এ তো সাংঘাতিক ঘটনা।
তাই বলে রাখছি তোমাকে, আমি কিন্তু মরব। তুমি কিন্তু দায়ী হবে।
আমাকে কী করতে বলছ?
বললে শুনবে?
বলেই দ্যাখো-না।
গোবিন্দপুর চেন?
কেন চিনব না?
আমাকে সেখানে পৌঁছে দাও।
সেখানে কী আছে?
ওটাই নয়নের গাঁ। কাছেই। বন্যা না হলে আধঘণ্টা হাঁটলেই পৌঁছোনো যেত।
কাশীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, গোবিন্দপুরের অবস্থা কী তা জানি না। যদি ডুবে গিয়ে থাকে তাহলে তোমার নয়ন কি আর সেখানে বসে আছে?
তবু আমাকে যেতে হবে। এ-বাড়ি থেকে না পালালে, আমি বাঁচব না।
তারপর আমার কী হবে জান? সাধুচরণবাবু আমাকে আস্ত রাখবেন কি? মস্ত লোক, চারদিকে নামডাক। লোকলশকর, থানা-পুলিশ সব তাঁর হাতে।
আমার হাতে এই সোনার বালাটা দেখছ। তিন ভরি। আমার দিদিমা দিয়েছিল। এটা তোমাকে দিচ্ছি।
পাগল। ওসব আমার দরকার নেই।
মা শীতলার দিব্যি, আমায় যদি না নিয়ে যাও।
উঃ, কী মুশকিল!
শুনেছি তুমি নাকি খুব সাহসী লোক। অনেকের প্রাণ বাঁচিয়েছ। আমাকে বাঁচাতে পারবে না? এমন কী শক্ত কাজ?
তুমি নয়নের কথা ভেবে দুনিয়া ভুলে বসে আছ। আমার তো তা নয়। আমাকে যে আগুপিছু ভাবতে হয় গো!
হঠাৎ মেয়েটা ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে শুরু করল।
কী মুশকিল!
পায়ে পড়ি, আমাকে নিয়ে চলো। আমার যে বুকটা জ্বলে যাচ্ছে।
দ্যাখো বিলাসী, যদি ধরো তোমাকে গোবিন্দপুর নিয়েই যাই, তা না-হয় গেলুম। কিন্তু যদি নয়নকে খুঁজে পাওয়া না যায়, তখন তোমাকে ঘাড়ে করে আমি কোথায় কোথায় ঘুরব?
ঘুরতে হবে না। যেকোনো ঘাটে নামিয়ে দিয়ো। আমি ভিক্ষে করে হোক, দাসীগিরি করে থোক, চালিয়ে নেব। বন্যার জল নামলে ঠিক নয়ন এসে আমাকে নিয়ে যাবে।
আর ইদিকে আমার হাতে হাতকড়া?
তোমার কিচ্ছু হবে না, দেখো। মা শীতলা তোমার ভালো করবেন।
ভগবান তখনই ভালো করেন, যখন আমরা ভালো করি। বুঝলে?
তোমার পায়ে পড়ি।
বড্ড মুশকিলে ফেললে।
নইলে যে আমি মরব।
কাশীনাথ মৃদু স্বরে বলে, সে তোমার কপালে লেখাই আছে।
চলো-না। লোকজন উঠে পড়লে যে আর হবে না।
ঠিক আছে। চলো। রাবণে মারলেও মারবে, রামে মারলেও মারবে।
ভোর-ভোর নৌকা ছাড়ল কাশীনাথ।
মেয়েটা উলটো দিকে বসা। তাকে বইঠা ধরিয়ে লগি দিয়ে অগভীর জলে নৌকা ঠেলে নিচ্ছে। একটু তাড়াহুড়োই করতে হচ্ছে। লোকজন টের পেলে তাড়া করবে। কাশীনাথের ঘাম হচ্ছে খুব।
ডাঙাপথে গোবিন্দপুর যতটা দূর, জলপথে তত নয়। সাঁ করেই চলে এল তারা। সুপুরি, নারকেল গাছ, কয়েকটা দালানের ওপর দিকটা ছাড়া গোবিন্দপুর গাঁ নিশ্চিহ্ন।
দেখলে তো, কী বলেছিলাম?
