আপনি অনেক খবর রাখেন। আমিই এতসব জানতাম না।
জানবার চেষ্টা করিসনি বলে জানিস না।
কিন্তু আপনিই বা এতসব খতেন নিয়েছেন কেন? শীতলকুচির বৃত্তান্ত তো তামাদি হয়ে গেছে।
তাই নাকি? কিন্তু আমার তো তা মনে হচ্ছে না রে শিবাই।
তবে আপনার মনে হচ্ছেটা কী?
এই যে তোর বিয়ের অনিচ্ছে, পাত্রী দেখতে গিয়ে জানলা দিয়ে গোরু-ছাগল দেখা, নানারকম খুঁতখুঁতুনি তুলে সম্বন্ধ নাকচ করে দেওয়া, এইসব দেখেই মনে একটু ধন্ধ এসেছিল। কিছু মনে করিস না বাপু, শীতলকুচিতে গিয়ে একটু খোঁড়াখুঁড়ি করতেই কিছু ঘটনা বেরিয়ে পড়ল। এত সব কোনোদিন ভেঙে তো বলিসনি। আমার মনে টিকটিক হচ্ছিলই।
দূর কী যে বলেন।
ঠিকই বলি রে শিবাই। যতই ঢাকাচাপা দিস না কেন, আসল কথা বুঝতে আমার বাকি নেই।
রাত হতে চলল জামাইদা, এবার উঠি।
তাড়া কীসের? ভটভটিয়া আছে, তিন মাইল রাস্তা লহমায় পেরিয়ে যাবি। সবে ঝাঁপি খুলছি, সাপ বেরোক, তার আগেই পালালে কী চলে?
ঠিক আছে, বলেন।
তুই ভাবিস না যে, শুধু উড়ো খবরের ভরসায় তাকে এতকথা বলছি। কারো সঙ্গে কথা কইতে বাকি রাখিনি।
সর্বনাশ কার, কার সঙ্গে কথা কইলেন?
অবনী ঘোষ, মহীতোষ, এমনকী মাধবীকেও বাদ রাখিনি।
আমাকে ডোবালেন যে।
অন্ধকার বলে বুঝতে পারছি না যে, তোর মুখখানা রাঙা হয়ে উঠল কি না।
এসব না করলেই ভালো করতেন। যা উড়েপুড়ে গেছে তাকে আর কুড়িয়ে এনে কী হবে?
উড়েপুড়েই যদি গিয়ে থাকে তাহলে গাঁয়ের একটা সুন্দরী মেয়ে তেইশ বছর বয়েস অবধি বিয়ে না করে বসে আছে কেন বলবি?
বিয়ে করেনি সে তার ইচ্ছে। কাজটা ভালো করেনি সে। অবনী ঘোষের বাগদত্তা ছিল, তার উচিত ছিল তাকেই বিয়ে করা।
মনের সায় না থাকলেও? আর বাগদত্তাই বা কোন হিসেবে? মাধবীর তো মতামতই নেয়নি ওর বাপ। দুজনের ভাবসাবও ছিল না।
না থাকলে অবনী ঘোষের হয়ে ঝগড়া করতে এসেছিল কেন?
মোটেই অবনীর হয়ে ঝগড়া করেনি। সে চেয়েছিল যাতে তুই হুড়ো খেয়ে মদ ছাড়িস। তার মনের কথা তুই টের পাসনি, এত বোকা তুই নোস। ঝগড়া করতে এসেছিল তোর ভালোর জন্যই। তবে সিচুয়েশনটা যে, ওরকম বিচ্ছিরি দাঁড়াবে তা বুঝতে পারেনি। সেইজন্য পরে কান্নাকাটি করেছিল খুব। এখনও কাঁদে।
তাতে আমার আর কিছু যায় আসে না দাদা।
যায় আসে বলেই না, আজ অবধি তোর আর কোনো মেয়ে পছন্দ হল না। সত্যি কথা বল তো, মাধবী। তোর সঙ্গে ঝগড়া করার আগে কতবার ভাব করতে চেয়েছিল? তুই তাকে পাত্তাই দিলি না।
পাত্তা দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে কেন? সে তো আমার চোখে পরস্ত্রী।
তোর মাথা। কোনো হিসেবেই মাধবী পরস্ত্রী ছিল না। আজও নয়।
মাধবীর কথা তুলছেন কেন জামাইদা? আপনার মতলবখানা কী?
