তারপরই হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে–চলি রে? তোরা ঠিক সময়ে চলে যাস।
–শুনুন শুনুন, আপনার সঙ্গে কথা আছে। বল্লরী তাকে থামায়।
–কী কথা?
–বলছিলুম না আজ সকালেই ভেবেছি আপনার কথা তার মানে নালিশ আছে একটা কারা বলুন তো আমাদের বাড়ির দেওয়ালে রাজনীতির কথা লিখে যায়? তারা কারা? আপনাদের তো এলাকা এটা, আপনার জানার কথা।
–কী লিখেছে?
–সে অনেক কথা ঢোকার সময়ে দেখেননি? বর্ষার পরেই নিজেদের খরচে বাইরেটা রং করালুম দেখুন গিয়ে, কালো রং দিয়ে ছবি এঁকে লিখে কী করে গেছে শ্রী! তা ছাড়া রাতভর লেখে, গোলমালে আমরা কাল রাতে ঘুমোতে পারিনি।
নীলু উদাসভাবে বলে–বারণ করে দিলেই পারো।
–কে বারণ করবে? আপনার বন্ধু ঘুমোতে না পেরে উঠে সিগারেট ধরাল আর ইংরিজিতে আপনমনে গালাগাল দিতে লাগল–ভ্যাগাবন্ডস, মিসফিটস, প্যারাসাইটস… আরও কত কী! সাহস নেই যে উঠে ছেলেগুলোকে ধমকাবো
–তা তুমি ধমকালে না কেন? নীলু বলে উদাস ভাবটা বজায় রেখেই।
বল্লরী হাসল উজ্জ্বলভাবে। বলল–ধমকাইনি নাকি! শেষমেষ আমিই তো উঠলাম। জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বললাম–ভাই, আমরা কি রাতে একটু ঘুমোব না? আপনার বন্ধু তো আমার কাণ্ড দেখে অস্থির। পিছন থেকে আঁচল টেনে ফিসফিস করে বলছে–চলে এসো, ওরা ভীষণ ইতর, যা তা বলে দেবে। কিন্তু ছেলেগুলো খারাপ না। বেশ ভদ্রলোকের মতো চেহারা। ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে, হাতে কিছু চটি চটি বই, প্যামফলেটা আমার দিকে হাতজোড় করে বলল–বৌদি, আমাদেরও তো ঘুম নেই। এখন তো ঘুমের সময় না এদেশো বললুম–আমার দেয়ালটা অমন নোংরা হয়ে গেল যে! একটা ছেলে বলল–কে বলল নোংরা! বরং আপনার দেয়ালটা অনেক ইস্পট্যান্ট হল আগের চেয়ে। লোক এখান দাঁড়াবে, দেখবে, জ্ঞানলাভ করবো আমি। বুঝলুম খামোখা কথা বলে লাভ নেই। জানালা বন্ধ করতে যাচ্ছি অমনি একটা মিষ্টি চেহারার ছেলে এগিয়ে এসে বলল–বৌদি, আমাদের একটু চা খাওয়াবেন? আমরা ছ’জন আছি!
নীলু চমকে উঠে বলে–খাওয়ালে না কি?
বল্লরী মাথা হেলিয়ে বলল–খাওয়াব না কেন?
–সে কী!
শোভন মাথা নেড়ে বলল–আর বলিস না, ভীষণ ডেয়ারিং এই মহিলাটি। একদিন বিপদে পড়বো
–আহা, ভয়ের কী! এইটুকু-টুকু সব ছেলে, আমার ভাই বাবলুর বয়সী মিষ্টি কথাবার্তা তাছাড়া এই শরতের হিমে সারা রাত জেগে বাইরে থাকছে–ওদের জন্য না হয় একটু কষ্ট করলাম!
শোভন হাসে, হাত তুলে বল্লরীকে থামিয়ে বলে–তার মানে তুমিও ওদের দলে।
–আহা, আমি কী জানি ওরা কোন দলের? আজকাল হাজারো দল দেয়ালে লেখো আমি কী করে বুঝব!
