খেতে বসে আজ নলিনীকান্ত পানুর কানে কানে বলল, নতুন পাইকটার বৃত্তান্ত শুনছ! সাতখানা খুন করে এয়েছে।
পানু শুনে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়, বলিস কী?
নোনাপুকুরের বটকেষ্ট কাঁপালিকের কাছে গিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল। পুলিশ গিয়ে ধরে। বটকেষ্টর বড়ো ভক্ত হল যতীনবাবু। তার কথায় ওঠে-বসে। বটকেষ্ট যতীনবাবুকে হুকুম দিল পুলিশের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে ছাড়িয়ে এনে পাইকের চাকরিতে বহাল করতে। যতীনবাবুও কাঁচাখেকো খুনিটাকে এনে রেখেছে। রোজ দুটো করে মুরগি, ডজন ডজন ডিম ওড়াচ্ছে আর বন্দুক নিয়ে গোঁফ মুচড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভগবান বলে কিছু নেই বুঝলে?
পানু মাথা নেড়ে বলল, সে আমি অনেক আগেই বুঝেছি।
বলাই দাঁতের ফাঁক থেকে একটা মাছের কাঁটা টেনে বের করার চেষ্টা করতে করতে বলল, তবে দীনু পাইক আসায় সত্যরামের বাজার খারাপ। কর্তাবাবু দীনুকে চোখে হারাচ্ছেন আজকাল।
একথা সকলের মনে ধরল। তারা কেউ সত্যরামের পেয়ারের লোক নয়। সত্যরামকে তারা কখনো ঘাঁটায় না এবং মুখে যথেষ্ট খাতির দেখায়। নইলে সত্যরাম যেদিন খুশি ঘাড় ধরে যে-কাউকে চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে। দিয়েছেও কতককে। তবে তারা ছ-জন যে টিকে আছে তার কারণ, তারা কাজের লোক, প্রাণপণে খাটে।
পানু মাথা নেড়ে বলল, কথাটা বড়ো ভয়ের হল।
বলাই বলল, কেন ভয়ের কী? দিক না বন্দুকটা সত্যরামের ইয়েতে ঢুকিয়ে। আমি তো হরির লুট দেব।
পানু লেবুপাতা ডলে শেষ কয়েকটা গরাস গপাগপ মুখে চালান দেওয়ার ফাঁকে বলল, সত্যরামের কিছু হলে দীনু পাইক যদি আমাদের মাথার ওপর বসে তাহলে তো দিনেদুপুরে হাতে মাথা কাটবে।
ফটিক গতকালই সত্যরামের হাতে জুতোপেটা খেয়েছে হাট থেকে তামাক আনেনি বলে। সে বলল, আগে তো সত্যরামের ব্যবস্থা হোক, পরে দীনুকে নিয়ে ভাবা যাবে।
কেষ্ট এতক্ষণ কিছু বলেনি। একটা মস্ত লঙ্কা নুনে মেখে একটু একটু করে খেয়ে শিসোচ্ছিল। লঙ্কায় আর একখানা চাটন দিয়ে বলল, খবর তো রাখো না। দীনু পাইক এমনি আসেনি। খবর হয়েছে এ বাড়িতে ডাকাত পড়বে। এত টাকা, ডাকাত না পড়ে পারে!
