ঠিকই বলেছেন। তবে নেই-এর লিস্টিটা বড় বড় হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।
বেশিরভাগ লোকেরই তাই। নেই-এর লিস্টি আমারও খুব বড়। এত বড় যে তাই দিয়ে ঘুড়ির লেজ বানান যায়। আচ্ছা, কীসের গন্ধ আসছে বলুন তো! দিব্যি খুশবু।
ওঃ, এ গন্ধটা! দাঁড়ান বলছি! এ হল বিরিয়ানির গন্ধ। জাফরান পড়েছে, আর খোয়া ক্ষীর। আর ক্যাওড়ার জলও।
বাঃ, আপনার নাক তো খুব শার্প।
হ্যাঁ, আমি বড় গন্ধ পাই।
বাঃ, তা হলে ওটা আছে–র লিস্টিতে ধরবেন। তা আর কী-কী আইটেম আছে আজ জানেন?
খুব জানি। পয়লা পাতে রাধাবল্লভী, বেগুনভাজা, ছোলার ডাল, ফিশ ফ্রাই। তারপর বিরিয়ানি, কষা মাংস। শেষ পাতে চাটনি, আইসক্রিম, সন্দেশ আর রসগোল্লা। পাঁপড়ভাজাও আছে।
নেমন্তন্ন বাড়ির খাওয়া সবই প্রায় একরকম হয়ে যাচ্ছে। একটা অন্যটার কার্বন কপি। কী বলেন?
যে আজ্ঞে।
তা মশাই, এই বিয়েবাড়ির মেনু আপনি জানলেন কী করে? আপনি কী কন্যাপক্ষের কোনও কর্মকর্তা।
না। পাড়ায় থাকি। বীরেশবাবু একটু স্নেহ করেন।
অ। তাই তাঁর মেয়ের বিয়েতে খাটছেন বুঝি?
আজকাল আর বিয়েবাড়ির খাটনি কোথায়? সব তো ডেকোরেটর, ক্যাটারার এরাই করে দেয়। ক্যাটারারের সঙ্গে আমার একটু ভাবসাব আছে, আমিই ঠিক করে দিয়েছিলাম।
তাই বলুন।
একশো কুড়ি টাকা করে প্লেট।
একশো কুড়ি! সে তো সস্তা মশাই। গেল হপ্তায় সত্যেনবাবুর ছেলের বিয়ে খেলে এলুম, শুনলুম দুশো টাকা করে প্লেট।
দুশো! ও বাবা, দুশো টাকা তো বিরাট ব্যাপার।
আপনার আমার কাছে বিরাট, সত্যেনবাবুর কাছে তো আর নয়। সত্যেনবাবুরা নমস্য ব্যক্তি। আপনার আর আমার যেমন নেই-এর লিস্টিটা অনেক লম্বা, সত্যেনবাবুদের তেমনি আছে–র লিস্টিটা বেজায় বড়। তবে কিনা এমন অনেক লোক আছে যাদের কাছে সত্যেনবাবুও নস্যি।
খুব ঠিক কথা। আরও-র কোনও শেষ নেই।
এই তো বুঝেছেন। লোককে কোনও কথা বোঝাতে পারলে আমি বড় খুশি হই। ভারী তৃপ্তি পাই। মুশকিল কি জানেন, আজকাল বেশিরভাগ লোককেই কোনও কথাই যেন বুঝিয়ে উঠতে পারি না। তখন সন্দেহ হয় আমি হিব্রু ভাষায় কথা বলছি না তো! এটা বেশিরভাগ কোথায় হয় জানেন? বাড়িতে। নিজের বাড়ির লোকেরা এই আমার বউ, ছেলে, মেয়ে–এদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই ভয়ঙ্কর ল্যাংগুয়েজ প্রবলেম হয় মশাই।
কেন, আপনার স্ত্রী কি মাদ্রাজি না জার্মান?
