ওরে বাবা!
ভয় পেলে চলবে কেন? এটাই তো দুনিয়ার দস্তুর।
বিয়ে না করলে কেমন হয়?
ব্যাচেলর থাকবেন? তা হলে তো আরও চিত্তির। ব্যাচেলরকে সবাই এক্সপ্লয়েট করে। আত্মীয়স্বজন থেকে বন্ধুবান্ধব কেউ ছাড়বে না। তা ছাড়া ব্যাচেলাররা একটু বায়ুগ্রস্তও হয়ে পড়ে কি না। প্রথম ব্যাচটা বসল কি না একটু খেয়াল রাখবেন। সাড়ে সাতটা বাজতে চলল কিন্তু।
না-না, সাতটা সতেরো। ফার্স্ট ব্যাচ বসার আগেই আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।
আপনি কি বিয়েবাড়ির ম্যানেজমেন্টে আছেন নাকি?
না, ঠিক ম্যানেজমেন্টে আছি বলা যায় না। তবে দেখাশোনা করছি আর কি।
বিয়েতে দেনা-পাওনাকীরকম হচ্ছে জানেন?
তেমন কিছু শুনিনি।
নগদ আছে নাকি?
যতদূর জানি, না। অবশ্য নগদের প্রশ্নও ওঠে না। শুনেছি নাকি মেয়েটি পছন্দ করে বিয়ে করছে।
ল্যাভ ম্যারেজ নাকি মশাই?
তা ওরকমই বোধহয় কিছু।
সে কী! আপনি পাড়ার ছেলে হয়ে এ সব জানেন না!
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হল।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাকি?
ঠিক ফেললাম না। বেরিয়ে গেল।
বীরেশবাবুর মেয়ে রিয়া বেশ সুন্দরী, তাই না?
আজ্ঞে।
কীরকম সুন্দরী বলে আপনার মনে হয়?
খুব।
সুজিতবাবু, একটা কথা জিগ্যেস করব?
করুন না।
ভাই এনি চান্স, রিয়ার প্রতি আপনার কোনও দুর্বলতা নেই তো!
এ কথা কেন মনে হল আপনার?
আত্মবিশ্বাসের অভাবের কথা বলছিলেন তো, তার ওপর দীর্ঘশ্বাস!
দুর্বলতাই তো মানুষকে খায়। আপনি খুবই বুদ্ধিমান।
হলে ঠিক ধরেছি?
ঠিকই ধরেছেন। আত্মবিশ্বাসের অভাবের ফলেই এগোতে পারেননি তো!
সেটাও একটা ফ্যাক্টর বটে।
ভেঙে পড়বেন না মশাই। আপনার এখনও বয়স পড়ে আছে। কত কী ঘটতে পারে। বীরেশ মিত্রের মতো বড়লোকের মেয়েকে প্রেমের প্যাঁচে ফেলে বিয়েতে গেঁথে তুলতে পারলেও হয়তো পরে পস্তাতেন। বড়লোকের আদুরে মেয়ের বায়নাক্কা সামলানো তো সোজা কথায়।
সে তো বটেই।
তা হলে খারাপটা কী হয়েছে বলুন। ভালোই তো হয়েছে।
আপনি যেভাবে ধরছেন সেভাবে ধরলে বলতে হয় ভালোই হয়েছে।
আরে মশাই, সবসময়ে জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলোর কথাই তো আমাদের ভাবা উচিত, তাই? আচ্ছা, আপনার চাকরিটা কী রকম?
সামান্যই।
সরকারি না বেসরকারি?
বেসরকারি।
ওই তো মুশকিল। বেসরকারি ফার্মগুলো বড্ড এক্সপ্লয়েট করে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
জব সিকিউরিটিও তেমন থাকে না।
যথার্থই বলেছেন।
মাইনে-টাইনে কেমন দেয়?
মোটামুটি দেয়, আমার চলে যায়।
খাটুনি কেমন?
খুব। মোষের মতো খাটতে হয়। দৌড়ঝাঁপও আছে।
ওই তো বেসরকারি ফার্মে চাকরির মুশকিল। আপনি তো বললেন হাতের কাজ জানেন।
আজ্ঞে যৎসামান্য।
ভালো করে শিখলে হাতের কাজ জানা লোকের অবশ্য চাকরির অভাব হয় না। তা আপনার হাতের কাজটা কী ধরনের?
