কথাটা শেষ হল না। দীনু একখানা থাপ্পড় তুলল। একেবারে আকাশসমান উঁচু।
পানু যতীনবাবুর বাড়ির বড়ো বড়ো মশারি আর কাপড় কাঁচে, খড় কুচোয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলপাড়ের শ্যাওলা তোলে, জন্মের শোধ ভাতের পাহাড় সাঁদ করায় ভিতরে। তার হাত-পা পাকিয়ে দড়ির মতো হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু ভারি পোক্ত শরীর। শীতে গ্রীষ্মে রোদে জলে একেবারে সই। কোদাল কুড়লে তার চমৎকার হাত। মাঝারি মাপের পাটের দড়ি কতবার দায়ের অভাবে টেনে ছিঁড়েছে।
দীনুর চড়টা নামবার আগেই থাবড়াটা পানু কষাল।
সে এমন থাবড়া যা আর কহতব্য নয়।
দীনু পাইক চড়টা নিরীহভাবে নামিয়ে নিজের গালে হাত বোলাতে লাগল অবাক হয়ে। মুখে কথা নেই, এত অবাক।
পানু সামনে দাঁড়িয়েই রইল। বলল, আমরা বাবুর পেয়ারের চাকর নই, বুঝলে? খেটে খাই। আমাদের প্রাণের ভয় থাকলে চলে না।
দীনু দাঁতে দাঁত ঘষটাল। তারপর পটাং করে গায়ের গরম চাদরখানা খুলে ফেলে দিয়ে দুটো মুগুরের মতো হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল পানুকে।
তারপর কী থেকে যে কী হল তা পানু বলতে পারবে না। কিন্তু লড়াটা বেশিক্ষণ চলেনি। একসময়ে সে দেখল, দেখে খুবই অবাক হল যে, সে অর্থাৎ পানু, দীনু পাইককে উপুড় করে ফেলে তার চুলের ঝুঁটি ধরে মাথাটা চৌকাঠে ঠুকছে আর বলছে, মর, মর, মরে যা।
শ্রীপতি পাঁচুরা এসে না ছাড়ালে দীনুকে মরতেই হত।
তবে মরার চেয়ে খুব কম হল না। দীনুকে গো-গাড়িতে তিন মাইল দূরের হাসপাতালে পাঠাতে হল রাত্রেই।
চাকরি যাবে। জেলও খাটতে হবে। সবই জানে পানু। ঘরে বসে সে বুটের শব্দের জন্য অপেক্ষা করছিল।
তার চারদিকে পাঁচজন বাইরের চাকর। মুখ গম্ভীর, কথা নেই।
ঠিক এই সময়ে সত্যরামকে সঙ্গে নিয়ে যতীনবাবু ঘরে এসে ঢুকলেন।
তটস্থ হয়ে সকলে উঠে দাঁড়াল।
যতীনবাবুর মুখখানা গম্ভীর। সকলের দিকে একে একে চেয়ে দেখে সত্যরামকে জিজ্ঞেস করলেন, এদের মধ্যে কোনজন?
আজ্ঞে এই যে। বলে সত্যরাম তাড়াতাড়ি পানুকে দেখিয়ে দিল।
যতীনবাবু কাশ্মীরি শালের ভিতর থেকে তাঁর ডান হাতখানা বের করলেন। ঘরে হ্যারিকেনের আলো, তা সে আলোতেও হিরের আংটি ঝিকিয়ে উঠল। আর কী ফর্সা হাত।
সেই হাতে নিজের থুতনিটা খামোখা একটু চুলকোলেন যতীনবাবু। তারপর বললেন, ও। তারপর চারদিকটায় ঘুম-ঘুম চোখে একটু তাকিয়ে নিয়ে সত্যরামের দিকে চেয়ে বললেন, এ ঘরটায় একটা বিশ্রী গন্ধ, তাই না?
সত্যরাম বিনয়ের গলায় বলল, আজ্ঞে। ছোটোলোকদের ঘর তো—
যতীনবাবু তাঁর হিরের ঝলকানি তুলে এবার গলা চুলকোলেন। তারপর বললেন, আজ বড়ো ঠাণ্ডা, তাই না সত্যরাম?
