তাই নাকি?
কথাটা একেবারে মিথ্যেও নয়।
বলিস কী? পাত্রী ফেলে গোরু দেখিস, এ তোর কেমন স্বভাব?
মায়া-মতিভ্রমকে যে বড়ো ভয় পাই দাদা।
বুঝিয়ে বল।
খাজিরগঞ্জের লালকমলকে মনে পড়ে? ওই যার কব্রিাজি ওষুধের কারবার।
তা মনে থাকবে না কেন? লালকমলের বাতের মালিশের খুব নাম।
সে-ই। লালকমল হরিশ্চন্দ্রপুরে নিজের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে প্রথম দর্শনেই কাত হয়ে পড়ল। তেমন মেয়ে নাকি ভূ-ভারতে নেই। বিয়ের পর রংটং উঠে যাওয়ার পর বউয়ের চেহারা যা বেরোল তা কহতব্য নয়। সে নয় চেহারা ভগবানের দান বলে সে-কথা বাদ দিচ্ছি। কিন্তু মেয়েটার চোখে নাকি মায়াদয়া ঝরে পড়ছিল, আর ঠোঁটে করুণার হাসি। বিয়ের পর আর সেসব খুঁজে পাওয়া গেল না। বজ্জাত মেয়েছেলেটা এখন লালকমলের ঘাড়ে মুষলের মতো চেপে বসে তার প্রাণ ছিবড়ে করে ছাড়ছে। দেখা হলেই লালু বড়ো কান্নাকাটি করে। ওইটেই বড়ো ভয় পাই। কার দিকে তাকিয়ে মতিভ্রম হয় বলা তো যায় না। তাই তাকানোর বখেরায় আর নেই।
এ তো বড়ো গন্ডগোলের কথা রে শিবাই, না তাকিয়ে বুঝবি কী করে কার দাঁত উঁচু, কে ট্যারা, কে কালো। বা কুচ্ছিত।
তাকানোর দরকার কী? আর সবাই তো ড্যাব ড্যাব করে দেখছে। তাই তো বলছি, আমার দেখা না-দেখা সমান। আপনারা ধরেবেঁধে জুতে দিলে কিছু করার থাকবে না। কিন্তু বউ যদি বাড়িতে অশান্তি করে তবে। আপনাদের দায়িত্ব।
হুঁ। বড়ো ভাবনায় ফেললি দেখছি। মনে হচ্ছে তোর বিয়ের মতলব নেই।
সে কথা তো কেউ কানেই তুলছে না। আমি তো বলেই আসছি যে, সংসারধর্ম আমার জন্য না। তাই বললে কী হয় রে পাগলা? তোর বাবা-মা, দিদিরা যে আমাকে উস্তম-পুস্তম করে ছাড়ছে বয়েসের ছেলে, বিয়ে না দিলে যে বুড়ো বয়েসে আধপাগলা হয়ে ঘুরে বেড়াবে। তা বিয়েতেই বা তোর এত আপত্তি হচ্ছে কেন? ফকির-বৈরাগী-কাঙাল–কে না বিয়ে বসেছে বল তো? বয়োধর্ম বলেও তো কথা আছে? তার ওপর রোজগারপাতি ঠাকুরের ইচ্ছায় তো মন্দ করছিস না। কয়েক লাখ টাকার কারবার। তা এ-সবেরই বা কী বিলিব্যবস্থা হবে বল তো? তোরটা খাবে কে?
দশ ভূতে লুটে খাবে। তাই-বা মন্দ কী? আমার কাজটুকু আমি করে যাচ্ছি, ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কী আছে?
আমার সঙ্গে যখন তোর দিদির বিয়ে হয় তখন তুই কতটুকুন ছিলিস মনে আছে? মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন তোর। সেই থেকে তোকে এত বড়োটি হতে দেখলাম। কিন্তু তোর মতিগতি যে ভালো বুঝতে পারি, তা নয়। সব কথা খোলসা করে বলিসও না। স্বভাব চাপা হলে অন্য সকলের মুশকিল হয়।
আমার মতিগতি কিন্তু জটিল-কুটিল না। আসলে আমি বিয়ে ব্যাপারটায় তেমন আগ্রহ বোধ করি না। কাজ-কারবার নিয়ে মেতে থাকতে ভালোবাসি।
দাঁড়া। একটা কথা মনে পড়ল হঠাৎ।
কী কথা?
