সংক্রান্তির দিন সকালে রাজা স্নান করলেন। পুরোহিতকে বললেন–কেউ যখন রাজা হয় তখন তার অভিষেকের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু রাজা যদি যে কেউ একজন হতে চায় তখন কি তার কোনও অভিষেক আছে?
পুরোহিত মাথা নাড়লেন–না, মহারাজ।
প্রাকারের পাশে সুসজ্জিত বেদিতে সাজানো সিংহাসন। রাজা সেখানে এসে বসলেন। হাতে তুলে নিলেন রাজদণ্ড, মাথায় পরলেন মুকুট। শেষবারের মতো। সামনের আম্রকাননে হাজার হাজার কৌতূহলী প্রজা সমবেত। এক পাশে শূন্য একটু জমিতে চাষার পোশাক এবং বলদযুক্ত একখানা হাল রয়েছে। রাজা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসন, মুকুট ও দণ্ড ত্যাগ করে হলকর্ষণ করবেন। রাজাকে আজ বেশ আনন্দিত ও তৃপ্ত দেখাচ্ছিল।
রাজা আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর গলায় গতকাল রাত্রে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাদের সাক্ষ্যপ্রমাণ উল্লেখ করে বললেন যে, তাঁর শাসনের প্রয়োজন সত্যিই ফুরিয়েছে। এবার সমাজ হবে রাষ্ট্রহীন। মনুষ্যত্বই হবে প্রকৃত শাসক।
রাজা মুকুট খুললেন, রাজপোশাক উন্মোচন করলেন, সিংহাসন ত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ধীর পদক্ষেপে নামতে লাগলেন।
নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ কে যেন চেঁচিয়ে বলে উঠল–মহারাজ, কাল রাত্রিতে আমার ঘরে চোর ঢুকেছিল…
সবাই চকিত হয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। সেনাপতি কোমরবন্ধ তলোয়ারসুষ্ঠু খুলে রাখতে যাচ্ছিলেন। এই কথা শুনে কোমরবন্ধ আবার আঁটলেন। কারাধ্যক্ষ চকিত হয়ে হাতে ধরা ইস্তফাপত্রটি লুকিয়ে ফেললেন।
আর একটি কণ্ঠ চেঁচিয়ে বলল –মহারাজ, আজকের অনুষ্ঠানে সমুখবর্তী এই আসনটি পাওয়ার জন্য আমাকে বিশ মুদ্রা উৎকোচ দিতে হয়েছে…
আর একটি কণ্ঠও আর্তনাদ করল–মহারাজ, কিন্তু তার অভিযোগ গোলমালে, পালটা চিৎকারে শোনা গেল না। বহু কণ্ঠের আর্তনাদ উঠতে লাগল মহারাজ, মহারাজ, মহারাজ…
মাঝর্সিড়িতে থেমে দাঁড়ালেন রাজা। বিস্মিত, ব্যথিত। কুটি করলেন। তারপর হতাশ ক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সামনের উদ্বেলিত জনসাধারণের দিকে।
তারপর ধীর ক্লান্ত পায়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে লাগলেন পরিত্যক্ত সিংহাসনের দিকে।
লক্ষ্মীপ্যাঁচা
ওঃ, এ যে, একেবারে হরিপদ জিনিস রে!
আজ্ঞে, ভালো জিনিস বলেই তো আপনার কাছে আসা। এসব জিনিসের কদর ক-জন করতে পারে বলুন? আর দামই বা দিতে পারে ক-জন?
