এ সময়ে মামিরা সেজেগুঁজে এসে বাবাকে পাকড়াও করে ভিতরবাড়িতে নিয়ে গেল। বাবা সব ব্যাপারেই খুব হাসছে। দাড়িটাড়ি কামিয়ে স্নান করে আসার পরও বাবার চেহারা তেমন কিছু খোলতাই হল না। তবে দেখলাম, লোকটা মোটা হলেও উঁড়িওলা মোটা নয়। রীতিমতো পালোয়ানি স্বাস্থ্য। আমি টারজান ইত্যাদি বীরদের পরম ভক্ত। বাবার সেই টারজানি চেহারা দেখে দুঃখটা একটু কমল। কিন্তু রেবা তো টারজান চায় না। চাইলেও সে ফরসা টারজান নয়, সুন্দর টারজান চায়।
দুপুরে যখন সবাই বিশাল ভোজে বসেছি তখন বাড়ির বুড়ো চাকর খুঁজে-খুঁজে কোত্থেকে যেন রেবাকে ধরে নিয়ে এল। তার মুখচোখ লাল, গম্ভীর, চোখের কোলে অনেক কান্নার চিহ্ন। কারও দিকে তাকাচ্ছে না।
দাদামশাই হাঃ হাঃ করে হেসে বাবাকে বললেন, কী হে বসন্ত, মেয়েকে চিনতে পারো?
বাবা রেবার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ, সশ্রদ্ধ। গরাস গিলে আবার খুব হাসল। তারপর উদ্বেগের গলায় বলল , খুঁকিকে কেউ মারল নাকি? আঁ!
রাত জেগে গাড়িতে এসেছে বলে খাওয়ার পরই বাবাকে আলাদা করে কোণের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হল। তার প্রচণ্ড নাক ডাকতে লাগল।
আমরা দুই ভাই-বোন পরামর্শ করতে বসলাম। এই লোকটাকে নিয়ে এখন আমরা কী করব? লোকটা সুন্দর নয়, সেটা না হয় মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু ওই উজবুকের মতো কথাবার্তা! ওই হিন্দিমেশানো বুলি! ওই বোকা–হাবা গোবেচারা ভাব। চোখে ওই চোর-চোর অপরাধী–অপরাধী চাউনি। আমাদের চাকর লক্ষ্মণদাও যে ওর চেয়ে চালাক চতুর।
রেবা মাথা নেড়ে বলল , আমি কিছুতেই বাবা বলে ডাকতে পারব না।
তবে কী বলে ডাকবি? বসন্তবাবু?
ইঃ বাবু বলতে গেছি কিনা! একটুও বাবুর মতো চেহারা নয়। দেখলেই মনে হয়, কারও বাড়ির চাকর।
এ ব্যাপারে শুধু আমরা দুই ভাইবোনই নয়, মামা–মামিরাও একমত। এমনকী দুই মামি পর্যন্ত হাসাহাসি করছে আড়ালে। জামাই বোকা, জামাই গেঁয়ো, জামাই কালো। সেসব শুনে আমাদের আরও মন খারাপ হয়ে গেল।
শুধু মা’র মুখচোখেই একটা চাপা আনন্দের আভা। চোখ দুটো উজ্জ্বল, ফরসা মুখে রক্ত ফেটে পড়ছে যেন।
বিকেলে আমাদের মালি খেত কোপাচ্ছিল। বাবা গিয়ে মালির হাত থেকে কোদাল নিয়ে এক চোপাটে অনেকটা জায়গা কুপিয়ে মস্ত-মস্ত মাটির চাংড়া তুলে ফেলল। আমরা বাবার কাণ্ড দেখছিলাম দাঁড়িয়ে। বাবা লাজুক হেসে আমাকে বলল , মাটি কোপালে একসারসাইজ হয়। ভুখ। লাগে। তুমি মাটি কোপাও না?
আমি মাথা নেড়ে বলি, না।
কোপালে ভালো হয়। কসরত না করলে কি শরীরে তাগত হয়?
