ছত্রিশ নম্বর বাসটা থামতেই উঠে পড়ল নীলু।
উঠেই বুঝতে পারে, বাসটা দখল করে আছে দশ বারোজন ছেলে-ছোকরা। পরনে শার্ট পায়জামা, কিংবা সরু প্যান্ট। বয়স ষোলোর এদিক ওদিক তাদের হাসির শব্দ থুথু ফেলার আগের গলাখাঁকারির–খ্যা-অ্যা-অ্যা-র মতো শোনাচ্ছিল। লেডিজ সিটে দু-তিনজন মেয়েছেলে। বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে। দু-চারজন ভদ্রলোক ঘাড় সটান করে পাথরের মতো সামনের শূন্যতার দিকে চেয়ে আছে। ছোকরারা নিজেদের মধ্যেই চেঁচিয়ে কথা বলছে। উল্টো-পাল্টা কথা, গানের কলি। কন্ডাক্টর দুজন দুদরজায় সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে। ভাড়া চাইবার সাহস নেই!
তবু ছোকরাদের একজন দলের পরমেশ নামে আর একজনকে ডেকে বলছে–পরমেশ, আমাদের ভাড়াটা দিলি না?
–কত করে?
–আমাদের হাফ-টিকিটা পাঁচ পয়সা করে দিয়ে দে।
–এই যে কন্ডাক্টরদাদা, পাঁচ পয়সার টিকিট আছে তো! বারোখানা দিন।
পিছনের কন্ডাক্টর রোগা, লম্বা, ফর্সা না-কামানো কয়েক দিনের দাড়ি থুতনিতে জমে আছে। এবড়োখেবড়ো গজিয়েছে গোঁফ। তাতে তাকে বিষণ্ণ দেখায়। সে তবু একটু হাসল ছোকরাদের কথায়। অসহায় হাসিটি।
নীলু বসার জায়গা পায়নি। কন্ডাক্টরের পাশে দাঁড়িয়ে সে বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল।
বাইরে কোথাও পরিবার পরিকল্পনার হোর্ডিং দেখে জানালার পাশে বসা একটা ছেলে চেঁচিয়ে বলল–লাল ত্রিভুজটা কী বল তো মাইরি!
–ট্রাফিক সিগন্যাল বে, লাল দেখলে থেমে যাবি।
–আর নিরোধ! নিরোধটা কী যেন।
–রাজার টুপি…রাজার টুপি…
–খ্যা-অ্যা-অ্যা-খ্যা-অ্যা-অ্যা…
–খ্যা…
পরের স্টপে বাস আসতে তারা হেঁকে বলল–বেঁধে…লেডিজ…
নেমে গেল সবাই। বাসটাকে ফাঁকা নিস্তব্ধ মনে হল এবার। সবাই শরীর শ্লথ করে দিল। একজন চশমা-চোখে যুবা কন্ডাক্টরের দিকে চেয়ে বলল–লাথি দিয়ে নামিয়ে দিতে পারেন না এসব এলিমেন্টকে!
কন্ডাক্টর ম্লান মুখে হাসে
ঝুঁকে নীলু দেখছিল ছেলেগুলো রাস্তা থেকে বাসের উদ্দেশে টিটকিরি ছুঁড়ে দিচ্ছে। কান কেমন গরম হয়ে যায় তারা লাফিয়ে নেমে পড়তে ইচ্ছে করে। লাঠি ছোরা বোমা যা হোক অস্ত্র নিয়ে কয়েকটা খুন করে আসতে ইচ্ছে করে।
হঠাৎ পোগোর মুখখানা মনে পড়ে নীলুর। জামার আড়ালে ছোরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পোগো। স্বপ্ন দেখছে মার্ডারের তারা সবাই পোগোর পিছনে লাগে, মাঝে মধ্যে লাথি কষায়। তবু কেন যে পোগোর মতোই এক তীব্র মার্ডারের ইচ্ছে জেগে ওঠে নীলুর মধ্যেও মাঝে মাঝে এত তীব্র সেই ইচ্ছে যে আবেগ কমে গেলে শরীরে একটা অবসাদ আসে। তেতো হয়ে যায় মন।
শোভন বাথরুমে বল্লরী এসে দরজা খুলে চোখ কপালে তুলল–ওমা, আপনার কথাই ভাবছিলাম সকালবেলা অনেকদিন বাঁচবেন।।
শোভনের বৈঠকখানাটি খুব ছিমছাম, সাজানো। বেতের সোফা, কাচের বুককেস, গ্র&ন্ডিগের রেডিওগ্রাম, কাঠের টবে মানিপ্ল্যান্ট, দেয়ালে বিদেশি বারো-ছবিওলা ক্যালেন্ডার, মেঝেয় কয়ের কার্পেটা মাঝখানে নিচু টেবিলের ওপর মাখনের মতো রঙের ঝকঝকে অ্যাশ-ট্রে-টার সৌন্দর্যও দেখবার মতন। মেঝেয় ইংরিজি ছড়ার বই খুলে বসে ছিল শোভনের চার আর তিন বছর বয়সের মেয়ে মিলি আর জুলি। একটু ইংরিজি কায়দায় থাকতেই ভালবাসে শোভন। মিলিকে কিন্ডারগার্টেনের বাস এসে নিয়ে যায় রোজ। সে ইংরিজি ছড়া মুখস্থ বলে।
নীলুকে দেখেই মিলি জুলি টপাটপ উঠে দৌড়ে এল।
মিলি বলে–তুমি বলেছিলে ভাত খেলে হাত এঁটো হয়। এঁটো কী?