–তুমি ঠিকই বুঝেছ। তোমার ভাই বাবলু কোন দলে তা কি আমি জানি না! সেদিন খবরের কাগজে বাবলুর কলেজের ইলেকশনের রেজাল্ট তোমাকে দেখালুম না? তুমি ভাইয়ের দলের সিমপ্যাথাইজারা।
অসহায়ভাবে বল্লরী নীলুর দিকে তাকায়, কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে–না, বিশ্বাস করুন। আমি দেখিওনি ওরা কী লিখেছে।
নীলু হাসে–কিন্তু চা তো খাইয়েছ!
–হ্যাঁ। সে তো পাঁচ মিনিটের ব্যাপার গ্যাস জ্বেলে ছ পেয়ালা চা করতে কতক্ষণ লাগে! ওরা কী খুশী হল! বলল–বৌদি দরকার পড়লে আমাদের ডাকবেন। যাওয়ার সময়ে পেয়ালাগুলো জল দিয়ে ধুয়ে দিয়ে গেল। ওরা ভাল না?
নীলু শান্তভাবে একটু মুচকি হাসে–কিন্তু তোমার নালিশ ছিল বলছিলে যে! এ তো নালিশ নয়। প্রশংসা।
–না নালিশই। কারণ, আজ সকালে হঠাৎ গোটা দুই বড় বড় ছেলে এসে হাজির। বলল–আপনাদের দেয়ালে ওসব লেখা কেন? আপনারা কেন এসব আলাউ করেন? আপনার বন্ধু। ঘটনাটা বুঝিয়ে বলতে ওরা থমথমে মুখ করে চলে গেল। আপনি ওই ছ’জনকে যদি চিনতে পারেন তবে বলবেন–ওরা যেন আর আমাদের দেয়ালে না লেখো লিখলে আমরা বড় বিপদে পড়ে যাই। দুদলের মাঝখানে থাকতে ভয় করে আমাদের বলবেন যদি চিনতে পারেন।
শোভন মাথা নেড়ে বলে–তার চেয়ে নীলু, তুই আমার জন্য আর একটা বাসা দেখা এই। দেয়ালের লেখা নিয়ে ব্যাপার কদূর গড়ায় কে জানে। এর পর বোমা কিংবা পেটো ছুড়ে দিয়ে যাবে জানালা দিয়ে, রাস্তায় পেলে আলু টপকাবো তার ওপর বল্লরী ওদের চা খাইয়েছে–যদি সে ঘটনার সাক্ষীসাবুদ কেউ থেকে থাকে তবে এখানে থাকাটা বেশ রিস্কি এখন।
বল্লরী নীলুর দিকে চেয়ে বলল–বুঝলেন তো! আমাদের কোনো দলের ওপর রাগ নেই। রাতজাগা ছটা ছেলেকে চা খাইয়েছি–সে তো আর দল বুঝে নয়! অন্য দলের হলেও খাওয়াতুম।
বেরিয়ে আসার সময়ে দেয়ালের লেখাটা নীলু একপলক দেখল। তেমন কিছু দেখার নেই। সারা কলকাতার দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে বিপ্লবের ডাক। নিঃশব্দে।
কয়েকদিন আগে এক সকালবেলায় হরলালের জ্যাঠামশাইকে নীলু দেখেছিল প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেরার পথে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন দেওয়ালের সামনে পড়লেন লেখা। নীলুকে দেখে ডাক দিলেন তিনি বললেন–এইসব লেখা দেখেছ নীলু। কী রকম স্বার্থপরতার কথা। আমাদের ছেলেবেলায় মানুষকে স্বার্থত্যাগের কথাই শেখানো হত। এখন এরা শেখাচ্ছে স্বার্থসচেতন হতে, হিংস্র হতে–দেখেছ কীরকম উল্টো শিক্ষা!
নীলু শুনে হেসেছিল।
উনি গম্ভীর হয়ে বললেন–হেসো না। রামকৃষ্ণদেব যে কামিনীকাঞ্চন সম্বন্ধে সাবধান হতে বলেছিলেন তার মানে বোঝো?
নীলু মাথা নেড়েছিল। না।
উনি বললেন–আমি এতদিনে সেটা বুঝেছি। রামকৃষ্ণদেব আমাদের দুটো অশুভ শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হতে বলেছিলেন একটা হচ্ছে ফ্রয়েডের প্রতীক কামিনী, অপরটা মার্ক্সের কাঞ্চনা ও দুই তত্ত্ব পৃথিবীকে ব্যভিচার আর স্বার্থপরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তোমার কী মনে হয়?
