তাই নাকি?
মাধবীর সঙ্গে নাকি অবনীর বিয়ের সব ঠিকঠাক। সেসব আমার জানার কথাও তো নয়। কিন্তু একদিন সকালবেলায় বরজে রওনা হচ্ছি, হঠাৎ ফর্সা, চোখে চশমাঅলা একটা মেয়ে হাজির। সঙ্গে গাঁয়ের কয়েকজন মাতব্বর।
তাদের মধ্যে কি গোরাচাঁদও ছিল?
না। তবে তার বাবা প্রতাপচাঁদও ছিল। তারা এসেই আমাকে মাতাল, বদমাশ, দুশ্চরিত্র, আরও অনেক কথা বলে প্রচন্ড চেঁচামেচি বাঁধিয়ে দিল।
মাধবীও কি গালাগাল করছিল?
তা তো বটেই। কী রাগ মেয়েটার। বলল, আমি নাকি গাঁয়ের ছেলেদের নেশাভাং ধরাচ্ছি, ছেলেদের মরালিটি নষ্ট করে দিচ্ছি। আরও কত কী! ভগবান জানেন, আমার মাতাল বন্ধুরা সবাই অভ্যস্ত মাতাল, আর তারাই আমাকে মদদ খেতে শিখিয়ে নিয়ে তারপর আমার ঘাড় ভেঙে মদ খেত। কিন্তু আমার কথা কে আর কানে তোলে বলুন? ফটিক দাস নামে একটা গুণ্ডাগোছের লোক তো আমাকে কয়েকটা চড়চাপড়ও মেরেছিল। ভয়ে আমি তখন জবুথবু।
তারপর কী হল?
কী আর হবে? চারদিকে ভিড় জমে গেল। সবাই ছিছিক্কার করছে। একমাত্র সন্ন্যাসী প্রতিহারই আমার পক্ষ নিয়ে দু-চার কথা বলেছিল। সে মাধবীকেই বলল, অবনীকে শিববাবু মদ ধরিয়েছে এ-কথা গাঁয়ের গাছও বিশ্বাস করবে না। অবনী তো চোদ্দো বছর বয়স থেকে মদ খায়, সবাই জানে। কিন্তু তার কথা কেউ কানেই তুলল না। আমার ওপর হুকুম জারি হল, গাঁ ছেড়ে চলে যেতে হবে।
তুই কবুল করলি?
না করে উপায়? আমি ভাইয়ের লোক, উড়ে গিয়ে জুড়ে বসেছি, সহায়-সম্বল তো কিছু নেই। তবে ঘটনায় একটা উপকার কিন্তু হল জামাইদা। সেদিন থেকে আজ অবধি আর মদ ছুঁইনি।
সব ঘটনারই ভালো-মন্দ দুটো দিক থাকে। বরজটা কি বিক্রি করলি নাকি?
না, ওখানেই তো আসল প্যাঁচ।
তার মানে?
খেটেখুটে ব্যাবসাটা দাঁড় করানোয় সকলেরই চোখ টাটাচ্ছিল। বরজটার দিকে তখন অনেকের নজর। ঘটনার পর মাসখানেক থেকে চেষ্টা করছিলাম বিক্রির। কেউ কিনল না। বরং মাসখানেকের মাথায় আমাকে একরকম প্রাণের ভয় দেখিয়েই তাড়ানো হল। বরজটা, শুনেছি, মহীতোষ রায় দখল করেছিল। আমি তারপর আর ওসব। নিয়ে মাথা ঘামাইনি।
শেষ অবধি অবনী ঘোষের সঙ্গে মাধবী রায়ের বিয়ে হয়েছিল কি না খবর নিসনি?
সে খবরে আর আমার দরকার কী বলুন? অবনী ঘোষ আমার জীবন থেকে মুছে গেছে। শীতলকুচিও। ঘেন্নায় আর ও-মুখো কখনো হইনি।
মাধবীর তখন বয়স কত?
ষোলো-সতেরো হবে বোধ হয়। মেয়েদের বয়সের কোনো আন্দাজ আমার নেই। সাত-আট বছর আগেকার কথা।
তোর কি মনে হয় ওই গন্ডগোলটা আসলে ষড়যন্ত্র?