দুজনকে দু’কোলে তুলে নিয়ে ভারী একরকমের সুখবোধ করে নীলু ওদের গায়ে শৈশবের আশ্চর্য সুগন্ধা
মিলি জুলি তার চুল, জামার কলার লণ্ডভণ্ড করতে থাকে। তাদের শরীরের ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে নীলু বল্লরীকে বলে–তোমার হাঁড়ি চড়ে গেছে নাকি উনুনে।
–এইবার চড়বো বাজার এল এইমাত্র।
–হাঁড়ি ক্যানসেল করো আজ। বাপ গেছে বারুইপুরে। সকালেই বিশ চাক্কি ঝাঁক হয়ে গেল। সেটা পুষিয়ে নিতে হবে তো! তোমার এ দুটো পুঁটলি নিয়ে দুপুরের আগেই চলে যেও আমার গাজায়, খুমে লিও সবাই।
বল্লরী কেঁঝে ওঠে–কী যে সব অসভ্য কথা শিখেছেন বাজে লোকদের কাছ থেকে! নেমন্তন্নের ওই ভাষা!
বাথরুম থেকে শোভন চেঁচিয়ে বলে–চলে যাস না নীলু, কথা আছে।
–যেও কিন্তু। নীলু বল্লরীকে বলে–নইলে আমার প্রেস্টিজ থাকবে না।
–বাঃ, আমার যে ডালের জল চড়ানো হয়ে গেছে। এত বেলায় কি নেমন্তন্ন করে মানুষ!
নীলু সেসব কথায় কান দেয় না। মিলি জুলির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে।
শোভন সকালেই দাড়ি কামিয়েছে। নীল গাল। মেদবহুল শরীরে এঁটে বসেছে ফিনফিনে গেঞ্জি, পরনে পাটভাঙা পায়জামা। গত বছর যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে এল শোভনা বাসা খুঁজে দিয়েছিল নীলুই। চারদিনের নোটিশো এখন সুখে আছে শোভন। যৌথ পরিবারে থাকার সময়ে এত নিশ্চিন্ত আর তৃপ্ত আর সুখী দেখাত না তাকে।
পাছে হিংসা হয় সেই ভয়ে চোখ সরিয়ে নেয় নীলু।
নেমন্তন্নের ব্যাপার শুনে শোভন হাসে–আমিও যাব-যাব করছিলাম তোর কাছে। এর মধ্যেই চলে যেতাম ভালই হল।
এক কাপ চা আর প্লেটে বিস্কুট সাজিয়ে ঘরে আসে বল্লরী।
শোভন হতাশ গলায় বলে–বা মোটে এক কাপ করলে! ছুটির দিনে এ সময়ে আমারও তো এক কাপ পাওনা।
বল্লরী গম্ভীরভাবে বলে–বাথরুমে যাওয়ার আগেই তো এক কাপ খেয়েছ।
মিষ্টি ঝগড়া করে দুজন মিলি জুলির গায়ের অদ্ভুত সুগন্ধে ডুবে থেকে শোভন আর বল্লরীর আদর-করা গলার স্বর শোনে নীলু। সম্মোহিত হয়ে যেতে থাকে।
