দিন দশেক কেটে যাওয়ার পর একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় আমরা ভাইবোনে হঠাৎ দেখলাম, আমাদের বাড়ির সামনে অনেক লোক জড়ো হয়েছে আর ভিতরে ভীষণ চেঁচামেচি হচ্ছে।
আমরা দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে ঢুকে দেখি, সামনের ঘরে বাবা একটা লোহার চেয়ারে মুখ নীচু করে বসা, তাকে ঘিরে আমার পাঁচ মামা রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়িয়ে। ভিতরের দরজায় পাথরের মতো মা। পরদার আড়ালে মাসি আর মামিদের মুখ উঁকি মারছে।
বড়মামা গর্জন করছে, জোচ্চোর! জোচ্চোর! চরিত্রহীন! কেন আগে বলোনি যে, তুমি সেখানে আর একটা বিয়ে করেছ? আগে জানা থাকলে এ বাড়িতে তোমাকে ঢুকতে দিতাম ভেবেছ? বদমাশ কোথাকার, এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে বিদেয় হও।
মেজোমামা বরাবরই একটু গুন্ডা প্রকৃতির। এতক্ষণ ফুঁসছিল, হঠাৎ আমাদের দেখে তার রাগ ফেটে পড়ল, এই দুটো ফুলের মতো শিশু, এদের কথা তোমার মনে পড়ল না লুম্পেন কোথাকার? অ্যাঁ! এদের কী হবে? বলতে-বলতে মেজোমামা হঠাৎ গিয়ে বাবার চুল ধরে মাথাটা খুব জোরে নাড়া দিয়ে ঠাস–ঠাস করে কয়েকটা চড় কষাল গালে। আমরা হতভম্ব। বাকরহিত। রেবা আমাকে ধরে কাঁপতে লাগল।
ওদিকে সব মামাই তখন বাবাকে গিয়ে ধরেছে। ধাক্কা দিচ্ছে, টানছে, ঠেলছে। একটু বাদে টিনের চেয়ারটা উলটে পড়ে গেল।
দাদামশাই কোথায় ছিলেন জানি না। হঠাৎ তিনি গম্ভীর মুখে ঘরে ঢুকে ছেলেদের বললেন, বসন্তকে ছেড়ে দাও। এ-বাড়ির একটা সম্মান আছে মনে রেখো। ওকে চলে যেতে দাও।
মামারা তবু গজরায়। কিন্তু সরেও আসে। বাবা মাঝে থেকে আস্তে-আস্তে ওঠে। পাঞ্জাবিটা একটু ছিঁড়ে গেছে ঘাড়ের কাছে, চুলগুলো দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একটা ভ্যাবলা–ক্যাবলা ভাব, ভীতু চাউনি। বাবা অবশ্য কারও দিকেই তাকাল না। ঘরের দেওয়ালের সঙ্গে তার স্যুটকেস আর বিছানা দাঁড় করানোই ছিল। বোধহয় বিপদ বুঝে পালাচ্ছিলই বাবা। এখন উঠে গিয়ে সেই স্যুটকেস এক হাতে আর অন্য বগলে বিছানাটা তুলে নিল।
বেরোবার মুখে একবার শুধু আমাদের দিকে চাইল বাবা। আমার দিকে একটুক্ষণ, রেবার দিকে তার চেয়ে কিছু বেশি সময়। একবারও বুঝি ঠোঁট নড়ল। কিন্তু কোনও কথা বেরোল না। তার বদলে তার দুই চোখে একফোঁটা করে জল গড়িয়ে পড়ল।
পাড়া–প্রতিবেশীর ছিছিককার, মামাদের তর্জন–গর্জন এবং মায়ের পাথরের মতো শীতল দৃষ্টির ভিতর দিয়ে বসন্ত চট্টোরাজ ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের বাড়ি থেকে। আমাদের জীবন থেকে চিরকালের মতো বোধহয়। তখনও তার মাথার চুল খাড়া হয়ে আছে, পাঞ্জাবির ঘাড়টা ছেঁড়া। নাগরার শব্দ ধীরে-ধীরে মিলিয়ে গেল রাস্তায়।
সেদিন রাত্রে আমরা ভাইবোনে শুয়েছি বিছানার দু-ধারে। মাঝখানে মায়ের বালিশ। কিন্তু মা তখনও শুতে আসেনি। কখন আসবে তা বলা মুশকিল। মা কথা বলছে না, সারাদিন নিস্তব্ধ আর স্থির হয়ে বসে আছে ঠাকুরঘরে।
আমাদের আর পাঁচজনের সামনে মুখ দেখানোর উপায় নেই। কী লজ্জা! বাবা শুধু বিয়েই করেনি, তার তিন–তিনটে ছেলে আছে। ইগতপুরীতে। নির্মলা দেবীর নামে একটা খামে চিঠি লিখেছিল বাবা। সেটা ডাকে দিতে গিয়ে ছোটমামার সন্দেহ হয়। হিন্দিতে লেখা চিঠিটা খুলে। মামা ডাকঘরে এক হিন্দি জানা লোককে দিয়ে পড়ায়। তখনই সব ফাঁস হয়ে যায়। কিন্তু এখন। আমরা লোককে মুখ দেখাই কী করে? রাগে আমি ভিতরে-ভিতরে জ্বলে যাচ্ছিলাম। বসন্ত চট্টোরাজ তার ছাতাটা ফেলে গেছে। আমি ঠিক করে রেখেছি, ছাতাটা কাল ভেঙেচুরে পুকুরে বিসর্জন দেব।
রেবা ডাকল, দাদা!
