করেছে নাকি কাশীনাথ? প্রাণরক্ষে করা কি সোজা কথা? প্রাণ বাঁচানোর মালিক ভগবান। সে কিছু লোককে বানভাসি এলাকা থেকে তুলে এনে ডাঙাজমিতে পৌঁছে দিয়েছে মাত্র। তারা যে কীভাবে এরপর বেঁচে থাকবে, তা সে জানে না।
কাশীনাথ টর্চের আলোর দিকে চেয়ে বলল, ভাঙড়ের দিকে যাচ্ছিলাম বাবু, তা শরীরে বড় মাতলা ভাব। তাই–
বুঝেছি। বলি দানাপানি কিছু পেটে পড়েছে?
ওসব তো ভুলেই গেছি। কার-ই বা দানাপানি জুটছে বলুন। সব দাঁতে কুটো চেপে শুধু ডাঙা খুঁজছে।
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাই বটে হে। লোকের দুর্দশা দেখলে আঁত শুকিয়ে যায়। নয়াবাঁধে তবু আমরা কিছু চিড়ে-গুড় আর খিচুড়ির ব্যবস্থা করেছি। দিন দুই হয়তো পারা যাবে। রিলিফ না এলে তারপর কী যে হবে কে জানে।
কাশীনাথের পায়ে অন্তত গোটাসাতেক জোঁক লেগেছে। সে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সেগুলোকে উপড়ে ফেলতে ফেলতে বলল, সে আর ভেবে কী হবে? কিছু তো মরবেই।
তা বাপু বলি কী, তোমার পরিবার-পরিজন সব কোথায়?
কেউ নেই বাপু। আমি একাবোকা মানুষ।
ঘরদোর?
ওলাইচন্ডীতে আছে একখানা কুঁড়ে। তা সেটাও বন্যার তোড়ে ফি বছর ভেসে যায়। এবারেও গেছে। এখন নৌকাই ঘরবাড়ি বাবু।
লোকটা একটু হাসল। বলল, আমাকে চেন? আমি হলাম নয়াবাঁধের সাধুচরণ মন্ডল।
কাশীনাথ তটস্থ হয়ে বলল, বাপ রে! আপনি তো মস্তমানুষ বাবু।
হেঁ হেঁ। নামটা শোনা আছে তা হলে।
খুব খুব। তল্লাটের কে না চেনে বলুন?
আমি একটু মুশকিলে পড়েছি যে, কাশীনাথ। তোমাকে যে পেলুম তা যেন ভগবানের আশীর্বাদে। বলছিলুম কী, মংলাবাজার চেন?
খুব চিনি। নিত্যি যাতায়াত।
সেইখানে কয়েকজনকে পৌঁছে দিতে হবে। নয়াবাঁধে এসে আটকে পড়েছে। এই সাংঘাতিক স্রোতে নৌকো ছাড়তে রাজি হচ্ছে না মাল্লারা।
তা স্রোত আছে বটে!
তোমার মতো একজন ডাকাবুকো লোকই খুঁজছিলাম আমি। যদি পৌঁছে দিতে পারো তবে ভালো বকশিশ পাবে।
বকশিশের কথায় কাশীনাথ হেসে ফেলল। হাতজোড় করে বলল, এ তো ভগবানের কাজ বাবু। বকশিশ কীসের? ওসব লাগবে না।
বলো কী? পয়সা হল লক্ষ্মী। তাকে ফেরাতে আছে?
অতশত জানি না বাবু। তবে এ-সময়টায় পয়সার ধান্দা করতে মন সরছে না। মানুষের যা-দুর্দশা দেখছি। আমি পৌঁছে দেবখন।
তা হলে এসো, আমার বাড়িতে চাটি ডালভাত খেয়ে নাও। শরীরের যা-অবস্থা দেখছি, না খেলে পেরে উঠবে না।
ঠিক আছে, চলুন।
সাধুচরণের বাড়িখানা বিশাল। প্রকান্ড উঠোনের তিনদিক ঘিরে দোতলা বাড়ি। পাঁচ-সাতখানা হ্যাজাক জ্বলছে। উঠোনে ত্রিপলের নীচে বড়ো বড়ো কাঠের উনুনে মস্ত লোহার কড়াইতে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। চারদিকে মেলা লোকলশকর, মেলাই চেঁচামেচি। বৃষ্টির মধ্যেই বাঁশে ঝুলিয়ে খিচুড়ির বালতি নিয়ে লোক যাচ্ছে, পেছনের উঠোনে বানভাসিদের খাওয়াতে।
সাধুচরণ তাকে নিয়ে ঘরে বসাল। বলল, গা মুছে নাও। বড্ড ধকল গেছে তোমার হে। শুকনো কাপড় পরবে একখানা?
