অন্ধের মতো তিতির উঠে অন্ধকার ঘরে ঘুরতে থাকে। ঘরের একধারটা ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, বাতাসে। ওই রন্ধ্রপথে বারবার বাহির চলে আসে ঘরের মধ্যে। ঘরটাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় বাইরে। আব্রু নষ্ট করে। অমিতকেও কি নিয়ে গেল?
ককিয়ে কেঁদে ওঠে তিতির। ও একটু আগেই বলেছিল, ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ওর চলে যেতে ভালো লাগে। তিতির ভীষণ চিৎকার করে বলে—এত তাড়াতাড়ি আমার সব কেড়ে নিও না। ওগো, কে তুমি বারবার আসো ঘরের মধ্যে? দয়া করো।
মস্ত ঘরের এককোণে একটু ছোট্ট দেশলাই কাঠির তিনকোণা আগুন জ্বলে ওঠে। অমিত বলে —তিতির, আমিও তোমাকে খুঁজছি। এয়ারকুলারটা বন্ধ করে দিয়েছ, দমবন্ধ লাগছিল, তাই একটা পাল্লা খুলে দিয়ে বসে আছি।
—ডাকোনি তো! তিতির চোখ মুখে, কান্না গিলে হেসে ফেলে।
অমিত চুপ করে থাকে। তারপর বলে–সবসময়ে ডাকতে নেই তিতির। মানুষের মাঝে মাঝে একদম একা হওয়া দরকার। আমিও দেখোনা, একা বসে ঝড় দেখছি কখন থেকে!
তিতির কাছে গিয়ে বলে—কেন গো?
—ওঃ তিতির। কী প্রকাণ্ড এই আকাশ, কী বিরাট শূন্যতা চারদিকে। আর কী ভয়ংকর শক্তিমান ঝড়। এ-সব দেখলে নিজেকে তুচ্ছ লাগে বড়। মাঝে-মাঝে, নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে কী যে আনন্দ হয়!
বানভাসি
পরশুদিন দুপুরে ভাত জুটেছিল। আর আজ এই রাতে। হিসেবে দু-দিন দাঁড়ায়। তবে খিদেটিদে উবে গিয়েছিল জলের তোড়ে তল্লাট ভেসে যেতে দেখে। পরশু থেকে আজ অবধি কাশীনাথ তার নৌকায় কতবার যে কত জায়গায় খেপ মেরে লোক তুলে এনেছে তার লেখাজোখা নেই। রায়চক উঁচু ডাঙা জমি, এইরকম দু-একটা জায়গা ডোবেনি। এখন সেইসব জায়গায় রাসমেলার ভিড়। খোলামাঠেই বৃষ্টির মধ্যে বসে আছে মানুষ। কেউ কেউ মাথার ওপর কাপড়-টাপড় টাঙিয়ে মাথা বাঁচানোর একটা মিথ্যে চেষ্টা করছে। কেউ বাচ্চাটাচ্চাদের মাথায় ছাতা ধরে আছে সারাক্ষণ। তাতে লাভ হচ্ছে না। ভিজছে, সব ভিজে সেঁধিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। এরপর মরবে।
রিলিফ এলে অন্যকথা। কিন্তু তাই-বা আসবে কোন পথে। রেল বন্ধ, সড়ক বন্ধ, চারদিকে অথই জল।
কুলতলি থেকে একটা পরিবারকে তুলে এনে রায়চকে নামিয়ে ভাঙড়ে যাচ্ছিল আরও কিছু লোককে তুলে আনতে। শরীর নেতিয়ে পড়ছে, হাত চলতে চাইছে না, কেমন যেন আবছা দেখছে সে। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম। কাশীনাথ বুঝতে পারছিল আর বেশিক্ষণ নয়। দু-দিন পেটে দানাপানি নেই। জুটবেই-বা কোথা থেকে। কাল দুপুরে এক বুড়ি তাকে দু-গাল চালভাজা খাইয়েছিল। আর রায়চকের বাজারে টিউবওয়েল থেকে পেটপুরে জল। সেই কয়লাটুকুতেই শরীরে ইঞ্জিন চলছিল এতক্ষণ। আর নয়। কিন্তু নেতিয়ে পড়লেও চলবে না। বড়োড্যামের জল ছেড়েছে, তার স্রোতে নৌকা না সামলালে উলটে যাবে। নয়তো কোনো আঘাটায় গিয়ে পাথরে বা গাছে ধাক্কা মেরে নৌকা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। এই নৌকা এখন মানুষের জীবনতরী। ডুবলে চলে?