এই একটু কম্পিউটার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতাম। তাই একটু-আধটু শিখেছি।
আজকাল তো কম্পিউটারেরই যুগ। লেগে থাকুন, হবে।
লেগেই তো আছি।
কোন কোম্পানিতে আছেন?
ইনফো টেকনো।
ইনফো টেকনো? না! নামটা শুনেছি বলে মনে হয় না।
শোনার মতো নয়। মোটে দু-বছর হল খুলেছে।
এবার একটু অ্যালার্ট হবেন মশাই। সাড়ে সাতটা বাজে কিন্তু।
হ্যাঁ, ওটা আমার খেয়াল আছে। এখন আপনি ধীরে-ধীরে রওনা হতে পারেন, তবে গিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়াতে হবে। পাঁচ মিনিট পর ডাকবে।
তা হলে উঠি?
হ্যাঁ, আসুন।
আপনার পুরো নামটা কী যেন!
সুজিত বসু!
সুজিত বসু! নামটা চেনা-চেনা লাগছে কেন বলুন তো!
চেনা লাগবার কথা তো নয়। আমি বিখ্যাত লোক নই।
তা হলেও কেমন যেন চেনা ঠেকছে। আচ্ছা ইয়ে বীরেশবাবুর জামাইয়ের নামটা কী বলুন তো!
সুজিত বসু!
তাই তো! সেই জন্যই চেনা ঠেকছিল। আপনার নামও তা হলে সুজিত বসু! তা কী করে হয়?
আর একটা দীর্ঘশ্বাস।
হয়। হয়ে যায়।
তার মানে কি আপনি বলতে চান রিয়ার সঙ্গে একজন সুজিত বসুর বিয়ে হচ্ছে যিনি আপনি নন? ।
আর একটা দীর্ঘশ্বাস।
সেরকম হলেই বোধহয় খুশি হওয়া যেত। কিন্তু লোকটা আমিই।
অ্যাঁ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বুদ্ধিরাম
বুদ্ধিরাম শিশিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। লেবেলে ছাপ অক্ষর সবই খুব তেজাল। ‘ইহা নিয়মিত সেবন করিলে ক্রিমিনাশ, অম্ল পিত্ত ও অজীর্ণতা রোগের নিবারণ অবশ্যম্ভাবী। অতিশয় বলকারক টনিক বিশেষ। স্নায়বিক দুর্বলতা, ধাতুদৌর্বল্য ও অনিদ্রা রোগেরও পরম ঔষধ। বড় বড় ডাক্তার ও কবিরাজরা ইহার উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন।…’ছাপা অক্ষরের প্রতি বুদ্ধিরামের খুব দুর্বলতা। ছাপা অক্ষরে যা বেরোয় তার সবটাই তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে।
আদুরি অবশ্য অন্য ধাতের। বুদ্ধিরামের সঙ্গে তার মেলে না। বুদ্ধিরাম যা ভাবে, বুদ্ধিরামের যা ইচ্ছে যায় আদুরির ঠিক তার উলটো হয়। বুদ্ধিরাম যদি নরমসরম মানুষ তো আদুরি হল। রণচণ্ডী। বুদ্ধিরাম যদি নাস্তিক, তো আদুরি হল ঘোর আস্তিক। বুদ্ধিরামকে যদি কালো বলতে হয়, তো আদুরিকে ফরসা হতেই হবে। বিধাতা (যদি কেউ থেকে থাকে) দুজনকে এমন আলাদা মালমশলা দিয়ে গড়েছেন যে আর কহতব্য নয়।
আর সে জন্যই এ জন্মে দুজনের আর মিল হল না। বলা ভালো, হতে-হতেও হল না। এখন যদি বুদ্ধিরামের বত্রিশ-তেত্রিশ তো আদুরির সাতাশ–আঠাশ চলছে। দুজনের কথাবার্তা নেই, দেখাশোনাও একরকম কালেভদ্রে, মুখোমুখি যদি বা হয় চোখাচোখি হওয়ার জো নেই। আদুরি আজকাল বুদ্ধিরামের দিকে তাকায় না।
