গোপেশ পাশেই দাঁড়িয়ে পালং শাক কিনছিল। একটু হেসে বলল , আরে তাতে কী! আমি কিছু ধার দিচ্ছি কপিটা কিনেই বাড়ি যান।
শৈবালবাবু হেঁ-হেঁ করে কিছুক্ষণ জামার পকেটটা চুলকোলেন। তারপর গোপেশকে বললেন, ইয়ে বুঝলে কথাটা পাঁচ কান কোরো না। ষষ্ঠীপদর সঙ্গে একটা বাজি ধরেছিলুম, যদি কেউ আমার পকেট কখনও মারতে পারে তাহলে পাঁচশো টাকা হারব। যা টাকা গেছে যাক, বাজিটা না হারি।
গোপেশ গম্ভীর হয়ে বলল , তাই বা কেন, টাকাটা তো মনে হয় বেশি দূর যায়ওনি। ওই তো ব্রিজলাল বেগুনওলার কাঁধের গামছাটায় কী যেন একটা বাঁধা আছে, দেখুন তো।
বলাই বাহুল্য ব্রিজলালের গামছায় বাঁধা অবস্থায় শৈবালবাবুর টাকা পাওয়া গেল এবং ব্রিজলাল খুবই অপ্রতিভ হাসি হেসে বলল , গোপেশবাবু, আপনি তো আমাকে জেল খাঁটিয়ে মারবেন।
বাজার টাজার সেরে গোপেশ যখন ফেরে তখন মোড়ের মাথায় গোলবাড়ির বারান্দায় বসে থাকা অহীনবাবু তাঁকে ধরবেনই, ও গোপেশ, আরে এসো–এসো এদিকে একটু, মাছটা কী কিনলে একটু দেখিয়ে যাও।
বুড়ো মানুষ বলে গোপেশ বা আর কেউই তাঁকে এড়াতে পারে না। অহীনবাবু বেশ ভোরে উঠে একটু মর্নিংওয়াক সেরে এসেই বারান্দায় দক্ষিণ কোণটায় মোড়া পেতে বসে থাকেন। অহীনবাবুর এই কোণটায় বসবার একটা কারণ হল, ওদিকটায় বড়লোক আশুতোষ ঘোষের বাড়ির রান্নাঘর। সকাল থেকেই রান্নাঘরের নানারকম ভালো ভালো গন্ধ আসতে শুরু করে। রুটি সেঁকার গন্ধ, ডিম ভাজার গন্ধ, মাংসের গন্ধ, মাছের কালিয়া বা পোলাওয়ের গন্ধ। অহীনবাবু নিজের পয়সায় ভালো জিনিস কখনওই খান না। কিন্তু গন্ধের নেশায় তাঁর অর্ধেক খাওয়া হয়ে যায়। তাঁর আর এক নেশা হল, কে কী কিনে আনছে বাজার থেকে তা দেখা।
বসে বসেই হাঁক মারেন, ওহে ও শিকদার, বলি সব ভালো তো? তা মাছটা মনে হয় আজ জব্বর কিনেছ! মুখখানা তোমার বেশ হাসিহাসি দেখছি যেন। দেখি–দেখি, আমরাও একটু হাসি।…বাঃ বাঃ এ যে সরল পুঁটি গো, ভারী তেলালো মাছ, একটু সর্ষেবাটা আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে রাঁধতে বোলো বউমাকে। এক্কেবারে চাকুম চাকুম লেগে যাবে’খন।…আরে মুখুজ্জেমশাই নাকি? প্রাতঃপেন্নাম। আজও কি কাটাপোনা নাকি? থলেটা একটু ফাঁক করুন দাদা, আপনার কাটাপোনাকে একটা গুডমর্নিং জানিয়ে দিই। ব্রাহ্মণের ভোগে লাগবে, ব্যাটার কপালটা ভালোই।…আরে আরে কে ও? কালী না? বলি পালাচ্ছ কোথায়, তোমার মাছ না দেখে কি ছাড়ব? …ও বা–বা এ যে দেখছি ফুলকপি আর কই মাছ। আজ তো একেবারে খুনখারাপি করে ফেলেছ হে…সবাই চলেটলে গেলে অহীন ধীরে সুস্থে বাজারে বেরোন। বেশি বেলায় বাজারে তেমন কিছু থাকে না। ঝড়তি পড়তি যা পান সস্তায় কেনেন। কপি পাতাটাতা অনেক সময় দোকানিরা ফেলে দেয়। অহীনবাবু সকলের অলক্ষ্যে তাও কয়েকটি কুড়িয়ে নেন।
এই সময়ে বাজারে অহীনবাবুর সঙ্গে প্রায় দিনই বিধুবাবুর দেখা হয়ে যায়। বিধুবাবু লোকটার ভারী ভুলো মন। সকালবেলায় বাজারে তিনি প্রায়দিনই কিছু না কিছু হারিয়ে যান। হয় পয়সা, না হয় চশমা, কিংবা ঘড়ি, অথবা পকেটের পেন, কখনও পায়ের এক পাটি চটি, কোনওদিন রুমাল, কিংবা মাছের থলে। সেটা আবার খুঁজে দেখতে তাকে বাজারে ফিরতে হয়।
বিধুকে দেখেই অহীনবাবু হাঁক দেন, বলি ও বিধু, বাজারে আবার দেখছি যে! কিছু ফেলে গেছ নাকি? আচ্ছা তুমি সবসময়ে এত কী ভাব বলো তো!
