দীনু খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, অ্যাই, তুই গোবরার কানু মন্ডলের ভাই না?
পানু ভারি চমকে গেল। সে গোবরা গাঁয়ের কানু মন্ডলের ভাই বটে, কিন্তু সেকথা বেশি লোক জানে না। জানার কথাও নয়। দীনু পাইকের মতো মস্ত লোকের কানে যে কথাটা গেছে এইতেই সে অবাক। পানু ভারি বিগলিত হয়ে বলল, আজ্ঞে।
তোর নাম পানু?
যে আজ্ঞে।
পানু লক্ষ করল, দীনু পাইকের পরনে একটা ফর্সা পায়জামা, গায়ে খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি, তার ওপর জহর কোট। আড়েদিঘে আলিসান লোকটা বোধ হয় খালি হাতে মোষের ঘাড় ভেঙে দিতে পারে। দীনু পাহক তার বাঘা গলায় গড়গড় শব্দ তুলে বলল, সেদিন গোবরায় গিয়ে কানু মন্ডলকে ভয় দেখিয়ে এসেছিস?
পানুর এক গাল মাছি। কানুকে কেন, সে তো মশা-মাছিকেও ভয় দেখানোর এলেম রাখে না। সবেগে মাথা। নেড়ে বলল, আজ্ঞে না। লোকটা কিছুক্ষণ খুনিয়া চোখে তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, কানু মন্ডল আমার ইয়ার। বুঝেছিস কথাটা?
যে আজ্ঞে।
ওর জমিবাড়ির ওপর তোর কোনো হক নেই। আছে?
পানু সভয়ে মাথা নেড়ে বলল, ভাগ তো চাইনি।
আলবত চেয়েছিস।
আজ্ঞে না।
লোকটা আবার কিছুক্ষণ রক্ত-জল-করা চোখে তাকে ঠাণ্ডা করে দিয়ে বলল, তা ভালো কথা। সাতদিনের মধ্যে গোবরায় গিয়ে কাগজে সইসাবুদ টিপছাপ দিয়ে আসবি।
খুব ভয়ে ভয়ে পানু জিজ্ঞেস করল, কীসের কাগজপত্র আজ্ঞে?
তোর অত খতেনে কী দরকার? যা বলছি তাই করবি। বেশি ট্যাঁ-ফোঁ করলে বিপদ আছে।
লম্বা লম্বা পা ফেলে চোখের পলকে দীনু পাইক হাওয়া হয়ে গেল।
পানু তার ভেজা হাতে কপালটা মুছল। দোতলার জানলা থেকে দাক্ষী নামে নতুন ঝিটা তাকে হাঁ করে। দেখছে। দেখছে আরও অনেকেই। দীনু পাইক চলে যাওয়ার পরই পাঁচু, শ্রীপতি, বলাই এসে জুটল।
কী ব্যাপার গো পানুদাদা, দীনু পাইক তোমার ওপর তম্বি করে গেল কেন?
পানু কী আর বলবে, ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল, আমি কিছু করিনি, ভাগ-টাগও চাইনি।
কীসের ভাগ? কী করোনি?
পানু মাথা নেড়ে বলল, সে অনেক কথা রে ভাই। তবে আমিও ব্যাপারটা ভালো বুঝছি না। সবাই মিলে ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ তুমুল কথাবার্তা হল। পাঁচু বলল, ও যা বলছে তাই করো গো পানুদা। পৈতৃক প্রাণটার দাম অনেক বেশি।
পানু শুধু বলল, হুঁ।
রাত্রিবেলা পানু ভালো করে খেতে পারল না। এত তেষ্টা পাচ্ছিল যে ঘটি-ঘটি জল খেয়ে খিদের বারোটা বেজে গেল। রাত্রিবেলা ঘুমও হল না ভালো। ঘন ঘন পেচ্ছাপ চেপে যেতে লাগল। দীনু পাইক যে কানুর বন্ধু তা কে জানত। আর কানুই বা কেন দীনুকে তার পেছনে লাগাল তাও বুঝে ওঠা ভার।
শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ ভাবল পানু। মাথাটা গরম হয়ে গেল।
সকালবেলায় যতীনবাবু তার পাইক বরকন্দাজ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। পানু সে-সময়ে পুকুরধারে চাদর কাচছে। এমন সময় সত্যরামের পেয়ারের লোক মুকুন্দ এসে বলল, ওরে তোর তলব হয়েছে।
সত্যরাম তার ঘরে নরম সাদা বিছানায় বসা। দেয়ালে হরেক ক্যালেণ্ডার। একখানা পেল্লায় লোহার আলমারি। ইস্তক টেবিল-চেয়ার। কে বলবে চাকরের ঘর! তা সে যত বড়ো চাকরই হোক।
তবে কিনা পরিষ্কার ঘরখানা যেমন হাসছে, সত্যরামের মুখে কিন্তু তেমন হাসি হাসি ভাব নেই। ভারি ব্যাজার মুখ। তাকে দেখে হৃ কুঁচকে বলল, কী রে, ওই ডাকাতটার সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল? বড় করছিস নাকি?