তা তো বটেই। যে-একমাস ছিলাম তারপরেও, তখন আর অবনী ঘোষ বা অন্য মোসাহেবরা আমার ছায়াও মাড়ায়নি।
গোরাচাঁদ অবশ্য আমাকে এত ভেঙে কিছু বলেনি। তবে এটা ঠিক যে, শীতলকুচিতে মহীতোষ রায়ের প্রবল প্রতাপ। বিষয়-সম্পত্তিও মেলা।
হ্যাঁ। আমার কিছু করার ছিল না দাদা, লাখ দুই-তিন টাকা জলে গেল, এই যা।
তোর কাছে দলিলপত্র আছে?
বরজের দলিল? তা আছে। তবে দলিল দিয়ে কিছু হওয়ার নয়। মামলা করলে সেই মামলা গড়াতে থাকবে, টাকা খরচ হবে জলের মতো, কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই আমি মামলা-মোকদ্দমায় যাইনি। লোকসানটা সয়ে নিয়ে নতুন রোখ নিয়ে আবার ব্যাবসা করেছি।
তোর ব্যাবসার মাথা আছে সবাই জানে। কিন্তু তবু বরজটা এত সহজে বেহাত হতে না দিলেও পারতিস। ও-বরজের এখন অনেক দাম।
কী করতে পারতাম বলুন? লাঠিবাজি করে তো সুবিধে হত না। বরং তাতে নিজেই হয়তো খুন হয়ে যেতাম।
তা বটে। তবে নবকেষ্ট অন্য কথা বলে।
কে নবকেষ্ট?
সন্ন্যাসী প্রতিহারের ছেলে।
আপনি তাকে পেলেন কোথায়?
কেন, সে তো এখন শীতলকুচির লক্ষ্মী ভান্ডারের ম্যানেজার। তাকে চিনব না কেন?
সে আপনাকে কী বলেছে?
তেমন গুহ্য কথা কিছু নয়। এই কথা বলছিল যে, মাধবীর সঙ্গে অবনী ঘোষের একটা বিয়ের কথা হয়েছিল। বটে, তবে পাকা কোনো কথা নয়। অবনী ঘোষ যে খুব ভালো ছেলে নয়, এটা সবাই জানে। তবে তার বাবা কেতন ঘোষের কাছে মহীতোষের একটু দায় ছিল। কেতন ঘোষ এক সময়ে মহীতোষের দুঃসময়ে তাকে খুব সাহায্য করেছিল। একরকম তার দয়াতেই মহীতোষ ফের নিজের পায়ে দাঁড়ায়। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই এই বিয়ের কথা হয়। ধরেবেঁধে মেয়েটাকে হয়তো অবনীর সঙ্গেই বিয়ে দিতে হত। মেয়েটা কিন্তু রাজি ছিল না।
সে-সব তো আমার জানার কথা নয়। তবে অবনী ঘোষ কিন্তু লোক খারাপ ছিল না। মদ-টদ খেত বটে, কিন্তু আর তেমন কোনো দোষ দেখিনি। কুঁড়ে আর ভীতু ছিল, তা সে তো আমাদের অনেকেই।
শেষ অবধি মাধবী কিন্তু অবনীকে বিয়ে করেনি। অবনীর বিয়ে হয়েছে বৈকুণ্ঠপুরের সাধন দাসের মেয়ে বৈষ্ণবীর সঙ্গে।
ও বাবা, আপনি অনেক খবর রাখেন দেখছি।
উড়ো কথা কানে এলে কী করব বল, তবে তুই যে দেখছি অবনী ঘোষের বড়ো সাউকার হয়েছিস, তোর বিপদের সময় তো অবনী ঘোষ তোর পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তবে তাকে ভালো লোক বলে মনে করছিস কেন?
ওই তো বললাম, লোকটা ভীতু, কিন্তু খারাপ বললে অন্যায় হবে।
কেতন ঘোষ ছিল দাপুটে লোক। কিন্তু চরিত্র ভালো ছিল না। ছেলেরও সেরকমই হওয়ার কথা। কেতন নিজের বিষয়-সম্পত্তি ফুর্তি করে প্রায় উড়িয়েই দিয়েছিল। যা খুদকুঁড়ো ছিল তা ফুকে দিয়েছে অবনী। তবে পেটে বিদ্যে ছিল বলে, বরাতজোরে একটা চাকরি পেয়ে গেছে। সরকারি কেরানি।
