এখানেই থাকতে হবে বুঝি আমাকে?
যোগেনের মাথায় কথা আসছে না। সে আমতা আমতা করে বলে, তা-ইয়ে-ইচ্ছে হলে—
আমার আবার ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে কিছু আছে নাকি? নষ্ট হতে এসেছি, আমার ইচ্ছেয় কি কিছু হবে?
যোগেন হঠাৎ শুনতে পেল, অশ্বথ গাছ থেকে পেঁচাটা খুব ডেকে উঠল। খুব ডাকছে। ভীষণ ডাকছে। ভয়টা যেন সমস্ত বুক আর মাথা গ্রাস করে নিল তার। শরীরের কাঁপুনিটাও এমন বেড়ে গেল যেন, মূৰ্ছা হবে। কিন্তু মুখে কথা আসছে না।
মেয়েটা জ্যোৎস্নায় ঊর্ধ্বমুখে চেয়ে থেকে বলল, মা বেচে দিল আমাকে। আপনি কিনে নিলেন। আমি যেন একটা কী। এখনও বিশ্বাস হয় না। কখন নষ্ট করবেন আমাকে?
এইবার যোগেনের মুখে কথা এল, নষ্ট! নষ্ট হবে কেন? নষ্ট হওয়ার কথা নাকি তোমার?