মেয়েটা তার পুঁটুলি কোলে নিয়ে হাঁ করে দৃশ্যটা দেখছে। দু-চোখে জলের ধারা।
এবার কী করবে বলো।
মেয়েটা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। কিশোরী মুখখানি এখন ভোরের আলোয় পদ্মফুলের মতো সুন্দর দেখাল। কান্নায় ভরাট গলায় বলল, কোথাও নামিয়ে দাও আমায়, যেখানে খুশি।
কাশীনাথ একটু ভেবে বলল, শোনো মেয়ে, নামিয়ে দিলে তোমার বিপদ হবে। তার চেয়ে চলো, আমি ভাঙড়ে যাচ্ছি কিছু লোককে তুলে আনতে। তাদের পোঁছোতে পৌঁছোতে বেলা মরে যাবে। তারপর তোমাকে সাঁঝের পর বরং নয়াবাঁধেই নামিয়ে দেব। বাড়ি চলে যেয়ো।
বাবা আমাকে মেরেই ফেলবে।
দু-চার ঘা মারবে হয়তো। কিন্তু আবার ভালও বাসবে। বাড়ি হল আশ্রয়। আমাকে দ্যাখো-না, আমি এক লক্ষ্মীছাড়া। ভাববার কেউ নেই।
মেয়েটা গুম হয়ে বসে রইল।
নয়ন ভাঙড়ে গেল। বানভাসি লোক তুলল। তাদের পৌঁছে দিল ডাঙা-জমিতে। রায়চকে আজ রিলিফের খিচুড়ি দিচ্ছিল। বিলাসীকে নিয়ে নেমে পড়ল কাশীনাথ। বলল, চাট্টি খেয়ে নাও। আর জুটবে কি না কে জানে!
মেয়েটা আপত্তি করল না। খিচুড়িও খেল পেট ভরে। তারপর বলল, জানো, আমি এভাবে লঙ্গরখানায় বসে খাইনি কখনো। আমার বেশ লাগছে। মানুষের কী কষ্ট, তাই-না?
খুব কষ্ট?
কাছেপিঠে থেকে আরও দুটো খেপ মেরে কিছু লোক এনে ফেলতে হল কাশীনাথকে। সঙ্গে সারাক্ষণ বিলাসী।
কেমন লাগছে?
খুব ভালো লাগছে, কষ্টও হচ্ছে। একটা কথা বলব?
কী?
আমি নয়নের দেখা পেয়েছি।
অ্যাঁ! কোথায় দেখা পেলে? বলোনি তো!
রায়চকে। আমাকে দেখে তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
বললে না কেন? ধরে আনতাম।
মাথা নেড়ে বিলাসী বলে, তাকে আমার আর দরকার নেই যে!
সে কি! তার জন্যই-না বিপদ ঘাড়ে করে বেরিয়ে এলে!
সে এসেছিলুম। এখন এত মানুষ আর তাদের কষ্ট দেখে মনটা অন্যরকম হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে নয়নও আমাকে চায় না।
বাঁচালে। তা হলে চলো নয়াবাঁধে তোমাকে রেখে আসি।
বিলাসী ঘাড় হেলিয়ে বলল, হ্যাঁ।
নৌকা বাইতে বাইতে কাশীনাথ বলল, বাবার মারের আর ভয় পাচ্ছ না?
বিলাসী আনমনে দূরের দিকে চেয়ে থেকে বলল, বাবা আর কতটুকু মারবে? ভগবান যে তার চেয়েও কত বেশি মেরেছে এত মানুষকে!
কাশীনাথ একটু হাসল।
বাবা
সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠেই দিদিমার কাছে শুনলাম, বহুকাল পরে আমাদের বাবা এসেছে। শুনেই হুড়মুড় করে আমরা দুই ভাই, বোন উঠে পড়লাম। তারপর ছুট লাগালাম বাইরে।
আমাদের বাস গঞ্জে, মামাবাড়িতে। বাড়িটা একটু খোলামেলা, গাছপালা আছে। বারবাড়িতে একটা কদমগাছের তলা দাদামশাই গোল করে বাঁধিয়ে নিয়েছেন। বিকেলে এখানে দাদামশাইয়ের আড্ডা বসে।
সেই বাঁধানো জায়গাটায় গাছের মোটা কালো মতো একটা লোক বসে আছে। তার উঁড়ো গোঁফ, মাঝখানে সিঁথি, ছোট কুতকুতে চোখ। পরনে মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি, ধুতি, পায়ে বিশাল জুতো। পাশে স্যুটকেস, শতরঞ্জিতে বাঁধা বিছানা আর একটা ছাতা। এই শীতকালেও লোকটা বেশ ঘেমেছে। মাকে জন্মে ঘোমটা মাথায় দিতে দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম, মা মাথায় ঘোমটা টেনে লোকটাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে।
