সেবার শহরের ইস্কুলের টিম ফুটবল খেলতে আসে। এইট-এর কামু দারুণ খেলেছিল। শহরের টিম দু-গোল খেয়ে গেল। ফ্রেণ্ডলি ম্যাচ বলে কোনো প্রাইজ ছিল না। তবু বিশ্বাস সাহেব কামুদার পিঠ চাপড়ে দিয়ে আদর করলেন এবং ঘোষণা করলেন–কামুদাকে তিনি রুপোর মেডেল দেবেন। খেলার শেষে আমরা কামুদাকে ঘিরে ধরলাম। কামুদা বাড়ি ফেরার সময়ে বলল–বিশ্বাস সাহেবের গায়ে যা সুন্দর আতরের গন্ধ, না রে!
পরদিন হইহই কান্ড। সারাস্কুলের দেওয়ালে সব অসভ্য কথা লেখা। কমনরুমেই বেশি। শহরের ফুটবল টিম ইস্কুলবাড়িতেই রাত্রিবাস করে সকালে ফিরে গেছে। সবাই বলল–এ ওদেরই কাজ। দু-গোল খেয়ে রাগের চোটে এসব করে গেছে। কিন্তু তবু আমাদের ইস্কুলের কোনো ছেলে এ কান্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা সে-বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়ার জন্য এমদাদ আলি বিশ্বাস ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে ডিকটেশন দিলেন–মনোজ মাংস মুখে দিয়া মুখ মুছিয়া মালদহ মুখে যাত্রা করিল। এই বাক্যটা আমরা সবাই খাতায় লিখে, সেই পাতায় নাম ক্লাস রোল নম্বর দিয়ে পাতাটা ছিঁড়ে বিশ্বাস সাহেবকে দিয়ে দিলাম। ভয়ে বুক শুকিয়ে আছে। কিন্তু কারও কিছু হল না। আমরা সেই বাক্যটার মধ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো অসভ্য কথা পেলাম না। বিশ্বাস সাহেব তবে কেন ওই অদ্ভুত বাক্যটা আমাদের দিয়ে লেখালেন? দেওয়ালের কথাগুলো আমরা দেখিনি! তবে অনেকে বলল। বেশির ভাগ অসভ্য কথাই ম দিয়ে লেখা। সাধন সেদিন সন্ধেবেলা এসে বলল–মাংস মুখে দিয়ে কেউ মুখ মোছে নাকি! না আঁচালে এঁটো থেকে যায় না?
বিকেলটা ফুরোত সবার আগে। পূর্ণিমা থাকলে খেলা শেষ হতে না হতেই চাঁদ উঠে পড়ত। বিকেলটা শেষ হয়ে যাক এরকম ভাবতে ভালো লাগত না। দরগার পেছনে চাঁদমারির মতো উঁচু একটা ঢিবি ছিল। আমরা সেটার ওপর উঠে বসতাম। সাধন, দীপু, প্রদীপ, নন্তু, কোনো কোনো দিন সতুয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু তালগাছ আছে তাদের গাঁয়ের পাশের গাঁয়ে, সে গাছ শুইয়ে দিলে পৃথিবী ছাড়িয়ে আধ হাত বেরিয়ে থাকবে –এই গল্প বলত সতুয়া। সেই তালগাছ থেকে তাল পড়লে নাকি আশপাশের দশ-বিশটা গ্রামে ভূমিকম্প হয়। এক-একটা তালের ওজন বিশ মন। দীপু বয়সে প্রায় আমার সমান। কিন্তু সে দৌড়ঝাঁপ তেমন করতে পারত না। একটু খেলেই হাঁফিয়ে পড়ত, মারপিট লাগলে বরাবর সে মার খেত। তারপর কাঁদতে বসত। বলত–ম্যালেরিয়া না হলে তোদের দেখে নিতুম। সে সব সময়ে আমার পাশ ঘেঁষে বসত এবং বন্ধুত্ব অর্জনের চেষ্টা করত। সেই ঢিবির ওপর থেকে দেখা যেত, শেলিদের বাড়ির পেছনের মাঠে সূর্য ডুবে গেলে কেমন দু-খানা আকাশজোড়া পাখনা মেলে অন্ধকার উঠে আসছে। সেই দিকে চেয়ে ক্ষণস্থায়ী বিকেলের জন্য খুব দুঃখ পেতাম। নীল সমুদ্রে চাঁদ সাঁতরে চলত অবিরাম। খেলার শেষে আমরা সেই ঢিবির ওপর বসে আরও কিছুক্ষণ বিকেলের আলো দেখার চেষ্টা করতাম। সন্ধে উতরে ফিরলেও আমার তেমন ভয় ছিল না। বাবা বারমুখো লোক, মা রোগাভোগা। আমাদের বাড়ির শাসন তেমন কঠিন নয়। সবচেয়ে বেশি শাসন ছিল প্রদীপের। তার বাবা দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন সাহিত্যিক। অল্প বয়সেই মারা যান। প্রদীপের মা নানারকম