কাশীনাথ হাসল, তাতে লাভ কী?। আমাকে তো ঝড়ে-জলে বেরোতেই হবে।
তাই তো।
দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই শালপাতা আর গরম ভাতের হাঁড়ি চলে এল।
সাধুচরণ বলল, তোমাকে ওই লঙ্গরের খিচুড়ি খাওয়াচ্ছি না বাপু।
কাশীনাথ তার খাতির দেখে একটু অবাকই হচ্ছে।
পেটে রাক্ষুসে খিদে ছিল, কিন্তু ভাতের গ্রাস মুখ পর্যন্ত পৌঁছোতেই কেমন গা গুলিয়ে উঠল তার। মনে হল, এই খাওয়ানোটার ভেতরে একটা অহংকার আছে।
খাও খাও, পেট পুরে খাও হে।
ডাল, ভাত, ঘ্যাঁট এবং পুঁটি মাছের ঝোল–আয়োজন খারাপ নয়। কিন্তু কাশীনাথ পেট পুরে খেতে পারল কই? কত মানুষের উপোসি মুখ মনে পড়ল। কত বাচ্চার খিদের চেঁচানি। ঘটির জলটা খেয়ে সে উঠে পড়ল। পাতে অর্ধভুক্ত ভাত-মাছ পড়ে রইল। পাতাটা মুড়ে নিয়ে সে বেরিয়ে এসে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঘটির জলে আঁচিয়ে নিল।
সাধুচরণ কোথায় গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল, এই অন্ধকারে তো আর মংলাবাজার যেতে পারবে না। বারান্দার কোণে চট পেতে দিতে বলেছি। শুয়ে ঘুমোও। কাল সক্কালবেলা বেরিয়ে পোড়ো।
এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হয় না। সে বলল, যে আজ্ঞে।
তারপর চটের বিছানায় হাতে মাথা রেখে মড়ার মতো ঘুম।
কাকভোরে ঘুম ভাঙল। বাড়ি নিঃঝুম। এখনও আলো ফোটেনি। সে বসে আড়মোড়া ভাঙল। গা-গতরে ব্যথা হয়ে আছে। তবে কালকের চেয়ে অনেক তাজা লাগছে। অনেক জ্যান্ত। সে উঠে পড়তে যাচ্ছিল, একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল। কিশোরী মেয়ে, পরনে একখানা হাঁটুঝুল ফ্রক। আবছা আলোয় যতদূর দেখা গেল, মেয়েটি রোগাটে।
তুমিই আমাকে মংলাবাজারে নিয়ে যাবে?
তা তো জানি না। সাধুচরণবাবু বললেন, কাদের যেন পৌঁছে দিতে হবে।
আমাকে আর পিসিকে।
তা হবে।
পিসি পোঁছোবে। কিন্তু আমি জলে ঝাঁপ দেব। আমাকে বাঁচাতে পারবে না।
কাশীনাথ হাঁ করে মেয়েটার মুখের দিকের চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, জলে ঝাঁপ দেবে। কেন?
মরব বলে।
মরার-ই বা এত তাড়াহুড়ো কীসের?
সব কথা বলার সময় নেই। তবে এটুকু জেনো, আমি জ্যান্ত অবস্থায় মংলাবাজারে যাব না। সারারাত জেগে বসে ওই জানলা দিয়ে তোমাকে লক্ষ করেছি, কখন ঘুম ভাঙে।
তুমি কি সাধুচরণবাবুর কেউ হও?
আমি ওঁর ছোটোমেয়ে বিলাসী।
বটে। তাহলে তোমার দুঃখু কীসের? মরতে চাইছ কেন?
সে অনেক কথা। কাল রাতে নয়নের সঙ্গে আমার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বন্যা হয়ে সব ভেস্তে গেল। বাবা টের পেয়ে আমাকে মংলাবাজারে মামাবাড়িতে পাচার করতে চাইছে। বিয়েও ঠিক করে ফেলেছে।