শীতলকুচিতে তোর একটা ঠেক ছিল-না?
ছিল। পানের বরজ করে বড়োলোক হওয়ার বাই চেপেছিল মাথায়।
হ্যাঁ। বছর দুই চেষ্টাও করলি।
ওসব পুরোনো কথা তুলে কী হবে?
তখন কানাঘুসো শুনেছিলাম, মহীতোষ রায় নামে এক ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে তোর নাকি একটা খটামটি লেগেছিল।
ঠিকই শুনেছিলেন।
ব্যাপারটা কী খুলে বলবি?
হঠাৎ সেই বৃত্তান্ত শুনতে চান কেন?
সেই মেয়েটার সঙ্গে তোর ঝগড়াটা কীসের?
ও বাদ দেন। মেয়েমানুষদের সঙ্গে ঝগড়ায় গেলে মুশকিল। আমি তেমন রোখাচোখা মানুষও তো না।
ঝগড়াটা কী নিয়ে?
সে তো চুকেবুকে গেছে।
মনে করে দেখ তো, মেয়েটার নাম কি মাধবী রায়?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে কে বলল? মাধবীর নাম তো আপনার জানার কথাই নয়।
শীতলকুচির লক্ষ্মীভান্ডার তো আমার কাছ থেকেই মাল নেয়।
তাই নাকি?
আমাকে মাসে একবার-দুবার যেতেই হয়। গোরাচাঁদ সিংহ রায় শীতলকুচির মস্ত মহাজন। লক্ষ্মীভান্ডার এর মালিক।
চিনি। আমি যার কাছ থেকে পানের বরজ কিনেছিলাম সেই মহেশ রায়ের ভায়রাভাই হল গোরাচাঁদ। লক্ষ্মীভান্ডারের তখন এমন ফলাও অবস্থা ছিল না।
তা কথায় কথায় গোরাচাঁদকে বলেছিলাম তোর কথা। তখন গোরাই বলল তুই মাধবীর সঙ্গে কী একটা গন্ডগোলে শীতলকুচি ছেড়ে চলে এসেছিলি। গন্ডগোলটা কীসের তা অবশ্য সে বলতে পারল না।
বলার মতো কিছু নয়। তখন খুব বোকা ছিলাম তো, অভিজ্ঞতাও হয়নি। তাই অপমানটা হজম করে চলে আসতে হয়। তবে ওসব আমি তো আর মনে রাখিনি। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে কী হবে বলুন?
ঝগড়াটা কী নিয়ে?
শুনলে হাসবেন।
বলেই দেখ না।
বলতে বাধো বাধো ঠেকে। শত হলেও আপনি গুরুজন। ওসব কথা বলতে গেলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবে।
তোকে আমি সাঁতার কাটতে শিখিয়েছি, সাইকেলে চড়তে শিখিয়েছি, আমার কাঁধেও চড়েছিস অনেক। আমার কাছে তোর লজ্জা কীসের? বয়েসকালে যদি কিছু করেও ফেলে থাকিস সেটা বয়েসের ধর্ম। সকলেরই একটু-আধটু বেপরোয়া ঘটনা ঘটে।
শীতলকুচিতে আমি একটু কুসঙ্গে পড়ে যাই। সন্ন্যাসীচরণ প্রতিহারের বাড়িতে একখানা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। প্রথম চোটেই পানের বরজ থেকে বেশ কয়েক হাজার টাকা নাফা হয়েছিল। বয়েস কম, হাতে খোলামকুচির মতো টাকা, বুঝতেই পারেন।
তা পারি।
কয়েকজন মোসাহেব বন্ধু জুটে গেল। তারা আমাকে মদটদ খাওয়াত। আমারও ফিকে মতো নেশার রং ধরে গেল। রোজই সন্ধের পর আমার ঘরে পাঁচ-সাতজন জুটে যেত। তাদের মধ্যে একজন ছিল অবনী ঘোষ। অবনীর চেহারা ভালো ছিল, পেটে বিদ্যেও ছিল, আবার উড়নচন্ডীও ছিল। তবে সে একটু আলাদা রকমের ছিল, অন্যদের মতো আমার মোসাহেবি করত না। কিন্তু আমার পয়সায় নিয়মিত মদ খেত, কারণ তার বিশেষ পয়সা ছিল না। গন্ডগোলটা এই অবনীকে নিয়েই।
