বুড়ি বলল, আমি যতীনের দিদিমা, যা ওই পুবের ঘরের পিছনে যে গাছগুলো আছে সেখান থেকে একটা পেড়ে আন। আজ একাদশী।
যতীনবাবুর দিদিমা! পানুর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। তক্ষুনি গিয়ে তরতরিয়ে গাছে উঠে একটার জায়গায় চারটে পেড়ে আনল।
কুসুম দাসী খুব খুশি। কত আশীর্বাদ করল। ফলে আজ পানুর রাজাগজা হওয়ার কথা। সে তো হয়ইনি সে, তার ওপর ডাব পাড়ার জন্য সত্যরাম এই মারে কী সেই মারে। তবে সে যা-ই হোক, সেই থেকে বুড়ির সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেল পানুর। যতীনবাবুর দিদিমার অবস্থা যে তার চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়, তা বুঝতে পানুর দেরি হয়নি। তবে বুড়ি মানুষ ভালো। দায়ে পড়লে মানুষের স্বভাব ভালো হয়ে পড়ে, তারা ভারি নরম নরম হয় আর লোকদের ভক্তিমান্য করতে শুরু করে, এ পানু অনেক দেখেছে। যতীনবাবুর দিদিমাও সেই হিসেবেই ভালো। পানুকে খুব ডাকখোঁজ করে, এটা-সেটা জোগাড় করে দিতে বলে, আর লোভও দেখায়, তোর বে হোক, আমার এক ছড়া তিন ভরির মটরদানা হার আছে, তোর বউকে দেব।
পানু হাসে। মটরদানা হারখানা আর দিদিমাকে হাতছাড়া করতে হবে না ইহজন্মে। পারুল সটকে পড়ার পর থেকেই পানু জানে, এই ঢনঢনে কপালে বে আর নেই।
খড় কুচোতে বসে, কিংবা চুন আর বালি দিয়ে ঝামায় ঘসে কুয়োপাড়ের শ্যাওলা তুলতে তুলতে, কিংবা পুকুরধারে পাটায় বাবুদের পেল্লায় পেল্লায় মশারি কাচতে কাচতে জীবনটার ওপর যেমন ঘেন্না আসে, তেমনি আবার শিউলি ফুটলে, নলেনগুড় জ্বালের গন্ধ বেরোলে বা কোকিল আচমকা ডেকে উঠলে মনটা ভারি খুশি। খুশি হয়ে ওঠে। জীবনটায় আর একটা খুশির তুফান লাগতে পারত যদি সত্যরাম তার ওপর খুশি থাকত। কিন্তু সেটাই কিছুতেই হয়ে উঠল না। এক-একজন থাকে, বেশ আছে, দোষঘাট কিছু করেনি, তবু তার ওপর কেউই যেন খুশি হয় না। তাকে দেখলেই মুখ ব্যাজার করে ফেলে। পানুরও হয়েছে তাই। পানুর বাপ মারা গেল এই তো সেদিন। খবর পেয়ে পানুর তেমন কিছু বুক-তোলপাড় হল না। গরিবদের তেমন আঠা থাকে না কিনা। বাপের সঙ্গে পানুরও বহুকাল ছাড়কাট হয়ে গেছে। তবু খবর পেলে যেতে হয়, তাই গেল। গিয়ে দেখল, দেড় বিঘে জমি আর খোড়ো ঘরসমেত বাস্তুটা জুড়ে থাবা গেড়ে আছে তার ছোটোভাই কানু। রাগি কুকুর যেমন লোক দেখলেই গরগর করতে থাকে, তেমনি তাকে দেখেও কানু কেমন যেন গরগর করতে থাকল। বুঝি ভেবেছিল পানু বাপের সম্পত্তির ভাগ চাইবে। চাওয়ার কথা মনেই হয়নি পানুর। সে বড়োলোকের চাকর, নজর একটু উঁচু হয়েছে। দেড় বিঘে জমি আর নড়বড়ে খোড়ো ঘরের ভাগ চাইবার মতো ছোটোনজর তার আর নেই। সেকথা কানুকে বুঝিয়েও বলল সে, তবু কানু গরগরানিটা থামাল না। বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার বেশ। ফাঁদানো সংসার। এখানে ভাগিদার জুটলে তার বিপদ। সে তো আর সুখে নেই। তবে ছোঁড়াটা বরাবরই খারাপ ছিল। মদ-টদ খায়। জুয়া খেলে, বউকে ধরে পেটায়, বাপকেও ঝাড় দিত মাঝে মাঝে।
