সত্যরাম বলছিল কাঠা নাকি দশ হাজার।
আর ছ-মাস পরে তাই হবে। যদি ততদিন ধরে রাখা যায়।
পানু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল।
বাঁশবনের ভিতরে কুয়াশা আর অন্ধকারে একটু শব্দ উঠল। কে যেন সাবধানি পায়ে আসছে বা যাচ্ছে। বাঁশপাতায় খড়মড় শব্দ উঠছে।
কানু সপাৎ করে উঠে দাঁড়াল।
পানু বলল, কে?
কে যেন দৌড়ে পালাচ্ছে ওধারে।
কানু সভয়ে বলল, কে গো দাদা?
পানু মাথা নেড়ে বলল, বুঝতে পারছি না। আবছা মনে হল একটা মেয়েছেলে। দাঁড়া দেখছি।
আমি আর দাঁড়াব না। ফিরতে দেরি হয়ে যাবে তার ওপর দীনু শালা দেখতে পেলে বিপদ ঘটাবে। কাল পরশু একবার আসবখন।
কানু চলে গেল।
পানু বাঁশবনের ভিতরে একটু চেয়ে রইল। মরা আলোর ঝুঝকো মায়ার ভিতর সে একটা খয়েরি ডুরে শাড়ির আভাস দেখেছে। মেয়েছেলেটা দৌড়ে বেশি দূর যায়নি। কথা শুনছিল আড়ি পেতে। কথা যে শেষ হয়েছে তা জানে না। ফের আসবে।
পানু সন্তর্পণে এগোল। মস্ত একটা শিমুলগাছ আছে ভিতরবাগে। আর যতদূর ধারণা, ওখানে গা-ঢাকা দিয়েছে।
পানু তাড়াহুড়ো করল না। বরং বেশ গুনগুন করে রামপ্রসাদি ভাঁজতে ভাঁজতে শুড়িপথ ধরে দুলকি চালে এগোল। শিমুলগাছটার ডানধার বরাবর হয়ে আচমকা গোঁত্তা মেরে ঢুকে গেল বাঁশবনে। তারপর একদম মুখোমুখি।
মেয়েটা নড়ারও সময় পেলে না। একটু হাঁফাচ্ছিল।
তুমি! অ্যাঁ! তুমি তো দাক্ষী!
বছর সতেরো-আঠেরোর মেয়েটা সভয়ে চেয়ে রইল পানুর দিকে।
এখানে কী করছিলে শুনি?
দাক্ষী হাঁফসাননা গলায় বলে, কী করব? নিজের ইচ্ছেয় এসেছি নাকি?
তবে?
তোমরা সবাই যাকে ভয় পাও সেই দুনুই তো ধরে এনেছে আমাকে।
ধরে এনেছে মানে?
মানে চুলের মুঠি ধরেই একরকম টেনে বার করে এনেছে। আমার বাবার পেটে লাথি মেরেছিল। কী জানি কেমন আছে বাপটা। ভাইয়ের টিবি বলে বাবা টাকা নিয়েছিল। ধার। শোধ হয়নি।
বটে। তা এখানে কী করছিলে?
রাক্ষসটা যে আমাকে এবাড়িতে রেখেছে চারদিকে নজর রাখবার জন্য। কোথায় টাকাপয়সা গয়নাগাটি, কে কেমন, এসব খবর নিতে। আজ সকালে ডেকে পাঠিয়ে তোমার ওপর নজর রাখতে বলল।
ক্কেন ক্কেন?
তোমার কাছে কেউ আসে কিনা, কী কথা হয় সব খবর দিতে বলেছে। নইলে তো বুঝতেই পারছ।
পানু ভয়ে এবং শীতে কাঁপছিল। রীতিমতো হি-হি কাঁপুনি। কাঁপা গলাতেই বলল, বড্ড শীত করছে।
আমারও।
তা তোমাকে ধরে এনে ও কী করতে চায়?
মেয়েটা করুণ গলায় বলল, এখনও খারাপ কিছু করেনি। তবে কপালে যা আছে হবে। খারাপই হবে। হয়তো নিজে কিছুদিন কাছে রাখবে, তারপর গোহাটার গোরুর মতো বেচে দেবে। বাজারের মেয়ে হওয়া ছাড়া ভগবান আর আমার কপালে কী লিখেছেন?
