দিন শুরু হত দুঃখের সঙ্গেই। পড়াশুনো। কালী চক্রবর্তী বারোমাস কফের রুগি, কম্ফটারটা গামছার মতো হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কণ্ঠমণি আমরা কখনো দেখিনি। মুঠ মুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে, সুরুৎ সুরুৎ চা টেনে নিতেন ভেতরে, বলতেন–আঃ! তাঁর আঙুলের ডগা থেকে সরল, সাঙ্কেতিক আর সুদকষা ঝরে পড়ত। সবসময়ে উবু হয়ে বসতেন, অর্শ বা ভগন্দর কিছু একটা ছিল বলে বসতে পারতেন না। তাঁর গা থেকে একটা শসা-শসা গন্ধ আসত। স্নান বারণ ছিল বলেই বোধ হয় ঘাম বসে একরকম গন্ধ ছাড়ত।
ঝাঁপের জানালাটা লাঠি দিয়ে ঠেলে তোলা। পাশেই উত্তরে ছোট্ট একটু জমি, তারপর শওকত আলির বাড়ি। যুবা শওকত আলি সেই জমিতে সকালের মিঠে রোদে কসরত করছে। তুর্কি লাফ দিয়ে শূন্যে উঠে শরীর উলটে ঝপ করে নেমে আসত প্রথমটা। সেই শূন্যের ডিগবাজি ছিল দেখবার মতোই। এত সহজে করত যেন মনে হত ওরকম করাটাই যেকোনো মানুষের নিত্যক্রিয়া। তারপর লাঠির কসরত। লোকে বলত, শওকত লাঠি ঘুরিয়ে বন্দুকের গুলি আটকায়। আমরা অবশ্য ছোটো ছোটো ঢিল ছুঁড়ে দেখেছি, সেগুলো টুকটাক ছিটকে পড়ে। গায়ে লাগে না। আমরা ভূগোল পার হয়ে ইতিহাসের পড়া দিতে দিতে আলেকজাণ্ডারের বাবার নাম ভুল করতামই। বারবার ম্যাসিড়নের নৃপতি… ম্যাসিডনের নৃপতি ছিলেন… অ্যাঁ… ম্যাসিডনের… মনে পড়ত না। কারণ বাইরে শওকতের স্যাঙাত নিধে তখন এসে গেছে। ছোটো দু-খানা কাঠের ছুরি নিয়ে দু-পক্ষ ঘুরে ঘুরে বলছে, শির, তামেচা, বাহেরা, কোটি, ভান্ডা, ঊর্ধ্ব… শির তামেচা বাহেরা, কোটি ভান্ডা ঊর্ধ্ব… মাথা থেকে শুরু করে সারাশরীর জুড়ে আক্রমণ এবং প্রতিরোধ। ছোরা খেলার নামতা আমাদের ওইভাবেই মুখস্থ হয়ে যায়। আলেকজাণ্ডারের বাবার নাম মনে পড়ত না।
শওকত আলির ছিল একটা ম্যাজিকের ঘর। সে-ঘরে ঢোকা বারণ ছিল। কিন্তু আমরা জানতাম। সে-ঘরে মড়ার মাথার খুলি আছে, আর আছে হাতের হাড়–জাদুদন্ড। পুরোনো পুথির মতো জাদুর বই। বাইরের ঘরে একটা বাঘছাল, দেওয়ালে টাঙানো, মাথাসুদ্ধ। চিতাবাঘের ছাল। সেবার মাদপুরে বাঘটা এসে এক মাঘমাসে উৎপাত শুরু করে। একটা কুকুরের মতো ছোটোখাটো বাঘ, তবু তার দাপটেই বাহেরা অস্থির হয়ে গেল। জোতদার দলুইয়ের গাদা বন্দুক তার গায়ে আঁচড়ও কাটল না। সে এসে গঞ্জে খবর দিল। শৌখিন শিকারিরা ছুটির দুপুরে বন্দুক কাঁধে চলল। শওকত আলির বন্দুক ছিল না। বশংবদ লাঠিগাছ কাঁধে নিয়ে সেও চলল বিটারদের সঙ্গে। মাদপুরের ধানখেত পার হলে জঙ্গল, জল। সেখানে টিন আর ক্যানেস্ত্রার চোটে বিস্তর পাখি উড়ে গেল। বন্দুকের শব্দ ধুন্ধুমার। বাঘ আর বেরোয় না। একা শওকত আলি জঙ্গল টুড়তে ছুঁড়তে এক গর্তের মধ্যে দুটো বাচ্চাসমেত মাদি বাঘটাকে ঘুমোতে দেখতে পেল। দেখে অবাক। এইটুকু বাঘ গোরু-মোষ মারে! সদ্য-বিয়োনী সেই বাঘ একবার শওকতকে