পানু ফিরে আসার পর সত্যরাম একদিন তাকে পা দাবাতে ডেকে পাঠাল। সত্যরামের পা দাবানো এক মস্ত সম্মানের ব্যাপার। যে-সে সত্যরামের পায়ে হাত ছোঁয়াতে পারে না। যারা পারে তাদের নির্ঘাত দশ-বিশ টাকা বেতন বেড়ে যায়। আর তারা নেকনজরেও থাকে।
পানুর ভারি আহ্লাদ হয়েছিল সত্যরামের ডাক পেয়ে। কিন্তু পা দাবাবে কী, হাত ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই সত্যরাম কঁকিয়ে উঠে বলল, ওরে থাম থাম, কী লোহার হাত রে বাবা। কড়া পড়ে যে এক্কেবারে শিরিস কাগজ বানিয়েছিস। আমার নরম শরীর, ওই কেঠো হাত চলবে না।
তা কথাটা সত্যি বটে। পানুর হাত আর হাত নেই। থাবা হয়ে গেছে। মনের দুঃখে সে সত্যরামের ঘর থেকে ফিরে এল। কপালটা খুলি খুলি করেও খুলল না। সত্যরামও চাকর বটে, কিন্তু বড়ো চাকর! সর ননি দুধ ঘি খেয়ে আর গতর না খাটিয়ে সে ইদানীং ভারি নাদুসনুদুস হয়েছে। মুখখানায় আহ্লাদী ভাব। তিন আঙুলে তিনখানা সোনার আংটি। এমন এঁটে বসে গেছে যে, স্যাকরা ডেকে না খোলালে আর খুলবে না। তার পা। দাবাতে গেলে পানুকে সাতদিন হাত দুখানা তেলে ভিজিয়ে নরম করে নিতে হবে।
এইসব নানা কথা নিয়ে ভাবে পানু! আর কাজ করে। আর খায়। আর ঘুমোয়। আর ভাবে।
ওদিকে যতীনবাবুর কারবার বাড়ছে, টাকা বাড়ছে, লোক বাড়ছে। ক্রমে ক্রমে চারদিকটা বেশ ফলাও হয়ে উঠেছে। দুখানা গাড়ি কিনলেন যতীনবাবু। বারবাড়ির উঠোনে একখানা দোতলা তুলে ফেললেন। পাঞ্জাব থেকে দুটো বিশাল গাই এল।
কিন্তু পানু যে কে সে-ই! তবে একথাও ঠিক, যতীনবাবুর উন্নতি যত হয় ততই পানু খুশি হতে থাকে। শত হলেও মনিব তো। যতীনবাবুর রংখানা দিন দিন ফর্সা হয়েছে, চোখ দুখানা থেকে দু-বাটি মধুর মতো সুখ থিকথিক করছে। মুখখানায় সর্বদা যেন হাসি-হাসি ভাব। আগে একজন পাইক সর্বদা ঘুরত। আজকাল দুজন। দু-নম্বর পাইকটার চেহারা কাবলিওলাদের হার মানায়। যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া, তেমনি বিশাল বুকখানা। আর চোখ দুখানায় দোলা ছুরির ধার। যত টাকা বাড়ছে যতীনবাবুর ততই শত্রু বাড়ছে। তাই বাড়ছে পাইক। নতুন পাইকটার হাতে একটা দোনলা বন্দুকও থাকে। দেখে ভারি ভক্তি-শ্রদ্ধা হল পানুর।
দুপুরবেলা বারবাড়ির বারান্দায় তারা ছ-জন বাইরের চাকর খেতে বসে। সত্যরামের পেয়ারের লোকদের জন্য ভিতরে দরদালানে ভিন্ন ব্যবস্থা। তা হোক, পানুর কোনো দুঃখ নেই। যতীনবাবুর বাড়িতে ভাতটা নিয়ে হিসেব করা হয় না। যত পারো খাও। ভাতটা বেশ চেপেই নেয় সকলে। ভাতের মাথায় একটা গর্ত করতে হয়, তাতে বড়ো হাতা দিয়ে হড়হড় করে ডাল ঢেলে দিয়ে যায় হরিহর। একটু ঘ্যটি মতো থাকে সঙ্গে। পরে চুনো বা ছোটো মাছের একখানা ঝোল। বাড়িতে ভোজ হলে অবশ্য তাদের কপাল ফেরে। আর যতীনবাবুর বাড়িতে ভোজ লেগেই আছে।
