কী আর বলব। রাজি হতে হল।
সত্যরাম কথাটা বোধহয় মনে মনে ওজন করে দেখল। তারপর বলল, তোর বাড়ি তো গোবরায়।
আজ্ঞে মাইল তিনেক হবে উত্তরদিকে।
চিনি। আজ্ঞে সবাই চেনে। গোবরার বেগুন খুব নামকরা।
সত্যরাম খিঁচিয়ে উঠে বলল, বেগুনটাই চিনলে। আর কিছু দেখলে না।
কী দেখব আজ্ঞে।
দেখোনি খেতখামারের ওপর দিয়ে আমিনবাবুরা শেকল টেনে মাপজোক করছে?
তা দেখেছি বটে।
আহাম্মক কোথাকার। ওখানে বিরাট কারখানা হবে। জমির দাম হু হু করে বাড়ছে। চাষের জমি সব গাপ করে বড়ো বড়ো বাড়ি হবে।
পানুর গালে হাত, আজ্ঞে তা তো জানতুম না। কানু বলেওনি।
দেড় বিঘেতে কত কাঠা হয় জানিস?
তা জানি।
এক-এক কাঠার দাম যদি ঠেলে দশ হাজারে ওঠে তবে কানুর ট্যাঁকে কত আসবে তার আন্দাজ আছে?
পানুর চোখ কপালে, উরে বাবা!
সাধে কি আর দেড় বিঘের জন্য দীনু পাইক তোকে শাসায়?
গুহ্য কথা আছে না! যতীনবাবু থলিভর্তি টাকা নিয়ে রোজ গোবরায় আনাগোনা করছেন। আজও গেলেন। একটু আগে। গোবরার জমি এখন সোনা।
পানুর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। কথা সরছিল না মুখে।
সত্যরাম করুণার স্বরে বলল, যা, কাজ করগে যা। ভেবেচিন্তে একটা কিছু মাথায় এলে বলবখন তোকে।
দীনু পাইক যে মোটে সাতদিন সময় দিয়েছে। কাগজপত্র সব তৈরি। গিয়ে টিপছাপটা দিলেই হয়।
সত্যরাম উদার গলায় বলল, জাতসাপে ধরলে তো আর বাঁচন নেই রে। টিপছাপ দিতে হলে দিবি। তবে একেবারে ফাঁকিতে পড়তে যাবি কেন? দু-চার হাজার চেয়ে বসবি।
যদি মারে?
মরবি তো বটেই। তোর আবার ওয়ারিশও নেই যে তুই মরলে কেউ দাবিদার দাঁড়াবে। নাঃ, তোর কপালটাই খারাপ দেখছি।
পানু উঠল। সত্যরামের মুখ-চোখে দুশ্চিন্তার ছাপটা তার ভালো লাগছে না।
সত্যরাম যেমনই হোক, পানুর মতো লোকের পুঁটিমাছের পরান তো ওরই হাতের তেলোয় দাপাচ্ছে। মারলে ওই মারবে, রাখলে ওই রাখবে। কিন্তু ওরও যদি বাঁচন-মরণের সমস্যা দেখা দেয় তো ঘোর বিপদের কথা।
পানু পুকুরপাড়ে গিয়ে আজ খুব গতর নেড়ে কাপড় কাচল। কাজে মন থাকলে, শরীর ব্যস্ত থাকলে দুশ্চিন্তা একটু কম হয়।
বিকেলের দিকটায় সত্যরামের একটু ছুটি হয়। ঘণ্টাটাক একটু নিজের মনে থাকতে পারে সাঁঝবেলাটায়। সত্যরাম এ সময়ে সিদ্ধি খায় আর শাকরেদদের নিয়ে ঘরে বসে কূটকচালি করে।
পানু চাদরটা জড়িয়ে বাঁশবন পার হয়ে কালীবাড়ির দিকে যাচ্ছিল। আরতিটা দেখে আসবে। আর ওই সঙ্গে মায়ের কাছে একটু মানসিকও করে আসবে। সাতে নেই পাঁচ নেই মা, তবে কেন আজ আমার এমন বিপদ।
আনমনা ছিল, তাই লোকটাকে দেখতে পায়নি পানু।
দাদা!