তা আনলি কোথা থেকে? বাজারি জিনিস নয় তো! তোকে বাপু বিশ্বাস নেই।
কী যে, বলেন। কবে নেমকহারামি করেছি বলতে পারেন? দ্বিজপদ আর যাই হোক বিশ্বাসঘাতক নয়। সত্যি কথাই বলছি, গেরস্ত ঘরেরই মেয়ে। আতান্তরে পড়েছে। এঁটোকাঁটা হয়নি এখনও।
গেরস্তঘরের মেয়ে বলছিস? পরে আবার পুলিশের ঝামেলা হবে না তো! দেখিস বাপু। আমার একটু চরিত্রের দোষ আছে বটে, তা বলে আমি মেয়েছেলে দেখলেই কান্ডজ্ঞান হারিয়ে বসি না।
সে আর বলতে। আপনার সঙ্গে তা ধরুন তিন বছরের কাজ-কারবার আমার। আপনাকে চিনতে কি আর বাকি আছে? এ ভালো মেয়ে বাবু, সরল-সোজা, গরিব ঘরের মেয়ে। নিজের ইচ্ছেতেই এসেছে। ও নিয়ে। ভাববেন না।
ওরে তাই কখনো হয়! আমার একটা নিয়ম আছে তো! ঘরে ওর কে কে আছে সব খতেন দে। বাপ কী করে?
নেই।
মরেছে?
কবে।
আর কে আছে?
মা আছে, দুটো ছোটো ছোটো ভাইবোন আছে।
চলে কী করে?
গতর খাটিয়ে ওর মা খেতের কাজটাজ করে, মুড়িটুড়ি ভাজে। চলে না। বড্ড অসুবিধের মধ্যে আছে।
মেয়েটাকে কাছে ডাক, একটু কথা কয়ে দেখি।
মেয়েটা একটু দূরে মালঘরের দরজার কাছে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটথাগুলো শুনতে পেয়েছে কি না বোঝা গেল না। কোনো ভাবান্তর নেই। তবে দেখতে বেশ। ছোটোখাটো চেহারা, তেমন কালো নয়, মুখের ডৌলটুকু ভারি মিঠে। যোগেনের চোখে লেগে গেছে।
মেয়েটা কাছাকাছি এসে হেঁটমুন্ডু হয়ে দাঁড়াতেই যোগেন জিজ্ঞেস করে, বলি নিজের ইচ্ছেয় এসেছ, নাকি এ হতভাগা ধরেবেঁধে এনেছে? দ্যাখো বাপু, আমি ঝুট-ঝামেলা পছন্দ করি না। বুঝেসুঝে এসে থাকলে ভালো, নইলে বাপু আমার পোষাবে না।
মেয়েটা কথা কইল না। যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রইল।
ও দ্বিজু, কথা কয় না কেন রে? বোবা নাকি?
না না, বোবাকালা, হাবাগোবা ওসব কিছু নয়। তবে মুখরা নয় আর কী।
মুখরা নয় সে না হয় হল, তা বলে বোবা হলে চলে কী করে? তোমার নাম কী গো মেয়ে?
বোবা যে নয় তা বোঝা গেল। ক্ষীণকণ্ঠে জবাব এল, অধরা।
অধরা! বাঃ বেশ নাম। তা দ্বিজপদর কাছে সব ভালো করে শুনে বুঝেসুঝে নিয়েছ তো!
মেয়েটা আবার চুপ।
দ্যাখো বাপু, আমার লুকোছাপা কিছু নেই। সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। দেশের বাড়িতে আমার বিয়ে-করা বউ আছে, ছেলেপুলে আছে। আমার বয়সও ধরো এই উনপঞ্চাশ চলছে। বাড়ি ছেড়ে কারবার আঁকড়ে পড়ে থাকি। রসকষহীন জীবন, বুঝলে? তাই মেয়েমানুষের দরকার হয়ে পড়ে। পয়সা ন্যায্যই পাবে, কিন্তু পরে আবার ঝামেলা পাকিয়ে তুলো না। আগেরজন তো গয়নাগাটি, সম্পত্তির ভাগ চেয়েও ক্ষান্ত হল না। পরে বিয়ে করার জন্য চাপাচাপি শুরু করে দিল। ওসব মতলব থাকলে আগে থেকেই খোলসা হও।
মেয়েটা চুপ।
দ্বিজপদ কাঁচুমাচু মুখে বলে, আহা, আনকোরা মেয়েটাকে এমন পষ্টাপষ্টি বলতে আছে! ঘাবড়ে যাবে যে বাবু। ওসব যা বলা-কওয়ার তা বলে-কয়েই এনেছি। আপনাকে ভাবতে হবে না।