গত রোববার তোর দিদিকে নিয়ে আমি শীতলকুচিতে গিয়েছিলাম।
সর্বনাশ!
সর্বনাশের জন্যই এইবার তৈরি হ। তোর দিদির মাধবীকে ভারি পছন্দ হয়েছে। তার ওপর যখন শুনল, এত বয়স অবধি মেয়েটা বিয়ে না করে একজনের জন্য অপেক্ষা করে আছে, তখন তো কেঁদেই ফেলল। মহীতোষ এখন পারলে আমাদের হাতে-পায়ে ধরে। বলছিল, মেয়েটা বিয়ে করবে না বলে ধনুকভাঙা পণ করে বসে আছে, আমি মরেও শান্তি পাব না।
কাজটা ভালো করেননি জামাইদা। আমাকে বড়ো লজ্জায় ফেললেন।
দামড়া কোথাকার। শুধু একটা ভুল ধারণার ওপর একটা মেয়েকে এত কষ্ট দিতে হয়? অবনী ঘোষ তো কবেই বিয়ে করে সংসার পেতে বসে গেছে। তোর অঙ্ক তো মেলেনি।
সব অঙ্ক কি মেলে দাদা?
এই অঙ্কটা মিলিয়ে দে ভাই। আর পাত্রী দেখার নামে আমাদের মিছে হয়রান করে মারিস না।
আজ উঠি জামাইদা।
না। উঠলে হবে না। মুচলেকা দিয়ে যা। কোনোদিন তো আমার সঙ্গে অবাধ্যতা করিসনি। আজ কী করবি?
জ্বালালেন। দিদি যখন আসরে নেমে পড়েছে তখন আমার জীবন অতিষ্ঠ করে মারবে।
মত দিলি তো!
না দিয়ে উপায় কী বলুন?
পারিজাত ও ছোটকাকা
আপনি কি পুলিশের লোক?
কেন বলুন তো! আমাকে কি পুলিশের লোক বলে মনে হয়?
আজকাল কাউকে দেখে কি কিছু বোঝা যায়, বলুন! আমাদের নিমাইবাবুর কথাই ধরুন না কেন! দিব্যি মোটাসোটা, হাসিখুশি, দিলদরিয়া, নির্বিরোধী মানুষ। ভিখিরিকে ভিক্ষে দেন, কীর্তন শুনে কাঁদেন, পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে ছুটির দিনে ব্যাটবল খেলেন, ঘরে ঠাকুর দেবতার ছবি আছে। অথচ একদিন সকালে তাঁর বাড়ি পুলিশে–পুলিশে ছয়লাপ। তাঁর শোওয়ার ঘরের খাটের তলা থেকে দুটো এ কে ফর্টি সেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল, দুটো বেলজিয়ান পিস্তল, আর ডি এক্স, কার্তুজ আরও কী-কী সব যেন বেরোল। আমাদের এক গাল মাছি।
নিমাইবাবু ধরা পড়লেন বুঝি!
পাগল! শুনলুম, ওই থলথলে চেহারা নিয়েও তিনি নাকি নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে লাফিয়ে পড়ে হাওয়া হয়েছেন। তাই বলছিলুম, লোক দেখে আজকাল আর কে যে কী তা চেনা মুশকিল। শুনলুম নিমাইবাবু নাকি কোন টেররিস্ট দলের সর্দার। বুঝুন কাণ্ড!
তা আমাকে দেখে কী মনে হয় আপনার?
শার্লক হোমস হলে বলতে পারতুম। তবে এমনিতে আপনাকে একজন মধ্যবয়স্ক, মধ্যবিত্ত, মধ্যশিক্ষিত, মধ্যম উচ্চতা ও মধ্যম স্বাস্থ্যের ভ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। একজোড়া সন্দেহভাজন জম্পেশ গোঁফ থাকলেও আপনাকে ভয়ঙ্কর মানুষ বলে মনে হয় না। আর ওইটেই হয়েছে মুশকিল। আজকাল লোক দেখে চেনার উপায় নেই কিনা।