মুখ ঘুরিয়ে দেখে ঠিক বেড়ালের মতো শব্দ করে। বাঘটাকে ছোট্ট দেখেই শওকত আলি তার লাঠির ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যায়। সেই লাঠি নিপুণভাবেই চালিয়েছিল শওকত আলি কিন্তু বাঘটা কেবল একটা ছোট্ট চকিত লাফ দিয়ে উঠে এসেছিল। নিঃশব্দে। একটা চড়ে কোথায় গেল লাঠি। বাপরে বলে শওকত আলি জান বাঁচাতে লড়াই শুরু করে। সমস্ত গা ফালা ফালা করে ভেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ছিঁড়ে ফেলছিল বাঘ। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। শিকারিরা দৌড়ে এসেছে, হাতে বন্দুক কিন্তু কিছু করার নেই। গুলি যে কারও গায়ে লাগতে পারে। গলা টিপে অবশেষে মেরেছিল শওকত আলি বাঘটাকে। গভর্নমেন্ট থেকে পাঁচশো টাকা পুরস্কার আর চিকিৎসার খরচ দিয়েছিল। স্কুল ছুটি ছিল একদিন। সোনা-রুপোর গোটাকয় মেডেল আর মানপত্র দেওয়া হয়েছিল তাকে। সে সবই বাইরের ঘরে আলমারিতে সাজানো। আলমারির পাশের দেওয়ালে একটা বেতের ঢাল, তার পিছনে দু-খানা সত্যিকারের তরোয়াল ছিল। মাঝে মাঝে সেগুলোতে তেল মাখাতে খাপ থেকে বের করে আমাদের ডাকত সে। আমরা সর্বস্ব ফেলে তরোয়াল দেখতে যেতাম। গঞ্জে শওকত আলিকে সবাই খাতির করত।
সেবার চা-বাগান ঘুরে ছেঁড়া পাতলুন পরা ম্যাজিশিয়ান প্রোফেসর ভট্টাচার্য গঞ্জে এসে হাজির হল। ডাক্তার শশধর হালদারই তখন গঞ্জের সবচেয়ে বড়োলোক। ফোড়া কাটতে ভয় পেতেন দারুণ, একমাত্র ইঞ্জেকশনেই ছিল তার হাতযশ। ব্যথা লাগত না যে তার নয়। এমনকী রুগীর যে-রকম মুখ বিকৃত হত ব্যথায়, তারও সেরকম হত। তবে ইঞ্জেকশনটা খুব তাড়াতাড়ি দিতে পারতেন এবং তারপর ভালো করে ধুয়ে ফেলতেন। ডাক্তারির চেয়েও তার পসার ছিল ওষুধের ব্যবসায়, আর গোরুর দুধে! সাত সের দুধ দেয় এমন গোরু আমরা তার বাড়িতেই প্রথম দেখি। গঞ্জে গণ্যমান্য লোক এলে তার বাড়িতে ওঠাই ছিল রেওয়াজ।
বড়ো একখানা টিনের গুদামঘর ছিল সেই গঞ্জের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, তার একধারে বাজুরিয়াদের সিমেন্টের। বস্তা, ত্রিপল, কাঠ আর বাঁশের ভূপ। অন্য ধারে কাঠের তক্তা জুড়ে মঞ্চ। টিনের চেয়ারে সামনের দিকে বসতেন গণ্যমান্যরা, তাদের সামনে বিছানো ত্রিপল আর শতরঞ্চিতে বাচ্চারা, পিছনের বেঞ্চ-এ পাবলিক। প্রোফেসর ভট্টাচার্য প্রথমদিকে এলেবেলে খেলা দেখালেন। পিস্তল ছুঁড়ে ধোঁয়ার ভিতর থেকে ভারতমাতার আবির্ভাব দেখে পাবলিক আর বাচ্চারা খুব হাততালি দিল। তারপর বাক্সবন্দি খেলা, কঙ্কালের জলপান, শূন্যে ভাসমান মানুষ। ক্লাস সিক্সের দিলীপকে ডেকে নিয়ে অদৃশ্য করে দিলেন। আধঘণ্টা পর খেলার মাঠের গোলপোস্টের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় তাকে পাওয়া গেল। এসব দেখে গণ্যমান্যরা হাততালি দিতে লাগল। প্রোফেসর ভট্টাচার্য বারবার বলতে লাগলেন–