পাঁচুর সঙ্গে শ্রীপতি এতক্ষণ নীচু গলায় দাক্ষী নামে একটা নতুন ঝিকে নিয়ে রসের কথা বলছিল। দাক্ষীর বয়স কাঁচা, দেখতেও ভালো। পাঁচু আর শ্রীপতিরও বয়স কম। দাক্ষী অন্দরমহলের ঝি। বাইরে বড়ো একটা আসে না। তবে দোতলার জানলা বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে বেপর্দা হাঁ করে বাইরের দিকে চেয়ে থাকে। পাঁচুর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়েটার ভাইয়ের বড়ো অসুখ। টিবি। সারাক্ষণ ভাইটার কথা ভাবে। পাঁচু বলল, কিছু টাকা জমলে ভাবছি ওকে দেব।
শ্রীপতি মুখখানা উদাস করে বলল, ওটাকায় কী হবে? ক-টাকাই বা তুই পাস? ওটাকা তো সাগরে শিশির। অত মজে যাস না বাপ। সত্যরাম টের পেলে ছাল ছাড়িয়ে নেবে।
সবাই যে-যার থালা নিয়ে ঘিরে পুকুরধারে মাজতে বসল।
খেয়ে উঠে পানু একটু চিন্তিতভাবে ঘরে এল। দীনু পাইককে নিয়ে তার যেন খুব চিন্তা হচ্ছে।
যদিও কোনোদিন কথাবার্তা হয়নি এমনকী চোখাচোখিও ভালো করে নয় এবং তার নামও যদিও জানেন না তবু যতীনবাবুর প্রতি একটা দুর্বলতা আছে পানুর। শত হলেও মনিব। খুব ইচ্ছে হয় পানুর, একদিন গিয়ে যতীনবাবুকে বলে, আজ্ঞে আমি আপনার চাকর, আমার নাম পানু।
যতীনবাবু হয়তো ভারি অবাক হয়ে বলবেন, ও তাই নাকি? বা! বেশ, বেশ।
ওইটুকুই যথেষ্ট। পানু আর বেশি কিছু চায় না। যতীনবাবু কেমন লোক তা জানে না পানু। কেমন আর হবেন, ভালোই হবেন বোধ হয়। ভগবান যাঁকে এমন ঢেলে দেন, লক্ষ্মী যাঁর ঘরে এমন উথালপাতাল তিনি কি আর খারাপ লোক? তা এই যতীনবাবুর জন্য পানুর এখন একটু চিন্তা হচ্ছে। দীনু পাইকের মতো খুনে লোককে নিয়ে ঘোরাফেরা কি ঠিক হচ্ছে কর্তাবাবুর!
বটকেষ্ট কাঁপালিকের নাম হল গে কালিকানন্দ। তার সাধন-নামে কেউ অবশ্য তাকে ডাকে না। সবাই তার। পুরোনো নামই বজায় রেখেছে। লোকে বলে, সে তার একটা বউকে কুয়োয় ফেলে মেরেছে, আর একটাকে গলায় ফাঁস দিয়ে। দু-বারই আত্মহত্যা বলে পার পেয়ে যায় বটকেষ্ট। নোনাপুকুরের শ্মশানে এখন তার সাধনপীঠ। খুব রবরবা। লোক যে সুবিধের নয় ঠিকই, কিন্তু পানু এও জানে, লোক ভালো হলে কাঁপালিকের চলে না। দুনিয়ার আর সব লোকের প্রতি পানুর যে মনোভাব, বটকেষ্টর প্রতিও তাই। মনোভাবটা ভয়ের। এ বাড়িতে যখন আসে তখন তার জন্য খাসি কাটা হয়, দিশি মদের বোতল আসে আর বাড়িটা কেমন ছমছম। করতে থাকে। করবেই। বটকেষ্টর সঙ্গে দেড়শো ভূত সবসময়ে ঘুরে বেড়ায়। ভূতের গায়ের বোঁটকা গন্ধে বাড়ি একেবারে ম ম করতে থাকে। যতীনবাবু বিশ্বাস করেন, তাঁর যে অবস্থার এত উন্নতি তা ওই বটকেষ্টর জন্য।
তা হবে। পানু অতশত জানে না। কী থেকে কী হয় তা সে কী জানে। বটকেষ্টর ভূতেদেরও সে খুব ভক্তিমান্য করে এবং ভয় খায়।
খাওয়ার পর তবু উবু হয়ে বসে কুয়োতলায় শ্যাওলা ঘষে তুলছিল পানু। শীতকাল। রোদ পশ্চিমে হেলেছে।
সেই রোদে একটা ছায়া পড়ল তার গায়ে।
পানু মুখ তুলে যা দেখল তাতে ফের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। সামনে দীনু পাইক দাঁড়িয়ে। বুকের মধ্যে কেমন একটা গুড়গুড় শব্দ উঠল। হাত-পা সব ঠাণ্ডা মেরে যেতে লাগল।
