এই পুওর বেলিটার জন্য ডোর টু ডোর বেগিং করে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে… এই পুওর বেলিটার জন্যে… এইসব বললেন আর মড়ার হাড় নেড়ে সব আশ্চর্য খেলা দেখাতে লাগলেন। সবশেষে চ্যালেঞ্জ। যদি কেউ থাকেন যিনি প্রোফেসর ভট্টাচার্যের সব খেলা দেখাতে পারবেন, তবে ভট্টাচার্য তাঁকে একশো টাকা দেবেন, যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করে না পারেন তবে তাঁকে একশত টাকা দিতে হবে।
শওকত আলি টিনের চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল–আমি পারি।
পরদিন সকালেই প্রোফেসর ভট্টাচার্য হাওয়া হয়ে গেলেন। কিন্তু শওকত আলি সব খেলা দেখাল। প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত। এমনকী নন্তুকে ডেকে হিপনোটাইজ করে তাকে দিয়ে এমন সব শক্ত শক্ত অঙ্কের উত্তর। করিয়ে নিল যে, কালীমাস্টারমশাই পর্যন্ত হাঁ হয়ে গেলেন। নন্তু সাতঘরের নামতাও পারে না যে! সবশেষে নকে শওকত আলি বলেছিল–সাবধান, কাউকে খুঁয়ো না, তুমি কিন্তু কাঁচের তৈরি। সেই ঘোর নন্তু পরের সাতদিনেও কাটাতে পারেনি। খেত ঘুমোত খেলত, কিন্তু কেউ ছুঁতে গেলেই আঁতকে উঠে চেঁচাত–ধোরো না, ধোরো না আমাকে, আমি কাঁচের তৈরি।
দিন শুরু হত। কালীমাস্টারমশাই বেলা করেই পড়িয়ে উঠতেন। আইবুড়ো মানুষ। গঞ্জে কী করে যে কবে এসে পড়েছিলেন কে জানে! নন্তুদের বাড়ি সকালবেলাটায় খেয়ে স্কুল সেরে বিকেলে সাধনদের পড়িয়ে রাতে শশধরবাবুর বাড়িতে খাওয়া সেরে ওদের বাইরের ঘরের একধারে গিয়ে শুয়ে পড়তেন। আমাদের দিন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হত, শেষ হতে চাইত না। কালীমাস্টার চলে গেলে দুই লাফে বাইরে গিয়ে পড়তাম। বই খাতা গুছোনোর জন্য দিদি পড়ে থাকত। বাইরে তখন সকালের প্রথম বনজ গন্ধটি আর নেই। শওকত আলির কসরত শেষ হয়ে গেছে। মাঠ ফাঁকা। তবু পৃথিবীতে করণীয় কিছুর শেষ ছিল না। মড়ার হাড় খুঁজতে শেলিদের। বাড়ির পিছনে পোড়ো মাঠটাতে চলে যেতাম।
সেই মাঠে পশ্চিমাদের বয়েল গাড়ির বড়ো বড়ো বলদগুলো চরে বেড়াত। কাঁধে ঘা। সেই ঘা খুঁটে খাচ্ছে কাক। সেখানে হাড় পাওয়া যেত বিস্তর। কিন্তু সাধন বলত–ও হাড় ছুসনি, ভাগাড়ের গো হাড়। সেই মাঠ পার হলে নদীর ধারে ছিল শ্মশান। শরৎকালে শ্মশানের দিকটায় কাশ ফুলে ঢেউ দিত। কিন্তু শ্মশান পর্যন্ত যেতে সাহস হত না। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে আমরা দূর থেকে শ্মশান দেখতাম। ভয় করত। মানুষের হাতের হাড় পাওয়া হয়নি।
