তা পাত্রটি কেমন পেলেন? ইঞ্জিনিয়ার না কী যেন শুনেছিলাম।
আমারও শোনা কথা। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।
বেশ গালভরা কথা। কিন্তু কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ব্যাপারটা কী তা কি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারেন? তারা কি কম্পিউটার বানায় না মেরামত করে? আসল ব্যাপারটা কী?
আপনিও যে তিমিরে আমিও সে তিমিরে।
বীরেশবাবু বলছিলেন আমেরিকা না কোথা থেকে যেন ঘুরে এসেছে। তা আজকাল ওই এক দেশ হয়েছে। সবাই শুনি ল্যাজ তুলে সেখানে দৌড়োচ্ছে। আগে বিলেতের কদর ছিল, এখন তো সেটা বোষ্টমঘাটার মতো এলেবেলে জায়গা হয়ে গেছে।
কিছুদিন সবুর করুন, আমেরিকাও তাই হয়ে যাবে।
তাই হোক মশাই, তাই হোক। এই আমরা যারা আমেরিকা–টিকা যাইনি তাদের ভারী আত্মগ্লানি হচ্ছে। বাড়িতেও সবাই ঠেস দিয়ে কথা কয় কিনা।
বাড়ির লোকদের নিয়ে আপনার একটু প্রবলেম আছে, তাই না?
সবারই আছে মশাই, সবারই আছে। আমি পেট পাতলা মানুষ বলে কবুল করে ফেলি, অন্যেরা চেপেচুপে রাখতে পারে। আপনার তো বয়স কম, বুঝবেন না। বলি, বিয়ে–টিয়ে করেছেন?
আজ্ঞে না।
আগে করুন, তারপর বুঝবেন। বাইরে আপনি যত বড় কেওকেটা মানুষই হন না কেন, বাড়ির লোকের কাছে পাপোশের বেশি সম্মান আশা করবেন না।
কিন্তু আপনি তো সেই বাড়িতেই ফিরে যাওয়ার জন্য ভারী ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দেখছি।
ওটাই তো জীবনের ট্র্যাজেডি। কতবার সন্ন্যাসী–বিবাগি হওয়ার কথা ভেবেছি, পেরে উঠিনি, সুইসাইড করব বলে মনস্থির করেও রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছে। কেন জানেন?
কেন বলুন তো।
তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করে বটে, মুখনাড়াও দেয় আবার শরীরটরির খারাপ হলে বা বিপাকে পড়লে হামলে এসে আগলায়ও তো! সংসার এক রঙ্গ মশাই।
সেরকমই শোনা যায় বটে।
এতক্ষণ ধরে কথা কইছি কিন্তু আপনার সঙ্গে ভালো করে পরিচয়ও হয়নি। তা আপনি কি বীরেশবাবুর আত্মীয়–টাত্মীয় নাকি?
না, না, এই কাছেই থাকি, চেনাজানা আছে আর কি।
আমার নাম দিবাকর দত্ত, সরকারি ঠিকাদার। বীরেশবাবুর এই বাড়িটা আমিই করে দিয়েছিলাম।
আপনি সরকারি ঠিকাদার! তা হলে তো বড়লোক মানুষ আপনি!
আরে না। ঠিকাদারদের আজকাল আর বেশি মার্জিন থাকে না। একে ওকে তাকে দক্ষিণা দিতে-দিতেই সব উজাড় হয়ে যায়। পেমেন্ট পেতেও নাভিশ্বাস। শুনতেই ভালো।
গাড়ি–টাড়ি নেই?
তা থাকবে না কেন? কিন্তু কলকাতার যা হাল হয়েছে গাড়ি নিয়ে পারতপক্ষে বেরোয় কোন আহাম্মক!
ঠিকই বলেছেন।
তা আপনার নামটি কী?
সুজিত।
বামুন না কায়েত?
কায়েত।
তা কী করা হয়–টয়?
এই টুকটাক হাতের কাজ।
চাকরি করেন না?
ওই সামান্য একটা।
বয়স তো বোধহয় সাতাশ-আঠাশ।
আঠাশ।
তা এই বয়সে আপনার আত্মবিশ্বাসের অভাব হচ্ছে কেন?