কী?
সবাই লোকটাকে অমন করে মারল কেন রে?
আমি গর্জন করে উঠি, মারবে না? কত বড় সর্বনাশ করেছে আমাদের জানিস?
রেবা মৃদুস্বরে বলল , জানি। তারপর একটু চুপ করে থেকে রেবা আপনমনে একটা হিসেব করতে-করতে বলল , তোকে নিয়ে লোকটার চারটে ছেলে, কিন্তু মেয়ে নেই। মেয়ে বলতে একমাত্র আমি। তাই না? লোকটা তাই আমাকে ভীষণ ভালোবাসত। চলে যাওয়ার সময় কী বলল রে?
আমি অবাক হয়ে বলি, কী সব বলছিস? চুপ কর।
রেবা অনেকক্ষণ চুপ করে মটকা মেরে পড়ে রইল। তারপর হঠাৎ ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আমি ওর চুল টেনে বললাম, কী হয়েছে বলবি তো?
রেবা কান্না জড়ানো গলায় হেঁচকি তুলে বলল , সবাই মিলে কেন অমন করে মারল বাবাকে? কেন মারবে এরা? কেন আমার বাবাকে সবাই মারবে?
বিয়ের রাত
আচ্ছা মশাই, আত্মবিশ্বাস জিনিসটা আসলে কীরকম বস্তু তা বলতে পারেন?
বলা কঠিন। তবে যতদূর মনে হয় লোহার রডের মতো একটা শক্ত জিনিস মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে ঠেলে মাথা অবধি ওঠে। তাতে হয় কি, ঘাড়–গর্দান সব সোজা থাকে, মাথাটাও সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে না। আমাদের পটলবাবুকে তো দেখেছি, সবসময়ে যেন খাড়া হয়ে আছেন।
তাই হবে। ওই রডটা আমার নেই।
বেশিরভাগ লোকেরই থাকে না। রেয়ার জিনিস হলেই সাপ্লাই কম হয়। খুঁজে দেখেছি আমারও নেই।
দুজনেরই দুটো দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
আত্মবিশ্বাস জিনিসটা খুব কাজের জিনিস, কী বলেন?
খুব। তবে না হলেও যে চলে না তা নয়। এই ধরুন ফ্রিজ। থাকলে খুব ভালোবাসি স্যাঁতা সব জমিয়ে রাখা যায়, তিন-চারদিন রান্না না চাপালেও চলে। চমৎকার কাজের জিনিস। কিন্তু ধরুন, যাদের নেই তাদেরও কি চলে না?
তা অবিশ্যি ঠিক।
আপানার যা–যা নেই তার একটা লিস্টি তৈরি করে ফেলুন। ধরুন, আত্মবিশ্বাস নেই, সাহস নেই, বিবেক নেই, বিবেচনা নেই, শক্তি নেই, বুদ্ধি নেই, মেধা নেই, জেদ নেই, উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, স তো নেই, চরিত্র নেই, ব্যক্তিত্ব নেই, স্মার্টনেস নেই, অনুভূতি নেই, কল্পনাশক্তি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। নেই-এর একটা লিস্টি থাকলে কী-কী আছে তার একটা হদিস বেরিয়ে আসবে। ডেবিট ক্রেডিটের মতোই। তাতে হবে কি, অল্পসল্প যা আছে তাই দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়ার একটা সুলুকসন্ধান করতে সুবিধে হবে।