ঘুমও আসছিল তার। আর বার বার ঢুলে পড়ছিল। বইঠা বা লগির ওপর হাত থেমে থাকছে বার বার। ফের চমকে জেগে উঠছে। নয়াবাঁধের কাছে নৌকাটা একটু ভিড়িয়ে কয়েক মিনিটের জন্য চোখ বুজে ঘুমের আলিস্যিটা ছাড়াতে গিয়েছিল সে। যখন চোখ মেলল তখন রাত হয়ে গেছে। গোলাগুলির মতো বৃষ্টির ফোঁটা ছুটে আসছে আকাশ থেকে। ঝলসাচ্ছে মারুনে বিদ্যুৎ।
জামাটা খুলে নিংড়ে নিল কাশীনাথ। ভাঙড়ে এই দুর্যোগে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। নৌকা ডুববে। সে কোমরজলে নেমে নৌকার বাঁধনটা অন্ধকারেই একটু দেখে নিল। বটগাছের শিকড় শক্ত জিনিস। পাটের মোটা কাছিও মজবুত। নৌকা আর যাবে না। তবে নৌকার খোলে জল উঠেছে অনেক। ফের নৌকা ভাসাতে হলে জল হেঁচতে হবে। আপাতত জলেই ডুবে থাক। ভাসন্ত বানে নৌকার ওপর মানুষের খুব লোভ। জলে ডুবে থাকলে–আর যাইহোক চুরি যাবে না।
বৃষ্টিকে ভয় খেয়ে লাভ নেই। জলে তার সর্বাঙ্গ ভিজে সাদা হয়ে আছে। সে নেমে পাড়ে উঠল। নয়াবাঁধ। চেনা জায়গা। দু-পা এগোলেই হাটের অন্ধকারে কয়েকটা চালাঘর। সেখানে এণ্ডিগেণ্ডি নিয়ে বানভাসি মানুষের ভিড়। তারপর বসতি, চেনাজানা কেউ নেই এখানে। তার দরকারও নেই। সে বটতলা থেকে আর এগোল না। একটা মোটা শিকড়ের ওপর বসে পড়ল। ঘুম নয়, একটু ঝিমুনি কাটানো দরকার।
ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ মুখের ওপর জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল, কে রে? কে ওখানে?
চমকে সোজা হল কাশীনাথ। সামনে ছাতা মাথায় কয়েকজন লোক। অন্ধকারে ভালো ঠাহর হল না, তবু আন্দাজে বুঝল, এলেবেলে লোক নয়।
কাশীনাথ কী বলবে ভেবে পেল না। সে কাশীনাথ, কিন্তু এর বেশি তো আর কিছু নয়।
তা সেটা তো আর দেওয়ার মতো কোনো পরিচয়ও নয় তার।
কাশীনাথ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এই একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম আজ্ঞে। চোর-ছ্যাঁচড় নই, নৌকা বাই।
মাছ ধরো?
আগে ধরতুম। এখন হাটেবাজারে মাল নিয়ে যাই।
কে একজন চাপা গলায় বলল, ওলাইচন্ডীর কাশীনাথ।
সামনের লোকটা বলল, ও, এই কাশীনাথ।
কাশীনাথ খুব অবাক হল। এরা তাকে চেনে! কী করে চেনে? তাকে চেনার কথাই তো নয়।
তোমার নৌকো কোথায়?
বটগাছে বেঁধে রেখেছি। শরীরে আর দিচ্ছিল না বলে। একটু ডাঙায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম বাবু। দোষ হয়ে থাকলে মাপ করে দেবেন। না-হয় চলেই যাচ্ছি।
আরে না না, দোষের হবে কেন? তবে এটা কি আর জিরোনোর জায়গা? তুমি তো মেলা লোকের প্রাণ রক্ষে করেছ হে বাবু।
