বাড়িতে জ্ঞাতিরা জড়ো হওয়ায় বাবা অখুশি ছিল না। একা খেতে হত না। পেট ভরত। কিন্তু মার মূর্তিখানা দিন দিন মা কালীর মতো হয়ে আসছিল। ঠিক সেই সময়ে কলকাতায় বোমা পড়ায় সেখানে আমার মামাবাড়ি থেকে দিদিমা, তিন মামা, দুই মাসি চলে এল আমাদের বাসায়। মার আর কিছু বলার রইল না। বাবার মুখ উজ্জ্বল দেখাল। মামাবাড়ির লোকজন যেদিন গেল সেইদিনই মা নিজে যেচে বাবার সঙ্গে ভাব করে। বাড়িতে আর জায়গা ছিল না। পড়াশুনো মাথায় উঠে গেল। আমরা সারাদিন মনের আনন্দে ঘুরি। সাধনদের বাড়িতেও লোক, দীপুদের বাড়িতেও। কেবল প্রদীপদের বাড়িতে সন্ধেবেলা সাহিত্যিক দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর ফটোতে রোজ বিকেলে মালা দেওয়া হয়, ধূপকাঠি জ্বলে। প্রদীপ সকাল-বিকেল পড়তে বসে। তার মা বলে–কত বড়ো সাহিত্যিক ছিলেন তোমার বাবা সে-কথা কখনো ভুলো না। তোমাকে বড়ো কিছু হতেই হবে। প্রদীপ আড়ালে-আবডালে বলত–সাহিত্যিক না কচু! লিখত তো বাচ্চাদের লেখা, তাও বেশির ভাগ অনুবাদ।
আমরা অবাক হয়ে বলতাম–তুই কী করে জানলি?
মামাবাড়িতে এই নিয়ে হাসাহাসি হত কত! আমি যুদ্ধে যাব জানিস। সাহিত্যিক-ফাহিত্যিক নয়, আমি হব। সোলজার।
চারদিকে ট্রেঞ্চ কাটা হচ্ছে তখন। দরগার মাঠে লোকলশকর লেগে দিব্যি আঁকাবাঁকা ট্রেঞ্চ কেটে দিল। নতুন রকমের একটা খেলা পেয়ে গেলাম আমরা। গর্তের মুখে লাফ দিই। সবাই পারি, কেবলমাত্র দীপুই পারে না। তিন বোনের পর দীপু একমাত্র ভাই, তার মা-বাবার খুব আদরের, তাই বোধ হয় পারত না। তার হাত-পা নরম নরম ছিল।
বর্ষায় ট্রেঞ্চে ব্যাঙের আস্তানা হল। জল জমে ডুবজল। নিধে ছিপ ফেলত। চ্যাঙা-ব্যাঙা মাছ ধরত। অনেক রাতে বৃষ্টি নামলে প্রবল ব্যাঙের ডাক শোনা যেত। আকাশে কাক, চিলের মতো এরোপ্লেন দেখে দেখে আর শব্দ শুনেও চোখ তুলে তাকাতাম না।
মামারা ছিল বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড়ো। তারা তখন কিশোর কিংবা যুবা। প্রখর চোখে তারা মেয়েদের দেখত। দীপুদের বাড়িতে তাদের বয়সি কয়েকটা ছেলে এসেছিল। সব কলকাতার ছেলে। মামারা তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। সিঁথি কাটা, জুতো পরা, জামার হাতা গুটোনো–এসব আমরা তখনই তাদের কাছ থেকে শিখছি।
দরগার সামনে আমাদের ট্রেঞ্চ-এর দু-ধারে লাফাতে দেখে মামারা হেসে খুন। দীপু লাফাতে পারে না দেখে আমার ছোটোমামা জ্যোতির্ময় গম্ভীর হয়ে বলল–ও লাফাবে কী! ও তো মেয়ে!
