দেখ দ্বিজপদ, পুতুলকেও তো তুই বলে-কয়েই এনেছিলি। তাতে কাজ হয়েছিল? কী হাঙ্গামাটাই বাধাল, বল!
তা বাবু, কিছু মনে যদি না করেন, পুতুল থাকলেও আপনার ওই সরস্বতীর সঙ্গে মাখামাখি করাটা ঠিক হয়নি।
যোগেন ফুঁসে উঠে বলে, কেন, ঠিক হয়নি কেন? সরস্বতীর সঙ্গে কী আর কার সঙ্গে মাখামাখি করলুম তাতে ওর কী? ও কি আমার মাগ নাকি? পয়সার সঙ্গে সম্পর্ক, ব্যস পয়সাতেই সম্পর্ক শেষ।
আচ্ছা সেসব কথা একটু আবডালে বলবেন। এ একেবারে আনকোরা, কাঁচা মেয়ে। ভয় খেয়ে যাবে।
যোগেন নরম হল। আসলে মেয়েটিকে তার বেশ ভালোই লাগছে। বাইশ-তেইশ বছরের বেশি বয়স নয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আছে। উলোঝুলো নোংরা ভিখিরির চেহারা নয়।
তা ওহে মেয়ে, সব বুঝলে তো! কথা না কও, একটু ঘাড়খানা নাড়তেও তো পারো।
মেয়েটা ঘাড় নাড়ল না, কথাও কইল না।
মুশকিলে ফেললে দেখছি। অমন কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু কি বুঝবার জো আছে? বলি কালা নও তো!
দ্বিজপদ বলে, না কালা নয়। ওই যে বললুম, একটু লাজুক আছে। মনটাও ভালো নেই, এই প্রথম বাড়ির বাইরে আসা।
একটা শ্বাস ফেলে যোগেন বলে, সঙ্গে জিনিসপত্র কিছু আছে? শাড়ি সায়াটায়া?
দ্বিজপদ শশব্যস্তে বলে, না না, ওসব থাকবে কোত্থেকে? যা পরনে দেখছেন তাই সম্বল।
যোগেন একটু হাসল, ওহে দ্বিজপদ, এতবড়ো কারবারটা যে চালাই তাতে একটু বুদ্ধির দরকার হয়। এর আগে তুই আরও দুজন এনেছিলি, তাদেরও ওই পরনেরটুকু ছাড়া আর কিছু ছিল না। ওসব কি আর আমি বুঝি না? শুরুতেই আদায় উসুল করতে লেগে পড়া।
কী যে বলেন বাবু।
ঠিকই বলি। ওহে মেয়ে, যাও, ওই পিছনদিকে গুদোম-ঘরের লাগোয়া ডানহাতি একখানা ঘর পাবে। সেখানে গিয়ে বোসো।
মেয়েটি ভারি সংকোচের সঙ্গে পায়ে পায়ে চলে গেল।
যোগেন মুখ তুলে বলে, বন্দোবস্ত কীরকম?
আজ্ঞে ওই যা দেন, তাই দেবেন আর কী! মাসে হাজার টাকা, আর খাওয়া-পরা। বাড়তি শুধু দশটি হাজার টাকা।
আঁতকে উঠে যোগেন বলে, তার মানে?
দ্বিজপদ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, বললুম না, ওরা বড়ো বিপাকে পড়েছে! কিছু জমি বাঁধা পড়ে আছে। ছাড়াতে হলে দশ হাজার টাকা না-হলেই নয়। ওর মা চেয়েছে।
বলি, টাকা কি গাছে ফলে রে দ্বিজপদ?
বাবু, মেয়েমানুষের রেট কি এক জায়গায় বসে আছে? তা ছাড়া দেখছেন তো জিনিসটি একেবারে হরিপদ। তা হরিপদ জিনিসের জন্য দরটাও তো হরিপদই হবে, নাকি?