বিধু মাথা চুলকে বলেন, ভাবছি দুনিয়াটার হচ্ছেটা কী।
কেন দুনিয়াটার কী এমন হচ্ছে। এই তো আজও পূর্বদিকে সূর্য উঠেছে। মাছের দাম বেড়েছে। শীতকালে শীত বেড়েছে।
বিধুবাবু তবু মুখটা গোমড়া করে বলেন, তবু দুনিয়াটার একটা কিছু হচ্ছে।
অহীনবাবুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তা হবে।
গল্পগুজব করতে-করতে অহীনবাবু আর বিধুবাবু যখন ফেরেন তখন প্রায়ই রসো পাগলা। এসে অহীনবাবুর পথ আটকায়, এই যে বাবু, কিছু ভিক্ষে দিবেন?
রসো পাগলাকে দেখলে অহীনবাবু ভারী বিব্রত বোধ করতে থাকেন। বলেন, আঃ, যাও যাও, অন্যদিকে দ্যাখো।
রসো ছাড়ে না। পিছু–পিছু আসতে থাকে আর খিকখিক করে হাসে আর বলে, জীবনে একটা দিন দিয়ে দেখুন, মনটা কেমন ফুরফুরে লাগবে, গান গাইতে ইচ্ছে করবে, গিন্নিমা মুখ করবেন না।
আঃ যাও না হে, বলছি তো নেই।
রসো বিড় বিড় করতে থাকে, না দিলে আজ আপনার ডাল সেদ্ধ হবে না, মাছে নুন বেশি পড়ে যাবে, গলায় কাঁটা ফুটবে…
গোটা লামডিঙে রসো পাগলাই একমাত্র লোক যে চাঁদ দেখলেও খুশি হয়, অমাবস্যাঁতেও আনন্দে গান গেয়ে ঘুরে বেড়ায়। সে রোদেও খুশি বৃষ্টিতেও তার আহ্লাদ। শীত, গ্রীষ্ম সব। ঋতুতেই তার মন নাচে। সর্বদাই রসো খুশি বটে, কিন্তু খিদে পেলে ভারী রেগে যায়।
রসোর খিদে পায় সকালেই। ঘুম থেকে উঠেই সে যে-কোনও বাড়ির সামনের রাস্তায় পায়খানা করে সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে তর্জন গর্জন করতে থাকে, সব তো বেরিয়ে গেল, এখন ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে না? নিজেরা তো দিব্যি সাঁটছ, রসোর কথা একটু ভাবতে হবে না?
লোকে রসোর নোংরামি দেখে চটে যায় বটে, কিন্তু তাদের অভ্যাসও হয়ে গেছে। খেতে দিলে অবশ্য রসো নিজেই নোংরাটা সাফ করে দেয়।
দুপুরে রসো খায় জৈনদের লঙ্গরখানায়। রাতে এঁটো–কাঁটা জুটে যায়। খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে রসো ভারী আনন্দে আছে। রাত্রিবেলা সে গিয়ে নয়নসাধুর আখড়ায় পড়ে থাকে। আর ভূতেরা নাকি তার গা–হাত-পা টিপে দেয়।