নৈকষ্যি বাঙালি মশাই। কোলাঘাটে বাপের বাড়ি। না-না, ভাষাগত সমস্যা ঠিক ওরকম নয়। আসল কথা, তারা আমার বক্তব্য বুঝতে চায় না। কিংবা বলতে পারেন গ্রহণ করে না। আমি হয়তো খুব মোলায়েম করে বললুম, ওগো, বাড়িওলার সঙ্গে ঝগড়া করার দরকার নেই। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ কি ভালো? সঙ্গে-সঙ্গে আমার বউ খেপে উঠে বলল , ঝগড়া করব না মানে? একশোবার করব। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে করেই তো দেশটার আজ এই অবস্থা! তোমার মতো মেনিমুখোদের দিয়ে সংসার চলে না ইত্যাদি। যা বোঝার বুঝে নিন।
বুঝেছি।
তারপর ধরুন, হয়তো অফিস থেকে ফিরে এসে দেখলুম আমার ডায়েরির মধ্যে কে যেন একটা চিরুনি খুঁজে রেখেছে। চিরুনির তেলে ডায়েরির পাতায় জলছাপ। পুরুষ সিংহ নই জানি, তবে হয়তো সামান্য একটু হেঁকে কথাটা বলতে গেছি, সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েও এসে গলা মেলাল। তাদের ধারণা, এরকম চেঁচামেচি নাকি নারী নির্যাতন ছাড়া কিছু নয়। যুগ-যুগ ধরে নারীরা পুরুষদের হাতে যে কীভাবে নিরন্তর নির্যাতিত হয়ে আসছে তা নাকি নির্যাতনকারী পুরুষেরা নির্যাতনে অভ্যস্ত বলে বুঝতেও পারে না।
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হল, খুবই খারাপ অবস্থা তো!
খুব। আচ্ছা, এই ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, গোর্খাল্যান্ড হচ্ছে, আপনি কি জানেন আলাদা নারী রাজ্য বানারীল্যান্ড নিয়ে কোনও দাবি দাওয়া উঠেছে কিংবা আন্দোলন হচ্ছে কি না?
না তো। আমি শুনিনি।
উঠছেনা কেন বলুন তো।
মনে হয় নারীল্যান্ডে চাকরবাকরদের অভাব দেখা দিতে পারে বলেই দাবি উঠছে না।
বাঃ, বেশ বলেছেন মশাই। অতি ঠিক কথা। নারীল্যান্ড হলে ফাইফরমাস করার জন্য পুরুষ জুটবে কোত্থেকে? তাই তো, কথাটা আমার মাথায় আসেনি। এটা কিন্তু আপনার আছে–র লিস্টিতে যায়। বুঝলেন?
বুঝেছি।
তা ফার্স্ট ব্যাচের ডাক কখন পড়বে বলতে পারেন?
মোটে সাতটা বাজে। আরও আধঘণ্টা বা থ্রি কোয়ার্টার ধরে রাখুন।
আমি তো সেই দমদম পার্কে ফিরব, তাই বলছিলাম। তালগ্ন কটায় জানেন নাকি?
খুব জানি। রাত বারোটা বিয়াল্লিশ মিনিট।
ও বাবা!
ভয় পাবেন না, লগ্ন দেরিতে বলে ব্যাচ দেরিতে বসবে না। দমদম পার্কে ফেরার সবচেয়ে ভালো রুট হল এখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে গিয়ে রাসবিহারীর মোড় থেকে পাতালরেল ধরা।
সেটাই তো প্ল্যান মশাই। আর ব্যস্ত হচ্ছি সেই কারণেই। পাতাল রেল তত বোধ হয় সাড়ে নটায় বন্ধ হয়ে যায়।
তার মধ্যেই পারবেন। এখান থেকে রাসবিহারীর মোড় তো হাঁটা পথ। বাসে পাঁচ সাত মিনিট, ট্যাক্সিতে মিনিট তিনেক। কিংবা আরও কমও হতে পারে।
বলছিলাম কি তাড়াহুড়ো করলে খাবারের স্বাদ সোয়াদ তেমন পাওয়া যায় না। বিরিয়ানির গন্ধটা বেশ ভালোই ছেড়েছে মশাই।
হ্যাঁ, কারিগর খুবই ভালো।
বীরেশবাবু তা হলে বেশ খরচা করেই মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন, কী বলেন?
হ্যাঁ, খরচ তো আছেই।
