খাকি হাফপ্যান্ট পরা লোকটা ছিল গায়ক। মোটাসোটা নাদুসনুদুস চেহারা, গালে পানের ঢিবি। বাবার একখানা লুঙ্গি পরে নিয়ে দিদির সিঙ্গল রিডের হারমোনিয়ামটা নিয়ে সে বারান্দায় চাঁদের আলোয় শতরঞ্চি পেতে বসে গাইতে লাগল–ভুলিনি, ভুলিনি, ভুলিনি প্রিয়, তব গান সে কি ভুলিবার…! বাবা শুনতে শুনতে আধশোয়া হয়ে চাঁদের দিকে চেয়ে উদাস হয়ে গেল। মা নতুন করে রাঁধতে বসেছে। সেই ফাঁকে দেখি উত্তরের মাঠে নালির ধারে শওকত আলি হ্যারিকেন জ্বেলে মুরগি জবাই করতে বসেছে। মুরগি কাটা দেখতে চুপে উঠে গেলাম। ভুলিনি… ভুলিনি… গানের সঙ্গে মুরগিটার প্রাণান্তকর ডাক মিশে যাচ্ছিল। আকাশে জ্যোৎস্নার বান।
লোকটার নাম আমরা দিলাম ডি ও সান্যাল। আমাদের বাড়ির অতিথিরা দু-রকমের ছিল। কিছু লোক ছিল যারা একবার এসে সেই যে চলে যেত, আর আসত না। আর কিছু লোক ছিল যারা ঘুরে-ফিরে আসত। এই লোকটাকে দেখে মনে হল, এ দ্বিতীয় দলের। কাজেই এর একটা নাম দেওয়া দরকার। বাবা তাকে সান্যাল, সান্যাল বলে ডাকে, নাম টের পাই না। সান্যাল আরও একজন আমাদের বাড়িতে আসে। সে ফোকলা। এ লোকটার দাঁত আছে তাই তার নাম দেওয়া হল, দাঁতঅলা সান্যাল। সংক্ষেপে ডি ও এস। ফোকলা জনের নাম এফ সান্যাল আগেই দেওয়া ছিল। পরদিন সকালে কোনো সময়ে যেন বাবার চটিজোড়ায় আমার পা লাগলে লোকটা বলল, খোকা, বাবার চটিতে পা লাগলে প্রণাম করবে। তারপর সে মার রান্নার প্রশংসা করল। আমাকে শংকরা আর বেহাগের পার্থক্য বোঝাতে লাগল। দু-দিন গানে গানে আমাদের মাথা গরম হয়ে রইল। কালীমাস্টারমশাই পর্যন্ত একদিন কামাই করলেন। তারপর লোকটা চলে গেল। শুনলাম সে যুদ্ধে যাচ্ছে। ডি ও সান্যাল আর কোনোদিনই ফিরে আসেনি।
হিটলারের হাতে ইংরেজ তখন বেজায় মার খাচ্ছে। তার ফলে চারদিকে বেকার আর ভবঘুরে বেড়ে গেল। খুব। চাল-ডাল পাওয়া যায় না, কেরোসিন নেই, দেশলাইয়ের আকাল। মার মেজাজ সপ্তমে চড়ে থাকে। দেশ থেকে সেই সময়ে বাবার দু-চারজন জ্ঞাতি, আর তাদের আত্মীয়েরা এসে আমাদের বাসায় থানা গাড়ল। তারা শুনেছে যুদ্ধের বাজারে ধুলো বেচে অনেকে বড়োলোক হচ্ছে। তারাও সব কারবার কনট্রাক্টরি করার জন্য চলে এসেছে কিন্তু ঘাঁতঘোঁত জানা না থাকায় বেমক্কা সারাদিন ঘোরে, রাতে ঘরে বসে জটলা পরামর্শ করে। বাবা অনেকদিন থেকেই সিগারেট ছেড়ে স্বদেশি বিড়ি ধরেছে। জ্ঞাতিরা আসার পর সেই বিড়ি প্রায়ই চুরি হতে লাগল। বাবা কিছু বলতে পারে না কাউকে। তাড়ানো তো দূরের কথা। আমাদের ভাতের ফ্যান গালা বন্ধ হয়ে। গেছে তখন। বাসায় অঙ্ক কষতে আর কাগজ নষ্ট করি না, স্লেটে কষে মুছে ফেলি, স্কুলে উঁচু ক্লাসে স্লেট অ্যালাউ করলেন বিশ্বাস সাহেব। বাড়িতে মা-বাবার কথাবার্তা বন্ধ। শোনা গেল শওকত আলি যুদ্ধে যাবে। আমরা ক-দিন খুব উত্তেজিত হয়ে রইলাম। শওকত আলি লাঠি দিয়ে গুলি ঠেকায়, হাতে বাঘ মারে, মানুষকে সম্মোহিত করে দেয়, সে যুদ্ধে গেলে একটা হেস্তনেস্ত হবেই।