যাঃ। বলে আমি চেঁচিয়ে উঠি।
মামা হাসল। বলল–আমি জানি। ওর ভাই নেই বলে ওর মা-বাবা শখ করে ওকে ছেলে সাজিয়ে রাখে।
আমরা তাকিয়ে দেখি, দীপু দরগার মাঠ ধরে প্রাণপণে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন বিকেলে টিলার ওপর আমাদের মিটিং বসল। আমি সাধন, প্রদীপ, সতুয়া, নন্তু আর একধারে দীপু গোঁজ হয়ে বসে। তার চোখে জল।
তুই মেয়ে? সাধন জিজ্ঞেস করল। মাথা নাড়ল দীপু, হ্যাঁ।
আমরা অনেকক্ষণ কথা খুঁজে পাই না। কী বলব! দীপু ততক্ষণে কাঁদতে থাকে। বলে–আমার সঙ্গে খেলবি? আর খেলায় নিবি না?
সেসময়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে খেলতে আমাদের মধ্যে পৌরুষ এসে গেছে। প্রদীপ বলল–কী করে খেলি বল! সবাই জেনে গেলে বলবে মেয়েদের সাথে খেলি।
দীপু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–আমি যে মেয়েদের খেলা কখনো খেলিনি। আমার মেয়ে-বন্ধুও নেই।
সতুয়া খুব অবাক হয়েছিল। বলল–মেয়েছেলে তো তোকে হতেই হবে। ও কি লুকোনো যায়?
আমার মন খুব খারাপ ছিল। দীপু আমার বন্ধুত্বই সবচেয়ে বেশি চাইত। আমার দিকে চেয়ে দীপু বলল–মেয়ে হতে আমার একটুও ভালো লাগে না।
নন্তু ধমক দেয়–মেয়ে হবি আবার কী! তুই তো মেয়েই।
দীপু গোঁজ হয়ে বসে কাঁদতে থাকে, সে কিছুতেই আমাদের সঙ্গ ছাড়বে না।
নন্তু আমাদের আড়ালে ডেকে বলল–ভাই, বদনাম হয়ে যাবে কিন্তু। আমরা ক-জন ছাড়া দীপুর সঙ্গে আর কেউ খেলত না। ওকে দলে রাখা যাবে না।
আমরা পরামর্শ করলাম অনেক। সবশেষে সতুয়া গিয়ে বলল–দীপু, তোকে আমরা অনেক জিনিস দেব। কাল থেকে আর আমাদের সঙ্গে খেলতে আসিস না।
সেই দিন দীপুকে আমরা প্রায় একটা ফেয়ারওয়েল পার্টি দিলাম। সেদিনও দিনের শেষে চাঁদ উঠেছিল। আমরা যে-যার বাসা থেকে মার্বেল, ছুরি, গল্পের বই এনে দিলাম। দীপু নিল। চলে যাওয়ার সময় বলল-বড়ো হয়ে তো কোনো ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হবেই, তখন আমি
বলে সে সবার দিকে তাকাল। আমরা চুপ।
দীপু পায়ের আঙুলে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে মুখ নীচু করে বলল–তখন আমি রন্টুকে বিয়ে করব।
এই বলে এক ছুটে টিলা থেকে নেবে গেল দীপু।
যুদ্ধের শেষে একদিন বাড়ি বাড়ি তেরঙা পতাকা উড়ল। ইস্কুলে পতাকা তুললেন এমদাদ আলি বিশ্বাস। তার কিছুদিন পরেই ফেয়ারওয়েল দেওয়া হল তাঁকে। সবাই তাঁর কৃতিত্বের কথা বললেন। তিনি বলতে উঠে বললেন–আমি যে মুসলমান বলে পাকিস্তানে চলে যাচ্ছি তা নয়। আমি বুড়ো হয়েছি, এই জায়গা ছেড়ে কোথাও না কোথাও আমাকে যেতেই হত। গোরও তো ডাকছে। আমি হিন্দু-মুসলমান দু-রকম ছেলেই পড়িয়েছি। যখন শাসন করতে হাত তুলেছি তার ভালোর জন্য তখন হিন্দু বলে ভয় পাইনি, মুসলমান বলে ছেড়ে দিইনি। যে শেখায় তার ভয় পেতে নেই। যে ভয় পায় সে ভয় পেতে শেখায়। … ইত্যাদি। শহরসুদ্ধ লোক তাঁর জন্য দুঃখ করল। তিনি চট্টগ্রামে চলে গেলেন। শওকত আলি যুদ্ধে যায়নি। যাব যাব করছিল, তার আগেই যুদ্ধ থেমে গেল। শওকত আলি চলে গেল লালমণিরহাট।
