তপন হালদারের ছেলে মিতুল মোটরবাইকে করে কালীপুর থেকে মন্মথ ডাক্তারকে নিয়ে এল। গাঁয়ে হোমিওপ্যাথি জগন্নাথ কী সব ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল মলয়াকে। যাই হোক বউটার চোট তেমন মাত্রাছাড়া নয়। মন্মথ ডাক্তার দেখেটেখে বলল , হাড়–টাড় ভাঙেনি। তবে ভোগান্তি আছে।
তারক ভিড়ের বাইরে উঠোনের এক ধারে এসে দাঁড়িয়ে ওপরে চেয়ে আকাশটা দেখল। সে অমানুষ ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও ঢের অমানুষ তো পৃথিবীতে আছে দেখা যাচ্ছে।
কালীপুর থানা থেকে পুলিশও এসে পড়ল জিপে করে। জবানবন্দি দিতে দিতে রাত প্রায় ভোর। তারপর তার বাড়িমুখো রওনা হল। মনটা খারাপ লাগছে। বউটা এঁটো হয়ে পড়ল!
বাঁশঝাড় পেরনোর সময়ে কে যেন বলে উঠল, আমি তো জানতুম তুমি খারাপ লোক নও।
তারক হাঁ।
কে? কে?
আমি।
অন্ধকারেও কি আর চিনতে ভুল হয়?
তুই! তুই নরেনবাবুর সঙ্গে যাসনি?
তোমার কি মুখে কিছু আটকায় না? তার আগে গলায় দড়ি দেব।
তাহলে কোথায় ছিলি?
কোথায় আবার! বউদি লুকিয়ে রেখেছিল নতুন গোয়ালঘরে। ডাকাত যখন পড়ল তখন বেরিয়ে এসে কাণ্ড দেখে খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে পড়ি। তুমি না এলে আজ কী যে হত!
নরেনবাবু তাহলে কার সঙ্গে গেল?
তার আমি কী জানি! নিয়ে যেতে চেয়েছিল বলেই তো পালিয়েছিলুম।
ও শালা মহা হারামি। একবার ভেবেছিলুম পুলিশকে বলে দিই, খুনটা ও শালাই করাচ্ছিল।
না-না, ওসব বলার দরকার নেই। আমাদের তো এ গাঁয়েই থাকতে হবে। আমরা গরিব
মানুষ।
হুঁ।
আর আমাকে বেচতে চাইবে না তো!
তারক একটু হাসল। তারপর হাত বাড়িয়ে যমুনার একটা হাত ধরে বলল , সেই তারকটা ভেগে গেছে। এখন যে–তারকের হাত ধরে হাঁটছিস সেটা একটা পরপুরুষ।
তারকের হাতে একটা জোর চিমটি কাটল যমুনা।
পাত্রী
কে ও? শিবাই নাকি রে?
যে আজ্ঞে। শিবাই-ই বটি।
তা পাত্রী পছন্দ হল?
না জামাইদা, এটাও লাগসই নয়। দাঁত উঁচু।
দাঁত উঁচু? তা কত উঁচু? মুখ বন্ধ হয় না?
তা হয়।
আজকাল তো শুনি উঁচু দাঁতের বেশ কদর হয়েছে নাকি? ফিলম আর সিরিয়ালে নাকি উঁচু দাঁতের বেশ কদর।
আপনি তো ওসব দেখেন টেখেন না, তবে জানলেন কীভাবে?
দেখার সময় কোথায় যে দেখব? তবে ভচ্চার্য ঠাকুরমশাই বলেছিলেন বটে, অঘোর হে, আজকাল উঁচু দাঁতের ছড়াছড়ি।
ঠাকুরমশাই? নিমুবাবুর বাড়িতে ঠাকুরমশাইকে দেখেছি বটে বারকয়েক, টিভির সামনে বসে ঘাড় কাত করে রোজ সন্ধেবেলা তোফা ঘুম দেন।
ফাঁকে ফাঁকে দেখেন আর কী। তার ঘরদোর কেমন দেখলি?