ও বাবা!
শোনো। সাঁপুই গাঁ চেনো?
চিনি। কাছেই।
সেখানে গোপাল দাসের বাড়ি। আমার বাবা। কেমন আছে আমার বাপটা একটু খবর এনে দেবে? পেটে লাথিটা লেগে বড়ো কাতরাচ্ছিল।
তা দেখবখন চেষ্টা করে।
যদি এনে দাও খবরটা তাহলে আজকের কথা আমি গুণ্ডাটাকে বলব না বুঝলে?
বুঝেছি।
কানুর মতো এ মেয়েটাও কাঁদল। বড়ো বড়ো চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছিল। কাঁদতে কাঁদতে ধরাগলায় বলল, আমি তো গেছিই, নিজের জন্য আর ভাবছি না। বাপটা ভাইটার কী যে হবে।
পানু মৃদু স্বরে বলল, হিম পড়ছে। ঘরে যাও। বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে লোকে নানারকম সন্দেহ করতে পারে। যাও।
যাচ্ছি।
মেয়েটা চলে গেলে বাঁশবনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পানু। হাত-পায়ের কাঁপুনি কমেছে, কিন্তু ভয়টা তার শরীরকে একেবারে কাঠ করে রেখেছে। কিছুক্ষণ পানু নড়তে পারল না। বাঁশবনের ভিতর দিয়ে কারা আসছে। টর্চ জ্বলছে মাঝে মাঝে। কথা কইছে। যতীনবাবু হবে না। যতীনবাবু তো গেছেন হাওয়াগাড়ি চেপে। তাইতেই ফিরবেন।
পানু কয়েক পা এগোল। তারপর দাঁড়িয়ে গেল। যতীনবাবুই। সঙ্গে বিভীষণ দীনু পাইক এবং আরও ক-জন। জমিজমা বিষয়-আশয়ের কথাই হচ্ছে।
পানু আর এগোল না। দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিরে এল ঘরে।
ঘটনাটা ঘটল একটু বেশি রাতে। খেতে যাবে বলে ছয় চাকর তৈরি হচ্ছে। পাঁচু গাড় নিয়ে মাঠে গেছে। শ্রীপতি রান্নাঘর সেরে এসে হাত-মুখ ধুচ্ছে। কেষ্ট টেমির আলোয় গোপালভাঁড় পড়ে শোনাচ্ছে সবাইকে! বেশ একটা ফুর্তির ভাব।
হঠাৎ দীনু এসে ঘরে ঢুকল। বিশাল চেহারাখানা যেন ঘর ভরে দাঁড়াল।
পানুর দিকে রক্তজল করা চোখে একটুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, কে এসেছিল তোর কাছে?
পানু থতমত খেয়ে বলল, কই!
জিব টেনে বের করে দেব। কে এসেছিল?
পানুর মাথাটা টাল খেল। দাক্ষীই কি বলে দিল শেষে? কথা দিয়েছিল বলব না।
পানু মাটির দিকে চেয়ে বলল, কানু।
বটে! পরামর্শ হল ভাইয়ের সঙ্গে?
হঠাৎ পানু একটু হাসল, বলল, দু-ভাইয়ে ঠিক করলুম জমিটা আমরা হাতছাড়া করছি না।
বটে! বলে একটা বাঘা গর্জন ছাড়ল দীনু।
পানু চমকাল না। উঠে দাঁড়াল। দাক্ষী কথা রাখেনি। সেইটে তার মনে বড়ো বাজছে। খিদেটা পেট থেকে খাঁ খাঁ করে উঠে আসছে বুকে। মনে পড়ছে, পারুল তাকে বিয়ে করবে না বলে সটকে পড়েছিল কার সঙ্গে। সব মিলেমিশে আজ পানুর মাথাটা বড়ো গোলমাল।
.
সে একেবারে সমানে সমানে দীনুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, তুমি বড়ো বেচাল লোক হে। বড়ো পাপী। খুন করো, মেয়েমানুষকে ধরে আনো, লোকের জমিজমা কেড়ে নাও…