হাতের কাজ শিখে গঞ্জে মহিলা সমিতির দিদিমণির চাকরি পেয়ে কলকাতা থেকে চলে আসেন। শোভনা দিদিমণি রোগা কালো মানুষ, ঠোঁটে একটু শ্বেতির দাগ, খুব নিয়ম মেনে চলতেন। প্রদীপ কড়া শাসনে থাকত। তার এক বড়ো ভাই। আছে–সুদীপ। সে মার সঙ্গে আসেনি। কলকাতায় মাসির কাছে থেকে ইস্কুলে পড়ে। সন্ধে হলেই প্রদীপের বাসায় তার বাবার বড়ো করে বাঁধানো ছবির সামনে দীপ জ্বেলে, ধূপকাঠি জ্বেলে দেওয়া হয়, ফুলের মালা দেওয়া হয় ছবিতে। প্রদীপ তাদের বাড়িতে যত্নে রাখা মাসিক পত্রিকা বের করে আমাদের দেখাত। শ্রীদেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর নাম ছাপা গল্প আর কবিতা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। তাঁর লেখা একটা কলের কোকিলের গল্প ছিল। কিছু বুঝিনি। প্রদীপ বলত–বাবার লেখা বুঝতে হলে মাথা চাই। আমার মা-ই কত লেখা বোঝে না। গঞ্জের সবাই তাদের খাতির করত। যদিও দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর লেখা কম লোকই পড়েছে। শোভনা দিদিমণি তাঁর স্বামীর কথা উঠলেই চোখ আধবোজা করে রাখতেন। সেই চোখের পাতার গভীর থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল জন্ম নিত। কিন্তু অন্য সময়ে তিনি ছিলেন ভীষণ কড়া। প্রদীপকে কখনো আদরের কথা বলতেন না। উঠতে-বসতে খেতে-শুতে সময় বাঁধা ছিল। বিকেলের দিকটায় দিদিমণির ফিরতে দেরি হত বলে সেই সময়টুকুতে চাঁদের আলোয় চাঁদমারির মতো উঁচু ঢিবিটায় সময় চুরি করে সে আমাদের সঙ্গে খানিক বসে থাকত। বলত–আমি একদিন পালাব, দেখিস। লোকের বাড়ি বাসন মাজব, ঘর ঝাঁট দেব, তবু পালাব। কথার মাঝখানে দীপু হঠাৎ চেঁচিয়ে বলত, রন্টু, ওই দেখ তোর বাবা আজও আবার লোক এনেছে। অবাক হয়ে। তাকিয়ে দেখতাম ঠিকই। দরগার সামনে লিচুবাগানের ভেতর থেকে রাস্তাটা যেখানে হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে। সেই জায়গাটা পার হয়ে গল্প করতে করতে বাবা আসছে, সঙ্গে একটা খাকির হাফপ্যান্ট পরা লোক, মাথায় হ্যাট। কোথা থেকে যে ধরে ধরে বাবা অতিথি নিয়ে আসত কে জানে। সপ্তাহে তিন-চার দিনই বাইরের অচেনা লোকেরা এসে পাত পাড়ত আমাদের বাসায়। মা রাগ করলে বাবা উদার গলায় বলত–অতিথি খেলে বাড়ির মঙ্গল হয়, মানুষের পায়ের ধুলোয় কত জায়গা তীর্থ হয়ে গেল। মা তখন ঝোঁকে বলত–তা অসময়ে লোক এলে যে আমাদের হরিমটর করতে হয়। বাবা শান্ত গলায় মিনমিন করে বলত–তিথি মেনে যে না আসে সেই তো অতিথি। যারা আসত তাদের মধ্যে ভবঘুরে, চোর, জ্যোতিষী সব রকমের মানুষ ছিল। এসব লোক আমাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। এই হাফপ্যান্ট আর হ্যাটঅলা লোকটা আসার আগে যে এসেছিল, সে এক সকালে চলে গেলে দেখা গেল একটি পেতলের ঘটি, বিছানার চাদর, একজোড়া চটিজুতো সে নিয়ে গেছে। এরপর মা রাগারাগি করায় বাবা আর লোক আনত না। কেবল একা খেতে বসে দুঃখ করে বলত–আমাদের দেশের বাড়িতে প্রতিবেলা একশোখানা পাত পড়ে। বিদেশে চাকরি করতে দেখে এসে দেখ কেমন একা একা খেতে হয়। একা খেলে আমার পেট ভরে না। সেই চুরির পর অনেকদিন বাদে লোক এল। দীপু আমাকে ঠেলা দিয়ে বলল–মামিমা আজ কুরুক্ষেত্র করবে। চল দেখি গিয়ে–! শুনে আমি তাকে একটা গাঁট্টা মারি, বলি। আমার মা-বাবার ঝগড়া দেখবি কেন? সে কাঁদতে থাকে।