জ্ঞাতিদের জ্বালায় মার প্রাণ ওষ্ঠাগত। দিনে পঞ্চাশবার উনুন থেকে কাগজ জ্বেলে তাদের বিড়ি ধরিয়ে দিতে হয়। দেশলাই নেই। মা প্রকাশ্যে রাগারাগি শুরু করে। জ্ঞাতিরা তখন মাকে খুশি রাখার জন্য বিচিত্র কান্ড শুরু করল। কেউ মার চেহারার, কেউ মার রান্নার প্রশংসা শুরু করল। কেউ বা এর-ওর বাগান থেকে চুরিচামারি করে ফলপাকুড় এনে দিত। ঘরের কিছু কিছু কাজকর্মেও আসত। বাবা ফিরলে তারা সবাই একসঙ্গে হইহই করে উঠত–কাকা এসেছেন, কাকা এসেছেন! তারপর বাবার চটি ধরে টানাটানি, জামা খুলে দেওয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি। শেষে বাবা হাত-পা ধুয়ে বিশ্রাম করার সময়ে তারা বাবার হাত-পা-পিঠ দাবাতে বসত, আঙুল মটকে দিত, পিঠে সুড়সুড়ি, মাথা চুলকোনো–সবই করত। বাবা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে চেঁচামেচি করত–ওরে আর জোরে দাবাসনি, হাড়গোড় ভেঙে যাবে। তারা ছাড়ত না।
জ্ঞাতিদের মধ্যে একজন ছিল পুলিন। একদিন তাকে দেখি শেলিদের বাড়ির পেছনের মাঠে ভাগাড়ে হাড় কুড়িয়ে একটা বস্তা বোঝাই করছে।
ভারি অবাক হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম–এসব কুড়োচ্ছেন কেন?
পুলিন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল–চুপ। একটা কারবারের কথা মাথায় এসেছে। হাড়ে বোতাম হয় জানো তো?
জানি।
পুলিন খুব হেসে বলল–কথাটা এতদিন একদম মাথায় আসেনি। হঠাৎ সেদিন এপাশটা দিয়ে যেতে যেতে ব্যাপারটা মাথায় এসে গেল। শুধু বোতাম না, লবণ শোধন করতেও লাগে। গোরারা তো সবই কিনে নিচ্ছে, যুদ্ধে নাকি সব লাগে। কাউকে বোলো না কিন্তু, লোকে বুদ্ধি পেয়ে যাবে।
পুলিন সেই হাড়ের বস্তা নিয়ে বাসায় ঢোকামাত্র মার উনপঞ্চাশ বায়ু কুপিত হয়। সন্ধেরাতে সেই হাড় পুলিনকে ফেলে দিয়ে আসতে হয়। তারপর শীতের রাতে স্নান করে ঘরে ঢোকা। সেই বস্তার মুখটা একবার আমি একটু ধরেছিলাম। কিন্তু পুলিন খুব মহত্ত্ব দেখাল, আমার কথা মাকে বলল না। বাজারে তখন লোহার বোতাম চালু হয়েছে।
ব্ল্যাক মার্কেট কথাটা তখন শোনা যাচ্ছে খুব। পুলিন সর্দিজ্বরে পড়ে থেকেই প্রায়ই বলত–এবার ব্ল্যাক মার্কেটের ব্যাবসা চালু করব। কথাটার অর্থ সেও ভালো বুঝত না।