পাগল হলি নাকি? দশ হাজার টাকা মুখের কথায় ফেলে দেব, আমি সেই বান্দা নই।
তা হলে হল না বাবু। ওর মা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মেয়েকে এসব নোংরামির মধ্যে নামানোর তার মোটে ইচ্ছে নেই। পেটের দায়ে রাজি হয়েছে। ওই দশটি হাজার টাকা পুরোপুরি চাই। নইলে মেয়ে ফেরত নিয়ে যেতে বলে দিয়েছে।
যোগেন কেমন যেন কাহিল হয়ে পড়ল। মিনমিন করে বলল, না, এটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
আজ্ঞে সে আপনি যা মনে করেন। বাড়াবাড়ি মনে করলে ও মেয়ের দায় আপনাকে ঘাড়ে নিতে হবে না। মেলা লোক গেঁজে হাতে করে বসে আছে।
ওঃ, খুব যে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা হচ্ছে! বলি এ-তল্লাটে খপাৎ করে দশ হাজার টাকা ফেলার লোক পাবি তুই?
হাসালেন বাবু। আপনি তো মান্ধাতার আমলে পড়ে আছেন দেখছি।
তার মানে?
সাহাগঞ্জ কি আর আগের মতো আছে? দু-দুটো কোল্ড স্টোরেজ, পাঁচখানা চালকল, তিনটে পাউরুটির কারখানা, সাতটা লেদ মেশিন, সাতটা পোলট্রি, হাইওয়েতে পুব-পশ্চিমে দু-দুটো পেট্রোল পাম্প, পয়সাওয়ালা লোকের অভাব বলে আপনার মনে হয়?
যোগেন বৃথা একটু তড়পাল, ওরে চিনি তোর পয়সাওয়ালাদের। ওই তো মদন গুছাইত, হরেন মন্ডল, চিনি ঘোষ আর সুধীর পুততুন্ড। এই তো! দশ হাজার টাকা ফেলতে কাত হয়ে যাবে তারা।
কিন্তু অধরার মা যেন একটি আধলাও কম নেবে না বাবু। তা হলে মেয়েটাকে ডাকুন, বেলাবেলি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাই।
যোগেন একটু বিপাকে পড়ল। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতটা সে একটু ভোগসুখে কাটাতে চায়, বহুঁকালের অভ্যেস। বরাবর তার রাখা মেয়েমানুষ ছিল। এমন কিছু লুকোনো-চুরোনো ব্যাপার নয়। পুতুল বেশ মেয়ে ছিল। সে বিদেয় হওয়ার পর হাড়হাভাতে জুটল একটা তার নাম লক্ষ্মী। সেটা চুরি করত খুব। তাকে তাড়ানোর পর এখন বড্ড ফাঁকা যাচ্ছে।
দেখ দ্বিজপদ, পরে যদি টের পাই যে, লাইনের মেয়ে গছিয়ে গেছিস তাহলে কিন্তু ভালো হবে না।
ওই যে বললুম বাবু, দ্বিজপদ আর যা-ই হোক নেমকহারাম নয়। চাই তো ওর গাঁয়ে গিয়ে তল্লাশ নিয়ে আসতে পারেন। বেশি দূরেও নয়, রেলরাস্তা পার হয়ে মেটে পথ ধরলে দু-ক্রোশ দূরে বিষ্ণুপুর। খেতের ওপর দিয়ে রাস্তা, সাইকেল, ভ্যান, অ্যাম্বাসাডার সব যেতে পারে।
দশ হাজার টাকা না হয় দিলুম, তারপর যদি মেয়েটা বিগড়োয় বা পালায়? ভালো করে তো বুঝেই উঠতে পারলুম না এখনও।
বিগড়োবার মেয়ে নয়। স্বভাব ভারি ভালো। পালানোর কথাও ওঠে না। আর পালালে তো আমি আছি।
সবদিক বিবেচনা না করে কাজ আমি করি না, তুই তো জানিস।
তা আর বলতে! তবে টাকাটা আজ-ই গিয়ে হাসিমাসির হাতে দিতে হবে। তার বড়ো ঠেকা।
কাল আসিস।
না বাবু, আজই। আপনার কারবার নগদে চলে, আমি জানি। টাকাটা ফেলুন, চলে যাই। বিষ্ণুপুর ঘুরে ফিরতে রাত হয়ে যাবে আমার।