ব্যাপারটা হঠাৎ আজ সকালেই ধরা পড়ল কিনা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হল, আমার যেন আত্মবিশ্বাসটা নেই।
তার মানে কি আগে ছিল, এখন নেই?
আগে ছিল কি না ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে এখন নেই, এটা বেশ বুঝতে পারছি। কেমন একটু নার্ভাস লাগছে।
হ্যাঁ, আপনি যে বেশ নার্ভাস তা বুঝতে পারছি নইলে আলটপকা এসে আমাকে জিগ্যেস করতেন না যে, আত্মবিশ্বাস জিনিসটা কী রকম। কিন্তু হঠাৎ নার্ভাসই বা লাগছে কেন?
বলা মুশকিল। মাঝে-মাঝে জীবনে এক একটা দিন আসে যখন কোনও একটা সত্য উদঘাটিত হয়ে যায়।
বাঃ, বেশ বলেছেন। ও রকম আমারও হয়। এই তো বছরটাক আগে পাঞ্জাব মেল থেকে হাওড়া স্টেশনে নামছি, দরজার কাছটায় উঠন্ত কুলি আর নামন্ত যাত্রীদের মধ্যে খুব ঠেলাঠেলি। হাতের অ্যাটাচিকেসটা সামলাতে পারছি না। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো একটা বেশ মিষ্টি দেখতে ছেলে হঠাৎ ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল , দিন না, অ্যাটাচিকেসটা আমার হাতে দিন। তারপর নামুন। এ সব লোকেরা বোধ হয় খানিকটা হিপনোটিজমও জানে। কে জানে কেন ছেলেটাকে আমার বেশ চেনাচেনাও ঠেকল, তাই দিব্যি অ্যাটাচিকেসটা দিয়ে দিলাম। নেমে এক গাল মাছি। কোথায় সেই ছোঁকরা, আর কোথায় বা অ্যাটাচি। তা সে দিন আমি বুঝলাম যতই লোক চরিয়ে খাই না কেন, আমি একটি গাড়ল।
আপনাকে কিন্তু গাড়ল বলে মনে হয় না। যদিও এ জায়গাটার তেমন আলো নেই, তবু মনে হচ্ছে আপনি বেশ বুদ্ধিমান লোক।
কথাটা যে খুব ভুল বলেছেন তা নয়। আমি বুদ্ধিমানও বটে, আবার গাড়লও বটে। কোনও কোনও ব্যাপারে বুদ্ধিমান কোনও কোনও ব্যাপারে গাড়ল। সব মানুষই এরকম। নিউটন বড় আর ছোট বেড়ালের জন্য কক্ষে দুটো দরজা করেছিলেন, মনে আছে তো?
হ্যাঁ, মনে আছে।
আমরা আসলে আমাদের বুদ্ধিটাকে সর্বত্র প্রয়োগ করি না। এক বিষয়ে বুদ্ধির খেল দেখিয়ে বাহবা কুড়োচ্ছি, অন্য বিষয়ে আকাট বোকার মতো কাজ করে ছিছিক্কার পাচ্ছি। এই ধরুন ঠিকাদারির কাজে আমাকে বোকা বানাতে পারে এমন লোক কমই পাবেন, আবার সেই আমিই যে কী করে বাজার থেকে বুড়ো তেঁড়শ বা পাকা পটল নিয়ে আসছি সেটা আমার কাছেও রহস্য। কাজেই আমি বুদ্ধিমানও বটে, বোকাও বটে। কিন্তু আপনার কথাটাই শোনা গেল না। আপনি যেন কেন আজ নার্ভাস বোধ করছেন!
ওই যে বললাম, আজ সকালে উঠেই মনে হচ্ছে আমার আত্মবিশ্বাস বলে কিছু নেই। ঘাবড়াচ্ছেন কেন? যখন বিয়ে করবেন তখন থেকে টের পাবেন আপনার আরও অনেক কিছুই নেই। বউ এসে আপনার এমন অ্যাসেসমেন্ট করতে শুরু করবে যে আপনি নিজেই অবাক হয়ে যাবেন।
