—দেব না-ই তো!
—জানি। বড্ড রুটিন হয়ে গেছে জীবনটা।
রুটিন না হলে চলে? তোমার কত কাজ! তিতির ওকে একটু আদর করে বলে। একটু ড্রিঙ্ক করেছিল অমিত। বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারল না। ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু তিতিরের আর ঘুম আসে না। সে উঠে এয়ারকুলার বন্ধ করে দিল। ঠান্ডা লাগছে।
একটু ধূসর পরদায় জানলাগুলো ঢাকা। পরদা নড়ছে না। কিন্তু বাইরে হুঙ্কার দিয়ে ফিরছে ঝোড়ো বাতাস। কাচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা এসে অবিরল টোকা দেয় গোপন প্রেমিকের মতো। তিতিরকে ডাকে।
উঠতেই হয় তিতিরকে। একটা বাজ পড়ল কোথায়। বাড়িটা তার অজস্র কাচের শার্সি নিয়ে ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। ঘুম আসবে না। এরকম ঝড়বৃষ্টির রাতেই ভালো ঘুম আসে লোকের, কিন্তু তার আসবে না।
তিতির পরদাটি সরিয়ে দেখে, কলকল করে জলস্রোত নেমে যাচ্ছে শার্সি বেয়ে। নীচে একটা ডাইনির শহরযত না তার আলো তত বেশি ভূতুড়ে অন্ধকার। বাড়ি-ঘর সব যেন নুয়ে গেছে, গাছপালা হয়ে গেছে কাল্পনিক গাছের ছবির মতো, আলোগুলো বৃষ্টিতে দিপদিপ করে। এত উঁচু থেকে সবই মনে হয় বড় দূরের। মাঝখানে শূন্য। আর এই গভীর রাত্রে শার্সি ভেদ করে সেই শূন্যটা ঘরের মধ্যে চলে আসতে থাকে।
বাতি জ্বেলে টিভি সেটটার মুখোমুখি বসে এসে তিতির। হাই তোলে। অমিতের জন্য একটা সোয়েটার বুনছিল, সেইটে নিয়ে বসে।
হাতিটা ভেজা গায়ে সামনে দাঁড়ানো, বলে—খুব সুখে আছ তুমি তিতির।
—হ্যাঁ হাতিভাই। কেবল ওই জানলার গরাদ লাগানো বাকি। সেটা হয়ে গেলে আর কী চাই!
—সেটা লাগাতে খুব বেশি দেরি কোরো না তিতির। কী জানি, কবে তোমাকে আমি চুরি করে নিয়ে যাই জানলা দিয়ে।
—ও কথা বোলো না হাতিভাই। আমি তো কোনও পাপ করিনি যে মরব। বরং এত সুখে থেকেও আমি কখনও আর দশজনের কথা ভুলি না। গত রবিবারে আমরা আমাদের ক্লাবের পক্ষ থেকে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিয়ে এলাম। শিরাতে চুঁচ ফুটিয়ে কত রক্ত বের করে নিল বলো তো! অনাথ আতুরদের জন্য যে ফান্ড খোলা হয়েছে তাতে আমরা প্রতি মাসে অনেক টাকা দিই, মাঝে-মাঝে কালেকশনে বেরোই। মূক-বধিরদের জন্য অন্ধদের জন্য, আমরা সব সময়েই ব্যথিত। যা পারি, যতখানি পারি করি। সুখী বলেই স্বার্থপর ভেবোনা আমাদের।
হাই উঠছে। ঘুমে ঢুলে আসছে চোখ। তবু ঘুমোতে গেলেই কী একটা হয়। এই ঝড় জলের রাতটা তার দুর্যোগ নিয়ে কেবলই ঢুকে আসে ফ্ল্যাটে। কেন যে এত বড় জানলা করেছে এ বাড়িতে। কোনও মানে হয় না। আকাশ ঢুকে পড়ে, বাতাস ঢুকে পড়ে। শূন্যতাও বেড়াতে আসে নির্লজ্জ প্রতিবেশীর মতো, এসে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তিতিরের সুখ-দুঃখের খতিয়ান নিয়ে যায়, বিশ্রী। অমিত কিছুতেই তিতিরের একটা কথা শুনতে চায় না। ও কি বোঝে না যে জানলায় একটা প্রতিরোধ দরকার! ভীষণ দরকার!