আজ্ঞে, বেজায়।
যতীনবাবু যেন কথা খুঁজে পাচ্ছেন না এমনভাবে চারদিকে চাইতে লাগলেন। ঘরখানাই যেন দেখছেন। সামনে ছ-জন বশংবদ চাকর বাক্যহারা হয়ে দাঁড়িয়ে।
যতীনবাবু এবার জিজ্ঞেস করলেন, সত্যরাম, ওর নাম কী?
আজ্ঞে পানু। এমনিতে খারাপ নয়। কাজ ভালোই করে। বিশ্বাসী।
কতদিন আমার কাজ করছে?
আজ্ঞে তা বছর পাঁচেক হবে বোধ হয়।
যতীনবাবু একটু কাশলেন। এইসব হীন চাকরদের সঙ্গে তিনি কখনো কথা বলেননি।
কীভাবে বলবেন তা বোধ হয় ভেবে পাচ্ছিলেন না। তাই অসহায়ের মতো সত্যরামের দিকে চেয়ে বললেন, ওর কি আমাকে কিছু বলবার আছে সত্যরাম? ও কথা বলছে না কেন?
সত্যরাম শশব্যস্তে বলল, বলবে আবার কী আজ্ঞে? কথাটথা তো বিশেষ বলতে শেখেনি। ভদ্রলোকদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় খায়। ওরে ও পানু, বাবুকে কিছু বলবি?
পানু মাথা নাড়ল। তার কিছু বলার নেই।
ও কত মাইনে পায় সত্যরাম?
আজ্ঞে, আশি টাকা। এ বাজারে কম নয়। খায়ও মেলা। হরেদরে পাঁচ সাতশোই পড়ে যায় আজ্ঞে।
যতীনবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরের চালের দিকে চেয়ে বললেন, পুলিশ অবশ্য আসবে। ও পুলিশকে কী বলবে সত্যরাম?
সত্যরাম শশব্যস্তে পানুর দিকে চেয়ে বলল, ওরে ও ডাকাত, বাবুর কথাটা কানে গেছে নাকি?
পানু মাথা নাড়ল। গেছে।
একটা কিছু বলবি তো।
পানু মেঝের দিকে চেয়ে রইল। কথা বলল না। যতীনবাবু একটা হাই তোলবার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। বাতাসটা কান দিয়ে বেরিয়ে গেল। তিনি কানের ফুটোয় আঙুল দিয়ে একটু নাড়া দিলেন। তারপর পানুর দিকে চেয়ে বললেন, আমার বড়ো বিপদ হে।
পানুর সঙ্গে মনিবের এই প্রথম চোখাচোখি। পানুর অবশ্য ভয়ডর কেটে গেছে। ভক্তিমান্যর ভাবটাও আর নেই। তবে যতীনবাবুর ভয়টা কীসের তা সে ভালো বুঝতে পারল না।
যতীনবাবু তাঁর নাকের ডগাটা চেপে ধরলেন একটু। তারপর বললেন, পুলিশ অনেক কথা জানতে চাইবে। বাপু। দীনু যে আমার চাকর ছিল সেকথাটা ওদের বলা ঠিক হবে না। ওর নামে হুলিয়া আছে। তা, ইয়ে আমি বলছিলুম কি তোমাকে আমি পাইক করে নিচ্ছি। তিনশো টাকা–কী বলিস রে সত্যরাম, তিনশো কি কম হচ্ছে?
আজ্ঞে না।
আর অন্য সবাইকেও ত্রিশ টাকা করে বাড়িয়ে দিস।
যে আজ্ঞে।
যতীনবাবু পানুর দিকে চেয়ে বললেন, তোমাকে আমি দেখব। তুমিও একটু আমাকে দেখো। পুলিশ জিজ্ঞেস করলে বোলো দীনুকে এ বাড়িতে কখনো দেখেনি। ও ডাকাতি করতে ঢুকেছিল, তুমি রুখেছ। মনে থাকবে কথাটা?
পানু জবাব দিল না। চেয়ে রইল।
যতীনবাবু আঙুলের হিরের ঝলকানি তুলে কপাল থেকে একটা মশা তাড়ালেন। কাহিল গলায় বললেন, বটকেষ্ট বলেছিল, দীনুর হাতে কবচ আছে, যমেও নাকি ওর সঙ্গে এঁটে ওঠে না। তা দেখছি তুমি যমের ওপর দিয়ে যাও। আমিও একটু শক্তপোক্ত লোক খুঁজছি। সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। টাকাপয়সা নিয়ে চলাফেরার বড়ো বিপদ আজকাল।