পানু আগাপাশতলা অবাক হয়ে বলল, ষড়? কীসের ষড়? ভন্ডটা যে আমাকে শাসাচ্ছিল।
শাসাচ্ছিল? কেন রে আহাম্মক, করেছিসটা কী?
সেইটেই তো ভাবছি। ভেবে ভেবে কিছু ঠিক পাচ্ছি না।
খোলসা করে বল।
খোলসা করেই বা বলি কী। কপালটাই আজ্ঞে আমার খারাপ। দীনু পাইক তো আর যাকে-তাকে শাসায় না। তার কাছে তুই তো পিঁপড়ে। কিছু গুরুচরণ করে থাকলে ঝেড়ে কেশে ফ্যাল।
পানু উবু হয়ে বসল। তারপর খানিক ভাবল। পারুল না সটকালে আজ তার তেলকলটার ম্যানেজার হওয়ার কথা। গন্ধবাবু সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সত্যরাম বা দীনু পাইক কেউই তাকে পেত না। স্বয়ং যতীনবাবুর সঙ্গে সে রোজ মুখোমুখি কথা বলতে পারত। কত বড়ো সম্মান।
চোখে জল আসছিল পানুর। মায়ের পেটের ভাই হয়ে কানু কিনা বিনা দোষে পেছনে গুণ্ডা লাগাল!
সত্যরাম তার দিকে চোখা নজরে চেয়ে থেকে বলল, দ্যাখ, তোদের কিন্তু আমিই একরকম বাঁচিয়ে-বর্তিয়ে রেখেছি। দুবেলা খেতে জুটছে, ট্যাঁক গরম-করা পয়সা জুটছে। এমন আরামে সাতটা গাঁয়ে ঘুরে দেখে আয় আর কেউ আছে কিনা। তোদের মতো মনিষ্যির পক্ষে কি এটা কম হল?
তা আজ্ঞে ঠিক।
তাই বলছি, ওই ডাকাতটার সঙ্গে বড় করে আমার পিছনে লাগার মতলব যদি থেকে থাকে তাহলে কিন্তু আখেরে ভালো হবে না। বেশি কথা কী, কালকেই সকালে বাবুকে বলে ঘাড় ধাক্কা দেব।
পানু মাথা নেড়ে বলল, আজ্ঞে আমি যথার্থই পিঁপড়ে। দীনু পাইক আমার সঙ্গে বড় করার লোক নয়। তবে আমার ভাই কানুর সঙ্গে ওর ভাব আছে। বোধহয় মদ বা জুয়ার আড্ডায় ভাব হয়েছিল। তাই আমাকে শাসাচ্ছিল বাপের সম্পত্তি যা আছে সব যেন লেখাপড়া করে কানুকে ছেড়ে দিয়ে আসি।
তোরও আবার বাপের সম্পত্তি আছে নাকি? এ যে গোরুর গাড়ির হেডলাইটের বৃত্তান্ত। তা কত কী আছে?
শুনলে হাসবেন। দেড় বিঘে জমি আর দুটো খোড়োঘর।
শুনে কিন্তু সত্যরাম হাসল না। বলল, তা তুই কী বললি ডাকাতটাকে?