দিন দুইয়ের মধ্যে বাবার সঙ্গে আমার একটু-একটু ভাব হয়ে গেল। রেবা অবশ্য বাবার কাছে একদমই ঘেঁষত না। কিন্তু আমাকে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করত, লোকটা কী বলছে রে? আমার কথা কিছু জিগ্যেস করে? বাস্তবিকই বাবা রেবার কথা জিগ্যেস করত। বলত, রেবা আমার কাছে আসে না কেন বলো তো! আমি কালো বলে নাকি?
হাঃহাঃ। মেয়েটা খুব সুন্দর হইছে তো।
আমি সে কথা রেবাকে বললে রেবা একটু যেন খুশি হত।
মা আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিল ঠিকই। কিন্তু মুখে কিছু বলত না। তৃতীয় দিনে মা রেবার হাতে এক গ্লাস দুধ দিয়ে বলল , তোর বাবাকে দিয়ে আয়।
ভয়ে মায়ের মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারল না রেবা। আস্তে-আস্তে গিয়ে বাবার সামনে গ্লাসটা রেখে ‘এই যে আপনার দুধ’ বলেই দৌড়ে পালিয়ে গেল।
বাবার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল করে তোলার জন্য মা আমাদের কাছে তার অনেক গুণের কথা বলত। আসলে বসন্ত চট্টোরাজ খুব সৎ মানুষ। দাদামশাইয়ের কাছ থেকে যে পঁচিশ হাজার টাকা উনি নিয়েছিলেন তা শোধ দেওয়ার পর উনি এ-বাড়িতে পা দিয়েছেন। উনি মহারাষ্ট্রে গিয়ে প্রথম কুলিগিরি করেন, ডকে কাজ করেন। অমানুষিক কষ্টে ধীরে-ধীরে নিজের একটা ব্যাবসা দাঁড় করিয়েছেন। ইত্যাদি।
আমি মাকে জিগ্যেস করলাম, আমরা কি বাবার সঙ্গে ইগতপুরী চলে যাব?
মা বলল , যেতে তো হবেই। তবে উনি এবারে আমাদের নেবেন না। কয়েক মাস পরে এসে নিয়ে যাবেন। ওখানে আমাদের বাড়িটা তৈরি হচ্ছে। সেটা শেষ হলেই যাব।
রেবা জেদ করে বলল , আমি যাব না। আমার এ জায়গাই ভালো।
মা বড় বড় চোখে রেবার দিকে চেয়ে বলল , এটা তোমাদের আসল বাড়ি নয়। বড় হলে বুঝবে মামাবাড়িতে চিরকাল থাকা যায় না। থাকা ভালো না। মামার বাড়িতে মানুষ হওয়াটা অমর্যাদার।
পরদিনও রেবা বাবাকে গিয়ে এই যে আপনার দুধ বলে দুধ দিয়ে এল। কিন্তু দৌড়ে পালিয়ে এল না। আস্তে-আস্তে এল।
আমার সঙ্গে আরও ভাব করার জন্যই বোধহয় বাবা একদিন আমাকে বলল , খোকা, তোমার বইপত্র সব নিয়ে এসো তো দেখি, কেমন পড়িলিখি করছ।
অগত্যা আমি বইপত্র নিয়ে তার কাছে গেলাম। বাবা অবশ্য পড়াল না। কাছে বসিয়ে আমার পিঠে অনেক হাত বুলিয়ে দিল আর মহারাষ্ট্রে কী-কী পাওয়া যায় তার গল্প করতে লাগল।
আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল। বললাম, রেবাকে বই নিয়ে আসতে বলি?
বাবা আঁতকে উঠে বলল , উ বাবা! উকে আমি খুব সামঝে চলি। উ তো আমাকে জাম্বুবান বলে ভাবে কিনা। ভাবে, বুঝি জঙ্গল থেকে আসছি। এই বলে খুব হাঃহাঃ করে হাসল বাবা।
রেবা না পারলেও আমি কিন্তু আস্তে-আস্তে বাবাকে বাবা বলে মেনে নিতে পারছিলাম। লোকটা দারুণ ভালো, খুব সরল, প্রাণভরা মায়াদয়া আর ভালোবাসা। চেহারাটা টারজানের মতো হলেও লোকটা পিপড়েকেও মারতে জানে না।