দূর থেকেই দেখতাম বাবুপাড়ার রাস্তা দিয়ে শচীন আর শেলি গোবরের ঝুড়ি হাতে ফিরছে। শচীনরা ছিল তিন বোন আর এক ভাই। পিকলি, বিউটি, শচীন, শেলি। শচীনের বোনদের এইসব সাহেবি নাম রেখেছিলেন। তার বাবা। একসময়ে শচীনরা ছিল গঞ্জের বড়োলোক। তার বাবা কাছেপিঠের এক চা-বাগানের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বন্দুক ছিল, ঘোড়া ছিল। বাড়িখানাও ছিল বাংলো প্যাটার্নের। তার ছিল দুই বিয়ে, অনেককাল সেটা জানা যায়নি। আগের পক্ষের ছেলেরা সব বড়ো বড়ো। সেবার শচীনের বাবা কালাজ্বরে মারা গেলে, আগের পক্ষের ছেলেরা এসে সব সম্পত্তি দখল করে। কলকাতায় তাদের বাড়ি ছিল বলে কেবল গঞ্জের বাড়িখানা ছেড়ে দেয়। শচীনরা গরিব হয়ে গেল। পিকলি, বিউটি আর শেলি লেস-এর জামা পরা, রুজ পাউডার মাখা, অর্গান বাজিয়ে গান গাওয়া, কিংবা জন্মদিনে পার্টি দেওয়া–এসব ভুলেই গেল। বাড়িখানা এখন রংচটা, কোথাও দেওয়ালের ইট বেরিয়ে আছে, বাগানের ভিতরে মোরামের বাহারি রাস্তাটায় গর্ত, সকাল থেকেই শচীন আর শেলি গোবর কুড়োয়, কাঠ-পাতা কুড়োয়। তার মা একসময়ে জর্জেটের শাড়ি পরত, এখন লজ্জার মাথা খেয়ে বাজুরিয়াদের বাড়ি আয়ার কাজ করে। বাজুরিয়াদের এক ছেলে বিলেত গিয়ে মেম বিয়ে করে। এনেছিল। বাজারের ভেতরে তাদের পৈতৃক বাড়িতে সেই মেমবউয়ের ঠাঁই হয়নি বলে হাই স্কুলের পেছনদিকে চমৎকার একখানা বাড়ি করে সেইখানে থাকত। সেই বাড়িতেই যেত শচীনের মা। পিকলি আর বিউটি একসময়ে কারও সঙ্গে মিশত না। ঘরে তাদের ব্যাপাটেলি, কারম, লুডো কত কী ছিল, ভাই-বোনেরা সেসব নিয়ে থাকত। এখন সেই দু-বোন পাড়ায় পাড়ায় ঘোরে। এ-বাড়ি সে-বাড়ি গিয়ে এর-ওর তার নিলেমন্দ করে। কেউ তাদের বসতে বলে না। তাদের চরিত্র নিয়ে কথা ওঠে। শচীন ক্লাসে ফাস্ট হয়। হেডমাস্টার এমদাদ আলি বিশ্বাস নিজের পকেট থেকে তাকে বই কেনার খরচ দেন। বলেন, গরিবরাই ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভের যোগ্য।
ছোটো ছোটো ঝুপসি লিচুগাছের ঘন ছায়ার ভেতর দিয়ে পথটি গেছে। বইখাতা হাতে সেই পথ ধরে যেতে যেতেই হঠাৎ শুনতে পেতাম দূর থেকে ইস্কুলের ঘণ্টার শব্দ। ওয়ার্নিং। সাধন বলত–দৌড়ো। এমদাদ আলি বিশ্বাস এ সময়টায় গেট-এর কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন। টর্চবাতির মতো তাঁর চোখ জ্বলে। আমরা দৌড়োতাম!
ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ে সেই ইস্কুলে। মাস্টারমশাইরা আছেন, দিদিমণিরাও আছেন। মেয়েরা ক্লাসে বসে থাকে না, তারা থাকে মেয়েদের কমনরুমে। মাস্টারমশাই কিংবা দিদিমণিদের সঙ্গে ক্লাসের শুরুতে লাইন বেঁধে আসে, আবার ক্লাসের শেষে লাইন বেঁধে ফিরে যায়। ছেলেদের দিকে তাকানো বারণ। কথা বলা তো দূরের কথা। দিদি এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত, ফেল করে আমার সঙ্গে পড়ে তখন। ক্লাসে আমি পড়া না পারলে একমাত্র সে-ই আমার দিকে কটমট করে চেয়ে থাকত। বিশ্বাস সাহেবের দাপটে তখন বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায়।