টিভি-র পরদাটা ঢালু, তার আলোহীন কাচে কোনও ছবি দেখা যায় না। কবে যে কলকাতায়। টিভি চালু হবে! শোনা যাচ্ছে, ওয়ার্ল্ড টেবিল টেনিস দেখাবে এবার। তাহলে কিছুদিনের জন্য বাঁচা যায়। স্নেহভরে একবার চমৎকার সেটটার দিকে চেয়ে থাকে তিতির।
হাতিটা এখনও যায়নি বুঝি! তিতিরকে ডেকে বলল-বলো তো সুখ কাকে বলে!
—সুখ! বলে তিতির ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবে। বলে কী জানি বাবা! তোমার সব শক্ত-শক্ত প্রশ্ন। তবে মনে হয়, যার কখনও পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে না, যে কখনও অতীত নিয়ে ভাবে না, অনুতপ্ত বা দুঃখিত হয় না, যে কেবল প্রতিটি বয়ে যাওয়া মুহূর্তকে অনুভব করে সেই সুখী।
উঠে ফের বাতি নিভিয়ে দেয় তিতির। বাইরে যে আজ কী প্রলয়কাণ্ড হচ্ছে! মাগো, গরিব দুঃখীদের বড় কষ্ট।
—তোমার কিছু মনে পড়ে না তিতির?
হাতিটা তবে এখনও যায়নি! তিতির ভ্রূ কুঁচকে বলে—ওঃ! হ্যাঁ চেষ্টা করলে আবছা সব মনে পড়ে। মনে পড়লে ভীষণ হাসি পায়।
–কীরকম?
—এই ধরো না, আমি একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করতাম। সে স্কুল ফাইনালে টেনথ হয়েছিল। তারপর আর কিছু হয়নি। মনে পড়ে খুব একটা প্রেম হয়েছিল। ভারী মজার নাম ছিল তার জোনাকি!
অন্ধকার হাতড়ে-হাতড়ে শোওয়ার ঘরের দিকে চলেছে তিতির। আর একা-একা খুব হাসছে। এত হাসি পায়। জোনাকি! কী নাম বাবা।
শাওয়ার ঘরে এসে একটু চমকে যায় তিতির। পরদাটা সরানো। মস্ত জানলা কে অমন। আদুড় করে দিল? বাইরে একটা ধূসর পাগলা ঝড়। মুহুর্মুহু কাচের শার্সিতে করাঘাত করছে এসে এক মহাশূন্য। বাতাস আকাশ। শার্সি জুড়ে এক বিশাল পরদার টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে এক মহাজগতের মহাপ্রলয়।
শিউরে ওঠে তিতির। ও মা! জানলার একটা ধারের ছোট্ট একটা পাল্লা কে কখন খুলে দিল। বৃষ্টির প্রবল ছাঁট আসছে, বাতাস ঘুর্ণির মতো পরদাটাকে ওড়াচ্ছে কোণের দিকটায়। তিতির জানলার কাছে দৌড়ে গেল। কিন্তু পাল্লার কাছে পৌঁছাতে পারল না। সেই আদিম পাগল ঝড়টা তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল—সরে যাও, সরে যাও, আমি তোমার ঘর তল্লাশি করতে এসেছি।
তিতির ভয় পেয়ে সরে আসে।
বিছানায় একটা হালকা চাদর গায়ে চাপা দিয়ে শুতে গিয়েই ফের ভীষণ চমকে ওঠে। অমিত কোথায় গেল?
—ওগো! বলে ভয়ার্ত তিতির উঠে বসে। কোনও উত্তর আসে না। বাইরে হোহো করে হেসে ওঠে বাতাস। আকাশ বাঘের মতো ডেকে ওঠে শিকার খুঁজে পেয়ে।
—কোথায় গেলে তুমি?