পানুর পিলে কেঁপে গেল। দু-বার আঁ আঁ করল মুখ দিয়ে। পথ আটকে কানু দাঁড়িয়ে।
দাদা, ভয় পেলে নাকি? আরে আমি কানু।
পানুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। বলল কী? কী? কী চাস তুই?
তোমার সঙ্গে কথা আছে। আড়ালে চলো।
পানু মাথা নেড়ে বলল, ও বাবা, আড়ালে আমি যাচ্ছি না।
কানু অবাক হয়ে বলল, অত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?
পানু দু-পা পিছিয়ে বলল, আমি চললুম। যা বলার চিঠি লিখে জানাস।
কানু বেকুবের মতো দাদার দিকে চেয়ে বলল, কী হয়েছে তোমার বলো তো! আমি যে ভীষণ বিপদে পড়ে তোমার কাছে এলুম।
কী বিপদ?
দীনু গুণ্ডা যে আমাকে ভিটেছাড়া করতে চাইছে।
অ্যাঁ। তা সে তোর পেয়ারের লোক, তা–
কী যে বলো দাদা, তার ঠিক নেই। কে, কার পেয়ারের লোক? গোবরায় বলে কী সব কলকারখানা হবে টবে, সেই শুনে সবাই জমির দাম চড়িয়ে বসে আছে। সেই কবে জুয়া খেলতে গিয়ে পঞ্চাশটা টাকা ধার নিয়েছিলুম সেই সুবাদে দীনু শালা গিয়ে নানারকম গাইতে লাগল। তোমার মনিবেরও সাট আছে এর মধ্যে।
দীনু কী বলছে?
বলছে, হাজারটা টাকা নগদ দিচ্ছি ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যা। নইলে ঘরে আগুন দিয়ে বেগুনপোড়াকরে ছাড়ব। সব তোমাকে বলা যায় না, শালা দীনু আমার কিছু গুপ্ত কথাও জানে। আমার বড়ো খারাপ সময় পড়েছে।
পানু আতঙ্কিত হয়ে বলল, তা আমার কাছে কেন? আমি কী করব?
বলছিলুম কী এ সময়টায় তুমি যদি তোমার ভাগেরটা না ছাড়ো তাহলে দীনু শালা মুশকিলে পড়বে!
ও বাবা, সাতদিন সময় দিয়েছে। তার মধ্যে লেখাপড়া না করে দিলে ঘাড় নামিয়ে দেবে।
বলো কী, তোমাকেও ধরেছিল এর মধ্যে? তুমি যে আমার দাদা তাতো তার জানার কথা নয়।
পানু বলল, জেনেছে। তা ছাড়া আমাকে তো বলল, আমি গিয়ে নাকি তোকে ভাগের জন্য ভয় দেখিয়েছি।
কানু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। বলল, সব্বনাশ। আমার ভরসা তো ছিলে তুমি। এখন তুমিও যদি লিখে দাও তাহলে তো দীনু শালা আমার ঘাড় ধরে আদায় করে নেবে। তোমার কথা গেয়ে একটু ভজঘট পাকানোর তালে ছিলুম যে।
পানু একটু ভাবল। তারপর হালছাড়া গলায় বলল, তা আর কী করা যাবে! প্রাণটা তো আগে! শুনেছি গুণ্ডোটা মেলা খুনখারাবি করেছে।
তা করেছে।
ওরকম লোকের সঙ্গে কি লাগা ভালো?
কানু একথাটার জবাব দিল না। উবু হয়ে বসে চাদরের খুঁটে চোখ মুছল। বেশ কাহিল দেখাচ্ছিল তাকে। গরগরানিটাও আর নেই। দায় পড়লে মানুষের স্বভাব ভালো হয়ে পড়ে। কানুকেও কেমন যেন ভালোমানুষের মতো দেখাচ্ছে। কেঁদেকেটে চোখ লাল করে ফেলল কানু। তারপর মুখ তুলে ধরা গলায় বলল, মায়ের দিব্যি কেটে বলছি দাদা, যদি দীনু গুণ্ডাকে ঠেকাতে পারো তবে জমি বেচে যা পাব অর্ধেক তোমার। এখনই সাত হাজার করে কাঠার দর উঠছে। আমাদের জমির পাশ দিয়ে রাস্তা হচ্ছে বলে দর আরও বেশি।