আজ্ঞে ওসব ভালো, পাকা একতলা। বাড়িতে টিউবওয়েল। গুনে দেখলাম, বাড়ির হাতায় অন্তত শ-দেড়েক সুপুরি গাছ। দুটো পুকুর। আমবাগান। জমি-জিরেত।
লাগিয়ে দিলে পারতি।
দাঁতে আটকায় যে! না-হলে লাগিয়েই দিতাম।
মেয়ের যেমন দাঁত উঁচু, তেমনি তোর আবার নাক উঁচু। বলি দামড়া, বয়েসটা খেয়াল আছে? ছত্রিশ পেরোলি কিন্তু!
আমার আর বিয়ে হওয়ার নয়। বিয়ে না হয় না হোক, যেমন তেমন একটা ধরে আনলে আমার হবে না। ভাবিয়ে তুললি। আয় বারান্দার চৌকিতে বসে একটু ভাবি। জ্যোৎস্নাটা খুব ফিনকি দিয়েছে আজ। তোর সঙ্গে গিয়েছিল কে?
গদাই, পবন আর মেসোমশাই।
তারা কী বলে?
মেসোমশাইয়ের কথা আর কবেন না। যাকে দেখে তাকেই পছন্দ। পবন আর গদাই বলল, চলবে না।
তাহলে এগারো নম্বরেরটাও আউট।
যে-আজ্ঞে।
দশ নম্বরটার যে কী দোষ ছিল?
সেটা তো আপনিই বাতিল করলেন, মনে নাই?
নাকি? ওঃ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। পাত্রীর ভৌম দোষ ছিল। বড়ো মুশকিলেই পড়া গেল রে! তোর মা, বাপ, দিদি সবাই যে তোর বিয়ের জন্য বড়ো পাগল হয়ে পড়েছে। জুতসই পাত্রীই পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পথে ঘাটে কত সুন্দরী মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী ব্যাপার বল তো?
দেখেন জামাইদাদা, আমার মেয়েছেলে দেখার চোখও নাই, রোখও নাই। আমি কাজ-কারবার নিয়ে ঝাটে জড়িয়ে আছি। আপনারা সবাই ধরে-পাকড়ে পড়লেন বলে, ঘাড় কাত করতে হয়েছে। বলি কী, এবার আমাকে রেহাই দেন।
কস কীরে ডাকাত, তোর বিয়ে দিতে না পারলে যে, আমার অন্নজল বন্ধ হবে।
ললাটের লিখন বলেও তো একটা কথা আছে। আমি ভেবে দেখলাম এইভাবে মেয়ে দেখে বেড়ানোটাও ঠিক হচ্ছে না। মেয়েগুলোরও তো একরকম অপমানই হচ্ছে। এটাও ঠিক না। আর এই বিয়ে-বিয়ে হুল্লোড়ে আমার কাজ-কারবারেও লোকসান হচ্ছে। বিষাণগড়ের ইটভাঁটিতে গন্ডগোল, ন্যাজাতের কারখানার ওভারহল করা দরকার, বৈদ্যপুরের বিস্তর পাওনা উশুল করা পড়ে আছে।
তা বললে কী হয় রে পাগল? তোর বুড়ো বাপ-মা যে তোর ভরসাতেই বেঁচে আছে। কাজ-কারবারের জন্য ভয় নেই। ও দু-দিনেই সামলে নিতে পারবি। আর কটা দিন থেকে যা। শনিবারে বিষ্ণুপুরের মেয়েটাকে দেখে নিলেই হয়।
ও আপনারা দেখেন।
শুনেছি এ-মেয়েটা বড়োই ভালো। দেখতে শুনতে সুন্দর, লেখাপড়া জানে, তার ওপর নাকি ভারি বুদ্ধিমতী। বুদ্ধিমতী মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের কথা।
আমাকে ছেড়ে দেন। কাজ-কারবার লাটে উঠবে এরকম চলতে থাকলে।
একটা কথা কবি?
কী কথা?
চন্ডীপুরের মেয়েটাকে তোর পছন্দ হল না কেন?
সে তো বলেই দিয়েছি।
তেমন ভেঙে বলিসনি। আরও একটা কথা।
বলেন।
তোর মেসোমশাই দিনকয়েক আগে আমাকে বলেন, শিবাই মেয়ে পছন্দ করবে কী, ও তো কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়েই দেখে না। হয় মাথা নীচু করে বসে থাকে, নইলে জানলার বাইরে তাকিয়ে মাটঘাট, গাছপালা আর গোরু-ছাগল দেখে।
